আন্দোলনকারী শ্রমিকরা কী চান?

গোলাম মওলা ১৬:৩৬ , জানুয়ারি ০৯ , ২০১৯

রাস্তায় আন্দোলনরত গার্মেন্টস শ্রমিকরা

সরকার নতুন মজুরি কাঠামো পর্যালোচনার জন্য কমিটি করে দিলেও টানা চতুর্থ দিনের মতো সড়কে নেমেছেন পোশাক শ্রমিকরা। বুধবার (৯ জানুয়ারি) রাজধানীর মিরপুরের কালশি,  সাভার ও আশুলিয়ার রাস্তায় অবস্থান নেন পোশাক শ্রমিকেরা। পুলিশের সঙ্গে কয়েকটি জায়গায় তাদের সংঘর্ষও হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার (৯ জানুয়ারি) এক বৈঠকে মালিক পক্ষের পাঁচ জন, শ্রমিক পক্ষের পাঁচ জন এবং সরকারের বাণিজ্য সচিব ও শ্রম সচিবকে নিয়ে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে মজুরির অসঙ্গতিগুলো খতিয়ে দেখবে এবং সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিনুল হক আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মজুরির অসঙ্গতিগুলো দূর করতে এক মাস সময় না নিয়ে যদি তিন দিন বা এক সপ্তাহ সময় নেওয়া হতো, তাহলে এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হতো। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে— সেটিও মন্দ হয়নি।’ তিনি মনে করেন, ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে আসবে।

মঙ্গলবারের (৮ জানুয়ারি) বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পোশাক শ্রমিকদের বেতন কাঠামোতে কোনও বৈষম্য বা অসঙ্গতি থেকে থাকলে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তা সংশোধন করা হবে। ফেব্রুয়ারিতে সংশোধিত গ্রেডিংয়েই বেতন পাবেন শ্রমিকরা। এই সিদ্ধান্তের পরও কেন আন্দোলন হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদ-উল ইসলাম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মজুরির অসঙ্গতিগুলো দূর করতে এক মাস সময় নেওয়া ঠিক হয়নি। এটি তিন দিনেই সমাধান করা যেত। এখন পর্যন্ত ওই কমিটিতে শ্রমিকদের কারা থাকবেন, তা জানা গেলো না। মালিকদের কারা থাকবেন, জানা যাচ্ছে না। কমিটি এখনও কাজ শুরু করেনি। আবার মঙ্গলবারের বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা হয়তো শ্রমিকদের অনেকেই জানেন না।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরনো (আগের) বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয় গ্রেডের শ্রমিকদের (সিনিয়র অপারেটর) মূল বেতন পাওয়ার কথা  ৫ হাজার ২০০ টাকা। অথচ গত ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটের নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে এই গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন ধরা হয়েছে ৫ হাজার ১৬০ টাকা। অর্থাৎ, নতুন মজুরি কাঠামো অনুসরণ করতে গিয়ে তৃতীয় গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন আগের বছরের চেয়ে কমেছে ৪০ টাকা।’

তিনি বলেন, ‘নতুন মজুরি কাঠামো অনুসরণ করতে গিয়ে চতুর্থ গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে মাত্র ৮২ টাকা এবং পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে মাত্র ১৬৮ টাকা।’

মোশরেফা মিশু উল্লেখ করেন, আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ী— চতুর্থ গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন ছিল ৪ হাজার ৮৪৮ টাকা। কিন্তু নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, এই গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৩০ টাকা। অর্থাৎ, নতুন মজুরি কাঠামো অনুসরণ করার ফলে এই গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন বেড়েছে মাত্র ৮২ টাকা। একইভাবে আগের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন পাওয়ার কথা ৪ হাজার ৫০২ টাকা। নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, এই গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৭০ টাকা। অর্থাৎ নতুন কাঠামো অনুসরণ করার ফলে পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের মূল বেতন আগের চেয়ে বেড়েছে মাত্র ১৬৮ টাকা।

তিনি জানান, নতুন কাঠামো অনুসরণ করায় সপ্তম গ্রেডের পোশাক শ্রমিকদের বেতন বেড়েছে ২ হাজার ৭০০ টাকা। আগের কাঠামো অনুযায়ী, এই গ্রেডের শ্রমিকরা ৫ হাজার ৩০০ টাকা পেতো। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, সপ্তম গ্রেডের পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি করা হয় ৮ হাজার টাকা।

গত ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত গেজেটে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে নতুন মজুরি কাঠামো অনুযায়ী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

মোশরেফা মিশু উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের মাত্র ১০ শতাংশ সপ্তম গ্রেডে কাজ করেন। অথচ মোট শ্রমিকের ৮০ শতাংশই রয়েছেন তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে। তিনি বলেন, ‘নতুন বেতন কাঠামোর সপ্তম গ্রেডের মতো তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের শ্রমিকদের বেতনও ২ হাজার ৭০০ টাকা বাড়ানো হলে মজুরি বৈষম্য কমে আসবে।’

প্রসঙ্গত, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও অন্যান্য খাতের শ্রমিকদের মজুরির বিবেচনায় পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবি ছিল বিভিন্ন বাম শ্রমিক সংগঠনের। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় বিক্ষোভ, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে সংগঠনগুলো।

এক সপ্তাহ ধরে ন্যূনতম মজুরির দাবিতে রাজধানীর উত্তরা, সাভার ও আশুলিয়া এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। মঙ্গলবার মজুরি নিয়ে অসন্তোষ-বিক্ষোভের মধ্যে সুমন মিয়া নামে এক শ্রমিক মারা যান। এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে পোশাক শ্রমিকদের ১২ সদস্যের একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করা হয়। মঙ্গলবার শ্রম ভবনে সরকার, মালিক ও শ্রমিকের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকটি হয়। এই কমিটি এক মাসের মধ্যে পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকার ঘোষিত বেতন কাঠামোর কোনও গ্রেডের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেবে। বৈঠকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা বলা হয়। তবে এরইমধ্যে আজ বুধবার (৯ জানুয়ারি) আবারও নতুন করে শ্রমিক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

এফবিসিসিআই’র সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকদেরকে ভুল বুঝিয়ে একটি পক্ষ তাদেরকে আন্দোলনে রাখছে। মঙ্গলবারের বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা বলেছি, মজুরির অসঙ্গতিগুলো এক মাসের মধ্যে ঠিক হবে। কাজেই এখন আন্দোলনে থাকার কোনও যৌক্তিকতা নেই।’

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মজুরির অসঙ্গতিগুলো সমাধান করা হবে— এটা আমরা বলেছি। তারপরও যারা আন্দোলনে থাকছে, তাদের অন্য কোনও এজেন্ডা আছে। তা না-হলে আজ  কেন তারা অফিস ফেলে রেখে রাস্তায় থাকবে।’

জানতে চাইলে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে যাওয়া উচিত। মজুরির অসঙ্গতিগুলো যেহেতু এক মাসের মধ্যে সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এখন আন্দোলনের কোনও যুক্তি নেই।’

এদিকে ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিতকরণ, অপারেটর ও হেলপারের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূর করার দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে তারা টানা চারদিন ধরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুরে আন্দোলন করছেন। উল্রেখ্য, বেতন কাঠামোতে বৈষম্য দূর করাসহ বিভিন্ন দাবিতে ৬ জানুয়ারি থেকে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা।
ছবি: নাসিরুল ইসলাম

 

/এপিএইচ/

x