কোরবানির চাহিদা মেটাবে ৪৫ লাখ দেশীয় পশু

শফিকুল ইসলাম ২২:০২ , আগস্ট ১১ , ২০১৭

ভারত থেকে আমদানি না হলে কোরবানিতে গরুর সংকট তৈরি হবে— এমন ধারণা বদলে গেছে। গত বছরের মতোই কৃষকের ঘরে ও খামারে পালিত দেশীয় গরু-ছাগল দিয়েই কোরবানির পশুর চাহিদা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে দেশে কোরবানিযোগ্য গরু-মহিষের সংখ্যা ছিল ৪৪ লাখ ২০ হাজার। আর ছাগল-ভেড়ার চাহিদা ছিল ৭০ লাখ ৫০ হাজার। এ চাহিদার শতভাগ মেটানো হয়েছিল দেশীয় পশুর মাধ্যমেই।

কোরবানির পশুর হাট (ফাইল ছবি)প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছর কোরবানি হয়েছে ৪২ থেকে ৪৪ লাখ গরু। এর মধ্যে ৩০ লাখের জোগান এসেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের কাছ থেকে। আর দাম ভালো পাওয়ার আশায় সাধারণ গৃহস্থের ঘরে পালিত ১২ লাখ গরু উঠেছিল হাটে।

বিভাগীয় শহরগুলোতে মোট ৬০টি হাট এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৫৪০টি বড় হাটে দেশি গরুর বিপুল সরবরাহ থাকায় গত বছর সংকট হয়নি বলে মনে করছেন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এবারও ব্যতিক্রম হবে না বলে আশাবাদী তারা। তাদের ভাষ্য, ‘এবারও কোরবানির পশুর সংকট হবে না। দেশি গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল দিয়েই কোরবানির পশুর চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।’

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, এ বছরও ৪৪ থেকে ৪৫ লাখ পশু কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের কৃষকদের খামারে পালিত পশু দিয়েই এই চাহিদা মেটানো সম্ভব। কারণ এ বছরও ক্ষুদ্র এবং মাঝারি খামারিদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে ৩০ থেকে ৩২ লাখ গরু। আর গৃহস্থের ঘরে পালিত গরু ও মহিষ পাওয়া যাবে ১০ থেকে ১৪ লাখ। আর ছাগল ও ভেড়া তো আছেই।

এ বছরও কোরবানির পশু সংকটের কোনও আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বছর কোরবানিতে দেশে পশু সংকট হয়নি। এবারও হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে খামারিদের ব্যাংক ঋণের সুবিধাসহ নানান সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কাজেই খামারিরা কোরবানির অপেক্ষায় রয়েছে।’

মন্ত্রী আরও জানান, বন্যায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফসলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে কিছু খামারি তাদের পালিত গরু নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তারা লোকসানের আশঙ্কা করেছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে দেশের সর্বত্র জেলা প্রশাসনের সহায়তায় এ পরিস্থিতি থেকে উতরে উঠতে পেরেছেন বলে মনে করেন ছায়েদুল হক। তার ভাষ্য, ‘কোনও খামারে বন্যার পানি উঠলে সেখান থেকে পশুগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে গো-খাদ্যের যোগান দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ে যেন পশুগুলোর কোনও রোগ-বালাই না হয় সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা-উপজেলায় চিকিৎসকদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।’

দুই বছরে পরিপক্ব গরু উৎপাদনের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ছায়েদুল হক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে গরু পরিপক্ব হতে ছয়-সাত বছর লাগে। কিন্তু ব্রাজিলের বুলের (ষাঁড়) মাধ্যমে দুই বছরে পরিপক্ব গরু উৎপাদনে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। উৎপাদন বাড়াতে ব্রাজিল থেকে প্রযুক্তি এনে তা ব্যবহারের মাধ্যমে দেড়-দুই বছরের মধ্যে গরু পরিপক্ব করে তোলা হবে। এ বিষয়ে ব্রাজিলের কৃষি ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।’

অবৈধ-ক্ষতিকর উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণ রোধে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন বলেও জানান ছায়েদুল হক। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নিরাপদ গরু ও ছাগল উৎপাদন করতে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা কৃষকদের বাড়ি ও খামারে গিয়ে তদারকি করছেন। এমনকি কোরবানির পশুর হাটগুলোতে মনিটরিং টিম থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী।

এ দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর উল্লেখ করে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘আগে হাল চাষ করা হতো গরু দিয়ে। এখন পাওয়ার টিলার ব্যবহার হয়। মানুষ এখন আর আগের মতো গরু পালন করে না। আগে প্রতিটি বাড়িতে গরুর গোয়াল ছিল, এখন গ্রামে সেটি পাওয়া যায় না। তবে গরুর খামার ঠিকই দেখা যায়।’

সারাবছর দেশে যে পরিমাণ গবাদি পশুর চাহিদা থাকে, কোরবানি ঈদে সেই সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাই এ উৎসবকে সামনে রেখে খামারি ও কৃষকরা পশু লালন-পালন করেন বছরের শুরু থেকে। ঈদ ঘনিয়ে আসছে, তাই এই সময়ে পশুর যত্ন নিতে ব্যস্ত খামারিরা। তবে একই সঙ্গে উদ্বিগ্নও তারা। কারণ সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু এলে লোকসানে পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী— কোরবানির বাজারে দেশে ৪০ লাখ গরু, সাড়ে ২১ লাখ ছাগল ও দেড় লাখের মতো অন্যান্য পশু বিক্রি হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের একটি সূত্র জানায়, ভারতীয় গরু কম আসবে বুঝতে পেরে সাত মাস আগে প্রস্তুতি শুরু করেন তারা। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই সংস্থা দেখেছে, কোরবানির উপযোগী ৪০ লাখ হৃষ্টপুষ্ট গরু ও ৬৯ লাখ ছাগল ছিল। হাটে তুলতে এসব পশুর মালিকদের উৎসাহিত করা হয় অধিদফতরের পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব টিপু সুলতান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও রাজধানী ঢাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য আছে আমাদের। আমরা আশা করছি, এ বছরও লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হবো। কারণ জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছরই দেশের সর্বত্র পশু কোরবানির সংখ্যা বাড়ছে।’

/এসআই/জেএইচ/

x