চালু হচ্ছে ইএফডি, আপত্তি নেই ব্যবসায়ীদের

শফিকুল ইসলাম ২২:২৬ , জুন ১২ , ২০১৯

ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন

আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথমদিন ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হচ্ছে ভ্যাট বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) আইন। ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে নতুন অর্থবছর থেকেই চালু হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) মেশিন। আগের বছরগুলোয় ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে দেশের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইসিআর (ইলেকট্রোনিক ক্যাশ রেজিস্টার) মেশিন চালুর বিষয়টি সবমহলে আলোচিত হলেও ইসিআরের বদলে ইতোমধ্যেই নতুন করে কেনা হয়েছে ইএফডি মেশিন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইসিআরের তুলনায় ইএফডি মেশিন বেশি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আসন্ন অর্থবছর থেকে ভ্যাট আদায়ে এই প্রযুক্তি চালুর বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত। বাকি দিক নির্দেশনা থাকবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা সাপেক্ষে নতুন ২০১৯ -২০ অর্থবছর থেকেই চালু হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন। এ আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে ব্যাবসায়ীদের সঙ্গে যে মতবিরোধ ছিল তা মিটে গেছে।

শুরুতে ব্যবসায়ীমহলের বিভিন্ন আপত্তির মুখে নতুন ভ্যাট আইনটি কার্যকর করতে না পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।  ফলে অনেক সময় দিয়ে আইনটিতে অনেক সমন্বয় করা হয়েছে। এ কারণে নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে এ মেশিন ব্যবহারে অনাপত্তির কথা সরকারকে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা ।

ইসিআর মেশিনের বদলে ইএফডি মেশিনের ব্যবহার চালুর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কোনও আপত্তি নাই জানিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ‘আমরা দেখতে চাই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে নতুন ভ্যাট আইনটি কার্যকর করুক। ইসিআরের তুলনায় ইএফডি মেশিন স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। এই মেশিনের সঙ্গে এনবিআরের সার্ভারের সরাসরি যুক্ত থাকবে বলে ব্যবসায়ীরাও যেমন ফাঁকি দিতে পারবেন না তেমনই অসাধু কোনও কর্মকর্তা ব্যবসায়ীদের হয়রানি করতে পারবেন না।’

এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত থাকবে সব ইএফডি মেশিন

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারে যুক্ত থাকবে সব ইএফডি মেশিন। প্রতিটি ইএফডির বিপরীতে প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে বিআইএন (ব্যবসায়ী শনাক্তকরণ নম্বর) দেওয়া হবে। একই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একাধিক ইএফডি যন্ত্র থাকলেও বিআইএন একটিই হবে। তবে প্রতিটি যন্ত্রের জন্য এনবিআর থেকে বিশেষ কোড দেওয়া হবে। এর ফলে ইএফডি চালু হলে এনবিআরের বিভিন্ন কাস্টমস এক্সসাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেটে বসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ওই কমিশনারেটের আওতাভুক্ত অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট পরিশোধের তথ্য জানতে পারবেন। বিশেষভাবে কী পরিমাণ পণ্য বিক্রিতে কতটা ভ্যাট পরিশোধ করা হচ্ছে তা সহজে জানার সুযোগ থাকবে।

ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে নির্দিষ্ট সময়েই

এনবিআর সূত্র আরও জানিয়েছে, এক মাসের ভ্যাট পরের মাসের নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে পরিশোধ না করলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট দফতরে বসে রাজস্ব কর্মকর্তারা ইএফডির মাধ্যমে অনলাইনে পরিশোধের সুযোগ স্থগিত করে দিতে পারবেন। ভ্যাট পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়ের এক মিনিট পর অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধ করা যাবে না। এসব যন্ত্র ভ্যাট অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে। ফলে প্রয়োজন মনে করলে ভ্যাট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজ দফতরে বসেই এসব যন্ত্র অকার্যকর করতে পারবেন।

আইনের আওতায় যারা পড়বেন

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, সারাদেশে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সদস্য সংখ্যা ৩০ লাখ। এর মধ্যে যে সব ব্যবসায়ীর বছরে লেনদেন ৫০ লাখ টাকার নিচে, তারা এ আইনের বাইরে থাকবেন।  আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভ্যাটমুক্ত সীমা যদি ৫০ লাখ করা হয় সেক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ দোকান মালিক এই আইনের বাইরে চলে যাবেন। বাকি ২০ শতাংশ দোকান মালিকের সংখ্যা হবে ৫ থেকে ৬ লাখ। এই ৬ লাখ দোকানেই ইএফডি ব্যবহারে আমরা প্রস্তুত। সরকার এখন আমাদের এসব ইএফডি মেশিন দিলেই আমরা ব্যবহার শুরু করবো। এতে ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আসবে।

ভ্যাট স্তর থাকবে ৫টি

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট স্তর রাখা হচ্ছে ৫টি। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশের পাশাপাশি আরও চারটি স্তর হচ্ছে ১০ শতাংশ, সাড়ে ৭ শতাংশ, ৫ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ২ শতাংশ। নতুন ভ্যাট আইনে সর্বমোট ১ হাজার ৯৮৩টি পণ্যকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে এই আইনে প্যাকেজ ভ্যাট রাখা হবে না বলে জানা গেছে। তবে বছরে ৫০ লাখ টাকার কম লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট দিতে হবে না। পাশাপাশি ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেবে যেসব প্রতিষ্ঠান কর রেয়াত সুবিধা পাবে।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের শর্ত হিসেবে কৃষিপণ্য ছাড়া মোবাইল ফোন ও এর যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান, গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রির দোকান, অলঙ্কার বিক্রির দোকান, আসবাবপত্র বিক্রির দোকান, পোশাক বিক্রির কেন্দ্র, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডের দোকান, মিষ্টির দোকান, বুটিক শপ, বিউটি পার্লার, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ সকল পণ্যের যে দোকানে বছরে লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হবে সেই দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আসবে। তবে ভ্যাটের ৫টি স্তরে কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোন স্তরে আসবে তা বাজেটে ঘোষণা করা হবে। এর বাইরেও মৌলিক খাদ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন, গণস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কৃষি, মাছ চাষ, দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অবাণিজ্যিক কার্যক্রম, অলাভজনক সাংস্কৃতিক সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা থাকবে। ।

এ অর্থবছরে ১০ হাজার দোকানে চালু হবে ইএফডি

জানা গেছে, দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সারা দেশে ভ্যাট প্রদানে সক্ষম ৬ লাখ দোকানে ইএফডি মেশিন দেওয়ার আবেদন জানালেও এ অর্থবছরের শুরুতে এনবিআর মাত্র ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন দেবে। এর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে এনবিআর। অর্থবছর শেষে এনবিআর দেবে আরও ৯০ হাজার ইএফডি মেশিন। তবে ব্যবসায়ীরা চাইলে সরকারের কাছ থেকে কিস্তির সুবিধা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও ইএফডি মেশিন কিনতে পারবেন।

তবে এবছর যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক সরকারিভাবে ইএফডি মেশিন পাচ্ছেন না তাদের কাছ থেকে কোন পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করা হবে তা পরিস্কার নয়।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশাররফ হেসেন ভূইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, ২০১৯-২০ নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর হচ্ছে। স্তর থাকছে ৫টি, তা প্রায় নিশ্চিত হয়ে আছে। তবে কোন খাত কোন স্তরে পড়বে তা এখনই বলা ঠিক হবে না। পর্যায়ক্রমে ভ্যাট পরিশোধযোগ্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই ইএফডি মেশিন সরবরাহ করা হবে। এতে কোনও সমস্যা সৃষ্টি হবে না। 

 

/এসআই/টিএন/

x