পাটকল শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে অর্থমন্ত্রীর ওপর

শফিকুল ইসলাম ২০:৪৬ , এপ্রিল ১৯ , ২০১৯

পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনসরকারের সঙ্গে বৈঠকে চার দফা সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কাজে যোগ দিয়েছেন পাটকল শ্রমিকরা। সোমবার (১৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৭টায় বসে রাত সোয়া ১টা পর্যন্ত চলা বৈঠক শেষে এ চার দফা সিদ্ধান্তে আসে পাটকল শ্রমিক ও সরকার। তবে এ সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন নির্ভর করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর। কারণ এ সমস্যা সমাধানে অর্থের প্রয়োজন। বর্তমানে অর্থমন্ত্রী ও অর্থ সচিব দুজনই বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচিতে ওয়াশিংটন রয়েছেন। তাই এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নিতে পারছে না শ্রম মন্ত্রণালয় ও পাট মন্ত্রণালয়। শ্রম ও পাট মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, পাটকল শ্রমিকদের সঙ্গে সরকারের বৈঠকে যে চার দফা সিদ্ধান্তের আলোকে শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন তার মধ্যে মাত্র একটি দফায় বলা হয়েছে, শ্রমিকদের এক সপ্তাহের বকেয়া মজুরি দেবেন বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান। বাকি তিন দফা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা অর্থ দিয়ে পরিশোধ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে শ্রম অধিদফতরের মহাপরিচালক একেএম মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘সরকার ও শ্রমিকদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৭ মের মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ১৮ মে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী শ্রমিকদের পে-স্লিপ ইস্যু হবে। আগামী ২৫ মের মধ্যে ১০ সপ্তাহের বকেয়া মজুরি আগের হারে এবং তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। এছাড়া  শবে বরাত (২১ এপ্রিল) উপলক্ষে পাটকল থেকে শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি পরিশোধের জন্য বিজেএমসির চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের আরও যেসব দাবি আছে তা নিয়ে আগামী ৮ মে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হবে।’

শ্রম মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, পাটকল সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে অর্থমন্ত্রীর ওপর। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যেই সরকারি পাটকল শ্রমিকদের সমস্যার সমাধান করার কথা ভাবছে সরকার। তবে কতোখানি সম্ভব হবে সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান সরকার। কারণ পাটকল শ্রমিকদের নয় দফা দাবির মধ্যে নতুন বেতন স্কেলের দাবিও রয়েছে। আগামী ২০১৯-২০ নতুন অর্থবছর ছাড়া তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

এদিকে পাটকল শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা কীভাবে কোন খাত থেকে সংস্থান করা হবে তা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেই সমাধান করা হবে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে টেলিফোনে জানিয়েছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএ ফ) বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দিতে এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কাজেই বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এ বিষয়ে কোনও সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ ভর্তুকি বাবদ যে অর্থ বিজেএমসিকে দেওয়া হবে বা দিতে হবে তা অর্থ মন্ত্রণালয়কে ছাড় করতে হবে।

১৫ এপ্রিল শ্রম অধিদফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে উপস্থিত শ্রমিক নেতারা বারবার সরকারের সংশ্লিষ্টদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ইতোপূর্বে বৈঠকে সিদ্ধান্তের পরেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের গড়িমসিতে টাকা ছাড়ে অনেক দেরি হতে দেখা গেছে। ফলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয় না। এতে সরকারের প্রতি আস্থার ঘাটতি তৈরি হয় শ্রমিক নেতাদের মধ্যে। বৈঠকে শ্রমিক নেতারা বলেছেন, ২০১৬ সালেও এমন ঘটনা ঘটেছে। ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ১৫ দিন অতিবাহিত হলেও অর্থ ছাড় করতে গড়িমসি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠকে আন্দোলনরত পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা বাবদ এক হাজার কোটি টাকা ছাড় করার জন্য তাৎক্ষণিক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার মধ্যে ৬০০ কোটি টাকা ছিল পাটকল শ্রমিকদের বকেয়া বেতন। বেতনের টাকার মধ্যে ৩০০ কোটি পহেলা বৈশাখের আগেই এবং বাকি ৩০০ কোটি টাকা পর্যায়ক্রমে পরিশোধের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া কাঁচা পাট কেনার জন্য ২০০ কোটি টাকা এবং পাটশিল্পের উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পুরো বিষয়টি তদারকি করতে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

ওই বছর খুলনায় আন্দোলনরত শ্রমিকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৭টি পাটকলের শ্রমিক-কর্মচারীর বকেয়া পরিশোধ এবং পাট কেনার জন্য সরকার এই এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একই সঙ্গে পহেলা বৈশাখের আগেই বকেয়া মজুরির একটি অংশ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকের অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সরকার।

উল্লেখ্য, বকেয়া মজুরি পরিশোধ ও মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ নয় দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সরকারি পাটকল শ্রমিকরা আন্দোলন করে। এর মধ্যে ছিল– সড়ক, রেলপথ অবরোধ, পুলিশ বক্স ও পুলিশের অ্যাম্বুলেন্সে হামলা, অজ্ঞাত ২০০ থেকে ২৫০ শ্রমিককে আসামি করে মামলা, ট্রেনে ব্যাপক ভাঙচুর এবং পাথরের আঘাতে অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে শুক্রবার (৫ এপ্রিল) সকাল ৬টায় সরকারি ২৬টি পাটকলের শ্রমিকদের ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিজেএমসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেও কোনও সমাধান হয়নি। ফলে তারা সেদিনই ঘোষণা দেন, ১৫ এপ্রিল থেকে আবার আন্দোলন কর্মসূচি চলবে। সেই ঘোষণা মোতাবেক ১৫ এপ্রিল সকাল থেকে আবার আন্দোলনে নেমেছিলো পাটকল শ্রমিকরা।

আন্দোলনরত শ্রমিক নেতারা জানান, খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, আলিম, ইস্টার্ন এবং যশোরের কার্পেটিং ও জেজেআই জুট মিলে বর্তমানে ১৩ হাজার ২৭১ শ্রমিক কাজ করছেন।

শ্রমিকদের দাবির মধ্যে রয়েছে– নিয়মিত সাপ্তাহিক মজুরি ও বেতন প্রদান, সরকার ঘোষিত জাতীয় মজুরি এবং উৎপাদনশীলতা কমিশন-২০১৫ বাস্তবায়ন, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের পিএফ-গ্র্যাচুয়িটি ও মৃত শ্রমিকদের বিমার বকেয়া প্রদান, টার্মিনেশন ও বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল, সেটআপ অনুযায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়োগ ও স্থায়ী করা, পাট মৌসুমে পাট কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মিলগুলোকে পর্যায়ক্রমে বিএমআরই করা।

খুলনার প্লাটিনাম জুটমিলের শ্রমিক খন্দকার আশরাফ আন্দোলন প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ৯ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন বিজেএমসির কর্মকর্তারা। কিন্তু দাবিগুলো এখনও বাস্তবায়ন না হওয়ায় আন্দোলনে নেমেছিলাম।’

একই অঞ্চলের ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বিজেএমসির চেয়ারম্যান এ বছরের ২৮ মার্চের মধ্যে মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এবারের প্রতিশ্রুতি নিয়েও আশঙ্কায় রয়েছি।’

 

/এসআই/এমএএ/

x