জনতুষ্টির বাজেটে চাপ বাড়বে ব্যাংক খাতে

গোলাম মওলা ১৬:৪৩ , মে ১৬ , ২০১৮

বাজেট ২০১৮-২০১৯

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার জনতুষ্টির  বাজেট দেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে  এই বাজেটে চাপে পড়বে দেশে ব্যাংকিং খাত। সাধারণ জনগণকে খুশি রাখতে বাজেটে একদিকে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হতে পারে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে করপোরেট করের হারও কমানো হতে পারে। এর ফলে বাজেটে যে ঘাটতি হবে।  এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকঋণের টার্গেট ধরা হচ্ছে ৫৯ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে ঋণ নেওয়ার টার্গেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় তিনগুণ।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার ব্যাংক থেকে যদি প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা চাহিদা মতো ঋণ পাবে না। যদিও তারল্য সংকটকে কেন্দ্র এখন ব্যাংক খাতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাত ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব পড়বে।’

জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে (সংশোধিত বাজেটে) ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৪ কোটি টাকা। অবশ্য মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫৯ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হবে চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে এই খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা বেশি। সংশোধিত বাজেটের চেয়ে এই অঙ্ক ৩৯ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা বেশি।

এ প্রসঙ্গে বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের খুশি করার জন্য আগামী বাজেটে করখাতে খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বর্ধিত হারে রাজস্ব আদায়ও সম্ভব হবে না। এ কারণে বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর ভরসা করতে হচ্ছে। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যদি না কমানো হয়, তাহলে আগামী অর্থবছরে ব্যাংক থেকে এত বিশাল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।’

সরকারের ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ঋণ নেওয়া হয়েছিল মাত্র ৫১৪ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক ঋণের টার্গেট ছিল ৩১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঋণ নেওয়ার টার্গেট ছিল ২৩ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা।

অবশ্য সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটে জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়—এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘এবার নির্বাচনি বছর। নির্বাচনি বছরে নতুন উদ্যোগ নেওয়া যায় না। আগামী বাজেটে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার চেয়ে পুরনোগুলো শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হবে।’ এছাড়া  সম্প্রতি প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোরও পাশপাশি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট ট্যাক্স কমানোর ইঙ্গিত দেন। আগামী বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা হবে বলেও জানান তিনি।

আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ৩০ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বছরের বাজেট পাস হবে, যা পরের দিন ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে।

এদিকে, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংগঠনের পক্ষ থেকে আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর দাবি উঠেছে। তাদের দাবি ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা করার। অব্যাহতভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়াসহ মূল্যস্ফীতিকে বিবেচনায় নিয়ে তা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পর এ হার বাড়ানো হয়নি। আগামী বাজেটকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের।

সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়, যা তিন বছর ধরে বহাল রয়েছে।

/টিএন/

x