বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থানই বড় চ্যালেঞ্জ

সঞ্চিতা সীতু ১৩:৩৪ , মার্চ ১৩ , ২০১৯


বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থানকেই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকার নীতির পরিবর্তন করেনি। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এককভাবে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে। এতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উভয়ের দাম বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনও বিকল্প থাকবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. তামিম বলেন, ‘প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমাদের দেশীয় সরবরাহ। সাগরে ও স্থলভাগে সমানতালে অনুসন্ধান কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে খুব শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা জরুরি। সেই দরপত্রে গ্যাসের দাম অবশ্যই রিজনেবল ও আকর্ষণীয় হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের নিজেদের কয়লা উত্তোলন করতে হবে। বাকিটা পূরণ করতে এলএনজি আমদানি করতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু কয়লাও আমদানি করা যেতে পারে। যদিও কয়লা আমদানি কিছুটা কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সবার আগে সাগরে জরিপ কাজটি করা জরুরি। কাজটা এখন দিয়ে দিলে আগামী নভেম্বরে তারা কাজ শুরু করতে পারবে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা পেয়েছি চার বছর হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত কোনও কাজে লাগাতে পারেনি।’
দেশে অবশিষ্ট গ্যাস দিয়ে বড় জোর ৭-৮ বছর চলবে- এমন আশঙ্কা করছে পেট্রোবাংলা। গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে আসায় দেশে নতুন গ্যাস চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে গ্যাস চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে চাইলে বিদেশ থেকে তাকে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করে আনতে হবে। গত বছর সরকারি-বেসরকারি খাতে এলএনজি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় কোম্পানি নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি জার্মানির সিমেন্স, চীনের সিএমসি এবং যুক্তরাজ্যের বিপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পায়রাতে তিন হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের এলএনজি চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। এর বাইরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেক্ট্রিক (জিই)-এর সঙ্গে সমান ক্ষমতার একটি এলএনজি চালিত কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করেছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে সামিট গ্রুপ জিইএ’র সঙ্গে দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এবং ইউনিক পাওয়ার আরও ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে এমওইউ সই করেছে। প্রাথমিক জ্বালানিতে টান পড়বে এমন ধারণা থেকেই দেশীয় গ্যাসের বদলে এলএনজিতে যাচ্ছে সরকার। এছাড়া খুলনার রূপসাতে আরও এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি।
প্রতি ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। এখন নির্মাণ চুক্তির মধ্যে থাকা ১১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক এলএনজির চাহিদা দাঁড়াবে ৫৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যার পুরোটাই আমদানি করে মেটাতে হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত গভীর সাগরে কিছুই আবিষ্কার করতে পারিনি। স্থলভাগেও আমাদের সুযোগ আছে। আমরা আমাদের নিজেদের গ্যাস আবিষ্কারে মনোযোগী না। এটি আসলেই কঠিন। টাকা দিতে হবে, ঝুঁকিও নিতে হবে। সে তুলনায় আমদানি করাটা খুব সহজ।’

তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধান না করে সরকার তাই গ্যাস আমদানিতে চলে গেলো। কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে নানা কথা বলে শেষ পর্যন্ত কিছুই করলাম না। দেশের দুটি মূল প্রাথমিক জ্বালানি গ্যাস ও কয়লা যদি উত্তোলন না করা হয় তাহলে তো আমদানি করতেই হবে।’
ড. ইজাজ বলেন, ‘আমদানির যে দাম তাতে জ্বালানির দাম বাড়াতেই হবে। নয়তো ভর্তুকি দিয়েই যেতে হবে। আমদানি যদি করতেই হয়, তাহলে আবার দুটি জিনিস করতে হবে। একটি হচ্ছে, এলএনজি এফিসিয়েন্সি অর্থাৎ সবচেয়ে দক্ষভাবে যেন এলএনজি আমরা ব্যবহার করি। আরেকটি হচ্ছে, আমাদের সিস্টেম প্ল্যানিং যেন সুষ্ঠু থাকে, যাতে এলএনজির যেন কোনও অপচয় না হয়।’
দেশে এখন যে বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেজন্য ২ হাজার ৯৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তবে কেন্দ্রগুলোতে মোট সরবরাহ করা হচ্ছে এক হাজার ১৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট। আগামী সাত থেকে আট বছর পর দেশের গ্যাস ফুরিয়ে গেলে এসব কেন্দ্রের জন্যও এলএনজি আমদানি করতে হবে। নয়তো কেন্দ্রগুলো বসে থাকবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘প্রথমত নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। পুরো জ্বালানি সরবরাহ ব্যয়- প্রাইমারি এনার্জি থেকে সেকেন্ডারি এনার্জি সব কমিয়ে আনা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তা না হলে উৎপাদন ব্যয় বেশি হবে এবং আমদানি করা জ্বালানির ব্যয়ের তুলনায় নিজস্ব উৎপাদন বেশি হবে। যা এখন বাপেক্সের হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের আর উপায় থাকবে না। তাই এটি ঠেকানো সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ আগামী দিনে উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে ব্যাপকভাবে কয়লা ব্যবহার করা হবে।

এখন দুটি এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, একটি এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট কয়লা চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ চলছে। এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ২৪ ঘণ্টা চালাতে হলে ১০ মেট্রিক টন কয়লা প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে এখন নির্মাণাধীন তিন হাজার ৮০০ মেগাওয়াট কয়লা চালিত কেন্দ্রের জন্য দৈনিক প্রয়োজন হবে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন কয়লা। বাৎসরিক চাহিদার পরিমাণ এক কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দিতে হলে নিজেদের কয়লার দিকে নজর দিতে হবে। আগামীতে দেশের জ্বালানি পুরোপুরি আমদানি নির্ভর হচ্ছে। যেসব বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র আসছে সেগুলো আমদানি করা কয়লা ও গ্যাসে চালাতে হবে। এতে খরচও বেশি।’

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে তিনি বলেন, সাগরে গ্যাস খোঁজার কার্যক্রম এখনই গ্রহণ করা উচিত। মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভের কাজ ওপর মহলের সিদ্ধান্তে আপাতত বন্ধ। এটা না হলে বিদেশি কোম্পানি আসতে চাইবে না। জরিপ করে যদি সম্ভাবনার দিকগুলো দেখানো যায় তখন বিদেশি কোম্পানি আগ্রহী হবে। এটা না করতে পারলে জ্বালানি খাত পিছিয়ে পড়বে।

/এসএনএস/এসটি/এমওএফ/

x