মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সতর্কতার সঙ্গে চামড়া কেনার পরামর্শ ট্যানারি সংশ্লিষ্টদের

গোলাম মওলা ০৮:১২ , আগস্ট ১২ , ২০১৯

কোরবানির চামড়া (ছবি- সংগৃহীত)গত কোরবানির মতো এবারও চামড়া কিনে যাতে বিপদে না পড়েন সেজন্য মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের আগেভাগেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন চামড়া খাত সংশ্লিষ্টরা। এ খাতের পাইকার, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের আশঙ্কা, এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঝুঁকিতে থাকবেন। কারণ, ট্যানারি পর্যন্ত চামড়া পৌঁছাতে হাতবদলের যে চক্রটি কাজ করে থাকে তার দ্বিতীয় ধাপে রয়েছেন আড়তদাররা। মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা এদের কাছেই চামড়া বিক্রি করতে আসেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজার ঠিক থাকলেও ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে গত বছরের দাম এখনও না পাওয়ায় আড়তদারদের কাছে চামড়া কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা নেই। ফলে তারা সব চামড়া নাও কিনতে পারেন। ফলে যেসব চামড়া অবিক্রিত থেকে যাবে সেগুলো হয়ে যাবে ঝুঁকিপূর্ণ, সময়মতো সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের হাতে এই মুহুর্তে সব চামড়া কেনার মতো টাকা নেই। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবার সব চামড়া হয়ত আমরা কিনতেই পারবো না। তিনি বলেন, ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ ট্যানারি মালিক গত বছরের চামড়ার পেমেন্ট এখন পর্যন্ত দেয়নি। এছাড়া আগের বছরের চামড়ারও বেশ কিছু টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা রয়েছে। তিন বলেন, শতভাগ টাকা পেমেন্ট করেছে এ রকম ট্যানারি আছে মাত্র এক থেকে দুইটা।

তিনি উল্লেখ করেন, গতবারের চেয়েও এবার চামড়ার বাজার খারাপ পরিস্থিতি হতে যাচ্ছে। তার আশঙ্কা, এবার অনেক চামড়া নষ্ট হবে। সময়মতো লবণ দিতে না পারলে পচেও যেতে পারে।

দেলোয়ার হোসেন চামড়া ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলেন, যেসব মৌসুমী ব্যবসায়ী চামড়া কিনবেন, তারা যেন ঈদের দিন চামড়া বিক্রি করার কথা মাথায় না রাখেন।

সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া দামে চামড়া কেনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, তারা যেন চামড়ায় ভালোভাবে লবণ দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে চামড়া কেনেন। কারণ, চামড়ায় ভালো করে লবণ দেওয়া থাকলে কয়েকদিন পরে বিক্রি হলেও লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

প্রসঙ্গত, গত বছর চামড়া কিনে বড় বিপদে পড়েছিলেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। যেসব মৌসুমি ব্যবসায়ী ৭০০ টাকার বেশি দামে গরুর চামড়া কিনেছিলেন, তারাই বিপাকে পড়েছিলেন। শুধু তাই নয়, কয়েক হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কিনে লোকসানও গুণেছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়ায় লবণ না মাখানোর কারণে গতবার দুই ট্রাক চামড়া পচে নষ্ট হয়েছিল। সেসব ব্যবসায়ী ট্রাক ভাড়ার টাকাও দিতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীদেরকে বলবো তারা যেন এবার ঈদের দিনই চামড়া বিক্রি করার চিন্তা না করেন। তার মতে, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া তাড়াতাড়ি বিক্রি করে লাভসহ মূলধন নিয়ে বের হতে চায়। এ কারণেই তারা প্রকৃত দাম পান না। এমনকি তাদের কখনও কখনও ঠকানোও হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, তারা যদি ৬ ঘণ্টার মধ্যে লবণ দিয়ে চামড়া রাখতে পারেন একটু সময় নিয়ে বিক্রি করলে তাদের ঠকার কোনও সুযোগ থাকবে না। তিনিও মনে করেন, গত বারের চেয়ে চামড়ার দাম এবার কমে যেতে পারে। বাজার খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সচেতনতার সঙ্গে চামড়া কেনার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ১ কোটি ১০ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে বলে ধারণা করছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। অন্যদিকে, গত বছর ঈদে কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ। এর মধ্যে ১ কোটি ৫ লাখের মতো পশু কোরবানি হয়েছিল।

এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বাড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা এক কোটি পিস পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন। গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল সোয়া এক কোটি পিস। অর্থাৎ, আগের বছরের তুলনায় অন্তত ২৫ লাখ পিস চামড়া কম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাশে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলছেন চামড়া প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ শতাংশ বাড়ে। তবে বন্যার কারণের এবার হয়ত বাড়বে না। তবে কমবে না। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গতবছর তারা প্রায় গরু ছাগল ভেড়া মহিষ মিলে ৮৫ লাখ পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এবারও সেই রকমই হবে।

এদিকে সাখাওয়াত উল্লাহও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চিন্তাভাবনা করে এবার চামড়া কেনার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যাতে না ঠকে সে জন্যই চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তিনিও উল্লেখ করেন, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যেন চিন্তাভাবনা করে এবার চামড়া কেনেন। কারণ, আমরা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি চামড়া সংগ্রহ করছি না। তবে যারা লবণ দেবেন, তাদের কাছ থেকে আমরা চামড়া নেবো।

প্রসঙ্গত, এবার গরুর কাঁচা চামড়ার দাম ঢাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। সারাদেশে খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় প্রতি বর্গফুট ১৩ থেকে ১৫ টাকা।

ট্যানারিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই চামড়া মূলত আড়তদারের কাছে সংরক্ষিত থাকে। আড়তদার প্রতি পিসে গড়ে ৩৫ টাকা লাভ রেখে ট্যানারিতে চামড়া পৌঁছান। যদিও ট্যানারি পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচও বহন করতে হয় পাইকারি ব্যবসায়ীদের। ট্যানারির মালিকরা সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন পণ্য বানান। এসব পণ্য বিদেশেও রফতানি করা হয়।

প্রসঙ্গত, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সারাদেশে কয়েক লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া কেনেন। কয়েক হাজার পাইকারি ব্যবসায়ী এই চামড়া তাদের কাছ থেকে কিনে আড়তদারদের কাছে জমা রাখেন।

/এপিএইচ/টিএন/

x