চাল নিয়ে চালবাজি!

শফিকুল ইসলাম ২৩:১৬ , জুন ১৭ , ২০১৭

চালচাল নিয়ে চালবাজির অভিযোগ উঠেছে দেশের একটি শক্তিশালী সিন্ডেকেটের বিরুদ্ধে। এই সিন্ডিকেট একদিকে মিলারদের সরকারি গুদামে চাল সরবরাহে অনুৎসাহিত করছে, অন্যদিকে সরকারকে আমদানির ওপর বিদ্যমান ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে দেশে চাল সংকট থেকেই যাচ্ছে। এদিকে সরকার জি টু জি ভিত্তিতে ভিয়েতনাম থেকে যে চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে, তা পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে আটকে আছে। সেই চাল কবে নাগাদ আসবে, সে বিষয়েও কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে সরকারের একাধিক মন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আমদানি করা চাল দেশের বাজারে এসে পৌঁছালেই চালের দাম কমবে। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে আরও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

ভিয়েতনাম থেকে আমদানি তালিকার চালের মধ্যে ৫০ হাজার টন সেদ্ধ ও দুই লাখ টন আতপ চাল রয়েছে। প্রতিটন চাল আমদানি করা হবে ৪৭০ মার্কিন ডলার। প্রতিকেজি আমদানি করা এ চালের দাম পড়বে (১ ডলার= ৮০ টাকা) ৩৭ টকা ৬০ পয়সা।

সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলতি অর্থবছরে ২২ হাজার ৪৬৩ চালকল মালিকের সঙ্গে বোরো চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা সরকারি গুদামে মাত্র ৮ লাখ টন চাল সরবরাহ করবে বললেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৭ হাজার ২৭৮ টন চাল পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য খাদ্যমন্ত্রী নিজে উত্তরাঞ্চলে মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপরও চাল সংগ্রহে গতি আসেনি। মিলাররা বলছেন, বাজারে চালের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা বাজারে চাল বিক্রি করছে না। আমরা চাল পাব কোথায়? আমাদের গুদামে চাল নেই। এদিকে কৃষকরা বলছেন, আমরা তো ধান ও চাল অনেক আগেই মিলারদের দিয়ে দিয়েছি। আমাদের গোলায় তো চাল বা ধান কোনোটাই নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একমাত্র মিলারদের কারসাজিতেই বাজারে চালের বাজার অস্থির হয়ে পড়েছে। তারাই অতি মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে বাজারে চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছেন। তারা নানা অজুহাতে তাদের মজুদ করা চাল বাজারে ছাড়ছেন না। বিষয়টি সরকার আঁচ করতে পেরেছে। এ কারণেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার মাঠ পর্যালোচনায় নেমেছে। মিলাররা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ধান-চাল মজুদ করে থাকতে পারেন, এমন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের প্রকৃত মজুদ জানতে চেয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মিলারদের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছে। মিলারদের মধ্যে বেশিরভাগ চালকল মালিকের কাছে খাদ্য অধিদফতরের চিঠি পৌঁছে গেছে। কেউ কেউ তার প্রাপ্তিস্বীকারও করেছেন।

মিলাররা খাদ্য অধিদফতরের চিঠি পেয়ে তারা তাদের মজুদ জানানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। অনেকেই বলেছেন, সরকার প্রতি কেজি চালের দর নির্ধারণ করেছে ৩৪টাকা। অথচ বাজারে দাম ৪৫টাকার ওপরে। এ অবস্থায় বেশি দাম দিয়ে চাল কিনলে লোকসানের মুখে পড়ব। মজুদের প্রশ্নই ওঠে না। গুদামে চালের মজুদ নেই।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদফতরের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে চালকল মালিকদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারা কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চাল নিয়ে কারসাজি করছেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চালের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন খাদ্য অধিদফতরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা মিলারদের গুদামে চাল আছে। 

এদিকে আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে বেসরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি  উৎসাহিত করতে চালের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনার কথাও বিবেচনা করছে সরকার। বিষয়টি জানাজানির পর অনেকেই পরিকল্পনা দিয়ে বসে আছেন, তারা চাল আমদানি করবেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাল আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও বাজারে সে অনুপাতে চালের কখনোই দাম কমবে না। এ কারণেই ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় এখন চুপ করে বসে আছেন।

তবে বিষয়টি অস্বীকার করে বাণিজ্যন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘ট্যাক্স বিষয়ে আগে থেকে কিছু বলা ঠিক হবে না। এতে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’

জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘মজুদ ঠিক আছে। সরকারের মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। তবে হাওরের বন্যায় যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে সরকার জি-টু-জি পদ্ধতিতে সরকার ভিয়েতনাম থেকে ৬ লাখ টন চাল আদানির উদ্যোগ নিয়েছে। যা অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশে এসে পৌঁছাবে।’ এর বেশি কোনও বিষয়ে কথা বলতে সম্মত হননি খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। 

এদিকে সরকারি গুদামে চালের মজুদ কমে গেছে। বিষয়টি স্বীকার করতেই চান না সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তারা বলছেন, হাওরের বন্যায় যে ধান নষ্ট হয়েছে, সেই পরিমাণ ধানই হয়তো ঘাটতি রয়েছে। তার পরিমাণ হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ লাখ মেট্রিক টন। সরকার সেই কারণেই ১০ লাখ টন চাল আমদানি করলেই সেই ঘাটতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে।  কিন্তু খাদ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি জুন মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত সরকারি গুদামে মজুদ আছে এক লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন চাল। যা গত ৬/৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

খাদ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছর এই সময়ে সরকারের গুদামে থাকা চালের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন।

উল্লেখ্য, কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক দেশে গতবছর চাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। তার মধ্য থেকে ৫০ হাজার টন সেদ্ধ চাল বংলাদেশ রফতানি করেছে। তবে সারাবছরই সুগন্ধি চাল রফতানির সুযোগ রয়েছে। এ বছরের চাল উৎপাদনের হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এরই মধ্যে হাওরের অকাল বন্যায় প্রায় ১০ লাখ টেন চাল নষ্ট হয়ে গেছে।   

/এমএনএইচ/

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x