আদালতে বিদ্যুৎবিভ্রাটের ঘটনায় পিডব্লিউডি-ডিপিডিসির দায়িত্বে অবহেলা ছিল: তদন্ত প্রতিবেদন

সঞ্চিতা সীতু ২০:১৫ , অক্টোবর ১১ , ২০১৮

ডিপিডিসি-পিডব্লিউডি২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণার সময় (বুধবার, ১০ আগস্ট) ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর এজলাসে বিদ্যুৎবিভ্রাটের ঘটনায় গঠিত দুই তদন্ত কমিটি বিদ্যুৎ বিভাগে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বুধবার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দুই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা না মালার রায় ঘোষণার সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আদালত। দুই প্রতিবেদনেই জেনারেটর না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।  

উভয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শর্টসার্কিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আদালতের বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর রেখে এই সমস্যার সমাধান করা যেতো। কিন্তু ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) আগে থেকেই সে ধরনের কোনও প্রস্তুতি নেয়নি। যা এক ধরনের দায়িত্বে অবহেলা বা অনীহা হিসেবে দেখছে তদন্ত কমিটি।

জানা যায়, বছর তিনেক আগে একই আদালতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।এরপর সম্প্রতি সংসদ ভবনেও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের ঘটনায় কোম্পানিটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।পরে তদন্ত কমিটি গণপূর্ত অধিদফতরের ওপর দায় চাপিয়ে ডিপিডিসিকে রক্ষা করে।

বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘চকবাজারের নুরানী কোল ড্রিংক নামের একটি দোকানের সামনে থাকা তারে শর্ট সার্কিট হয়।তারের ওপর ধুলাবালি পড়ে ছিল। পাশাপাশি গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির কারণে আর্থিং হয়ে যায়। এরপর শর্টসাকির্ট হয়ে আগুন ধরে যায়।ওই তারের ফল্টের কারণেই বিশেষ আদালতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে। সেক্ষেত্রে ডিপিডিসির বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সেখানে স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর রাখা উচিত ছিল। যা ডিপিডিসি রাখেনি। ফলে তারা দায়িত্বেও অবহেলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারে না।’

ডিপিডিসির পরিচালক (অপারেশন) হারুন অর রশিদ জানান, ‘পিডব্লিউডিকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল, তাদের জেনারেটরটি নষ্ট কিন্তু তারা তা ঠিক করেনি।’
এদিকে তদন্ত কমিটির সদস্য বলছেন, ‘ট্রাইবুন্যলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব ডিপিডিসির। পিডব্লিউডি এর জেনারেটর নষ্ট জানার পর ডিপিডিসি উচিত ছিল বিকল্প জেনারেটরের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তারা তা করেনি।’

উল্লেখ্য, বুধবার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রথমবার ১১টা ৪২ মিনিট থেকে ১২টা ৩ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায়।এরপর মেরামত করার পর আবার পাশের তারে শর্টসার্কিটের কারণে আগুন লাগে। এতে আবারও ৫ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হয়।

পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে অবস্থিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে (অস্থায়ী) বুধবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের সময় একঘণ্টার মধ্যে দুই দফা বিদ্যুৎবিভ্রাটের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যেই ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন তার পর্যবেক্ষণ ও বিচারে বিবেচ্য বিষয়গুলো পড়তে থাকেন। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনাকীর্ণ আদালতের ভেতরে বাইরে থাকা আইনজীবী ও সাংবাদিকরা বিপাকে পড়ে যান। সাউন্ডবক্স বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিচারকের দেওয়া বক্তব্য শোনা যাচ্ছিল না। বিচারক যখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ বিভিন্ন আসামির বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করছিলেন তখনও বিদ্যুৎ ছিল না। এ ঘটনায় ঢাকা পাওয়ার ডিপিডিসির লালবাগ নেটওয়ার্ক অপারেশন অ্যান্ড কাস্টোমার সার্ভিস (এনওসি)-এর চার কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিপিডিসির চিফ ইঞ্জিনিয়ার সরওয়ার এ কায়নাত নুরকে প্রধান করে তিন সদস্যের এবং বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম-সচিব ফয়জুল আমিনকে প্রধান করে চার সদস্যের দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বিশেষ আদালতটি ডিপিডিসির লালবাগ জোনের অধীনে। লালবাগ এনওসি জানায়, বেলা ১১টা ৪২ মিনিটে নুরানি কোল ড্রিংকের দোকানের সামনের এরিয়াল ক্যাবলে আগুন ধরে যায়।তখন বিশেষ আদালত প্রাঙ্গণেই ডিপিডিসির একটি টিম স্ট্যান্ডবাই ছিল।লালবাগ এনওসি থেকে মালামাল নিয়ে গাড়ি রওনা দিলেও রাস্তার জ্যামের কারণে দেরি হচ্ছিল।

এ বিষয়ে ডিপিডিসির পরিচালক (অপারেশন) হারুন অর রশিদ বলেন, ‘রায়ের বিষয়ে তারা আগে থেকেই সর্তক ছিলেন। তাই দ্রুত লাইন মেরামত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। এমন কোনও ঘটনা ঘটলে জেল খানার মধ্যে একটি পিডব্লিউডি-এর জেনারেটর চালু হওয়ার কথা। সেটিও চালু হয়নি বলে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়নি।’

জানা যায়, জরুরি মুহূর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আদালত চত্বরে মজুদ রাখা জেনারেটরটিও কাজ করেনি। দীর্ঘদিন ধরে এটি বিকল রয়েছে। সে সম্পর্কে আদালত এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী গণপূর্ত অধিফতর (পিডব্লিউডি) বিতরণ সংস্থাকে অবহিত করেনি।তাই দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ডিপিডিসিও খোঁজ নেয়নি।

ডিপিডিপির তদন্ত কমিটির প্রধান প্রকৌশলী সরওয়ার এ কায়নাত নুর বলেন, ‘মূলত শর্টসার্কিট থেকে তারে আগুন লেগে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই সমস্যা হয়। ফলে  কাউকে দায়ী করা যচ্ছে না।’

আরও পড়ুন: আদালতে বিদ্যুৎবিভ্রাটের ঘটনায় ডিপিডিসির চার কর্মকর্তা বরখাস্ত

/এসএনএস/

x