উদ্যোক্তাদের কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা

সঞ্চিতা সীতু ১১:০১ , ফেব্রুয়ারি ১৩ , ২০১৮

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ছবি: সংগৃহীতউদ্যোক্তাদের ব্যর্থতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে বসেছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অন্তত ১০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সরকার সেই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ শুরু করলেও দেশের বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র বলছে, এখন সরকার এসব বিষয়ে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে একটু বেশি দামেই বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একশ্রেণির উদ্যোক্তা এ সময় কেন্দ্র নির্মাণের আবেদন করে। সরকারও তাদের আবেদন গ্রহণ করে কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়। অথচ সরকারের কাছ থেকে এত বড় সুযোগ পাওয়ার পরও তা কাজে লাগাতে পারেনি তেমন কেউ।

বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্মসচিব (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) মো. আলাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া আর কারও কোনও অগ্রগতি দেখিনি।’ সম্প্রতি তিনি টেকনাফে ২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘কেন্দ্রটির স্টিলের ফ্রেম বসানো হয়ে গেছে। তারা সোলার প্যানেল নিয়ে এসেছে। আশা করা যায় তা শিগগিরই বসে যাবে।’ অন্য কেন্দ্রগুলোর অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আর কারও তেমন অগ্রগতি নেই। সরকার আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চাইলেও উদ্যোক্তারা পেরে উঠছেন না।’

বাস্তবেও একই অবস্থা দেখা গেছে। সম্প্রতি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, তাতে একটি কেন্দ্রের অবস্থাকে ভালো বলা হচ্ছে। বাকিগুলোর কাজ এখনও শুরুই হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বাস্তবায়ন অগ্রগতি নেই বলে অনেক প্রকল্প বাতিল করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই হাজার ৪৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করতে হবে। কিন্তু কোম্পানিগুলোর কাজের ধীরগতির কারণে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়িতে ৫০ মেগাওয়াট, টেকনাফে ২০০ মেগাওয়াট, সুমানগঞ্জের ধর্মপাশায় ৩২ মেগাওয়াট, কক্সবাজারে ২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৫০ মেগাওয়াট, কক্সবাজারে ২০০ মেগাওয়াট, রংপুরে ৩০ মেগাওয়াট, গাইবান্ধায় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কোনও অগ্রগতি নেই। এর মধ্যে ৩৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্রয় চুক্তি সই হয়েছে।

এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে কক্সবাজারের ২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির কাজ চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে কেন্দ্রটি চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া দুটি কেন্দ্র বাস্তবায়নকারী কোম্পানির তাদের সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। দুটি কেন্দ্র বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করার কারণে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বাকিগুলো কোনও কাজই শুরু করতে পারেনি।

সম্প্রতি এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সৌর বিদ্যুতের উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ শুরু করার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরেজমিন কেন্দ্রের বাস্তবায়ন এলাকাও পরিদর্শন করা হয়েছে। এলাকায় মালামাল না দেখলে এসব উদ্যোক্তাকে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জানা যায়, এর মধ্যে শুধুমাত্র টেকনাফে বাস্তবায়নাধীন ৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির মালামাল এসেছে। বাকিগুলোর এখন পর্যন্ত কোনও খবর নেই।

একদিকে সময়মতো কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে পারছে না, অন্যদিকে এই কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুতের দাম বেশি। বর্তমানে প্রযুক্তির দাম কমায় সারাবিশ্বে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় কমে আসছে। সেখানে বাস্তবায়ন না করতে পারা এসব বেশি দামের বিদ্যুৎ প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, এর আগে ১৮ থেকে ১৯ সেন্টে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ক্রয় চুক্তি হয়েছে। এখন এই দর ১২ সেন্টে নেমে এসেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বাস্তবায়ন হয়নি এমন প্রকল্প থেকে এখনও অতিরিক্ত দরে বিদ্যুৎ কেনা সঠিক পদক্ষেপ হতে পারে না। দিনের পর দিন সৌর বিদ্যুতের দাম সারাবিশ্বে কমছে। আমাদের এখানেও কমবে। কাজেই এখন অতিরিক্ত দামের এসব কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা যেতেই পারে। তবে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিআর) শর্ত অনুযায়ী, কোনও প্রকল্প বাতিল করতে হলে ২ বছর থেকে ১৮ মাস সময়ের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, সুনামগঞ্জের ৩২ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি স্থাপন করবে এডিসন-পাওয়ার পয়েন্ট অ্যান্ড হাওড় বাংলা-কোরিয়া গ্রিন এনার্জি লিমিটেড। গত বছরের সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রটি চালু হওয়ার কথা থাকলে এখন তারা সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে। কক্সবাজারের ২০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি জৌলাস পাওয়ার লিমিটেড (জেপিএল) স্থাপন করবে। কেন্দ্রটির চলতি মাসের ১২ তারিখ উৎপাদনে আসার কথা। এ কেন্দ্রের এখন সিভিল ওয়ার্ক ও স্ট্রাকচারাল কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক চলছে। ময়মনসিংহের কেন্দ্রটি স্থাপন করবে এইচডিএফসি সিনপাওয়ার লিমিটেড। এ বছরের ৮ এপ্রিল উৎপাদনে আসার কথা এই কেন্দ্রের। কিন্তু কোনও কাজ না শুরু হওয়ায় কোম্পানিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, কক্সবাজারের ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি স্থাপন করবে সান এডিসন এনার্জি হোল্ডিং। আগামী ৮ জুলাই তাদের উৎপাদনে আসার কথা। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু না করার কারণে তাদেরকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। আর তারা সময় বাড়ানোর আবেদন করলেও তা বাতিল করা হয়েছে। রংপুর ৩০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি যৌথভাবে স্থাপন করবে ইন্ট্রাকো সিএনজি ও জুলি নিউ এনার্জি কোম্পানি। এ বছরের ২৬ নভেম্বর এই কেন্দ্রের উৎপাদনে আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও কাজ শুরু করতে পারেনি কোম্পানিটি। গাইবান্ধায় ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটিতেও কোনও কাজ শুরু হয়নি। তাদের উৎপাদনে যাওয়ার কথা আগামী বছরের ২৫ এপ্রিল।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহম্মদ হোসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি করার সময় তারা যেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করে, সে বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল। এখন বিভিন্ন অজুহাতে তারা সময় বাড়ানোর আবেদন করছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।’ মহাপরিচালক বলেন, ‘কিছু কোম্পানির কাজের অগ্রগতি বিবেচনা করে সময় বাড়ানোর আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বাকিদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হতে পারে। কারণ, এই সময় বসে থাকার চেয়ে নতুন করে চুক্তি করা ভালো। এতে কাজের গতি বাড়বে। তবে এক্ষেত্রে তাদের কিছুটা সময়ও দেওয়া হবে।’

 

/টিআর/আপ-এসটি/এমওএফ/

x