সংখ্যাগুরু মন্ত্রী এবং সংখ্যালঘু হামলার ছক

হারুন উর রশীদ ১৮:২৬ , নভেম্বর ০৪ , ২০১৬

হারুন উর রশীদব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রবিববার হিন্দুপল্লিতে হামলা, নির্যাতন ও প্রতিমা ভাঙচুরের পর এবার দেওয়া হয়েছে বাড়িঘরে আগুন। আর এই আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে। রবিবার তাণ্ডবের পাঁচ দিনের মাথায় আবার কিভাবে দুর্বৃত্তরা বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়ার সাহস পায়, তা আবার নাসিরনগরের এমপি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক ওই এলাকায় থাকা অবস্থায়!
রবিবার হিন্দুদের শতাধিক বাড়ি-ঘরে হামলা হয়েছে, ১০টি মন্দির ভাঙা হয়েছে, ভাঙা হয়েছে প্রতিমা। আর এবার কমপক্ষে পাঁচটি বাড়ি ও একটি মন্দিরে আগুন দেওয়া হয়েছে, চালানো হয়েছে হামলা। সংবাদ মাধ্যমে বৃহস্পতিবার রাতের হামলার যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দেখা গেছে ঘর-বাড়ি পুড়ে খাক হয়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে মানুষ রক্ষা পেয়েছে। ঘরের মধ্যে যা ছিল তা সবই পুড়ে গেছে।
আমার কাছে নাসিরনগরের হামলা কোনও হঠাৎ উত্তেজনার ফল মনে হয়নি। আর বৃহস্পতিবার ফের হামলায় আমার সেই ধারণা আরও শক্ত হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে আমার মনে হয়েছে, কিছু উগ্র গোষ্ঠীকে হাতে রাখতে তাদের ‘ক্ষোভ প্রশমনে’ পরিকল্পিতভাবেই হিন্দুদের ওপর হামলা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভাবা হয়েছে ‘হিন্দুদের ওপর দিয়ে যাক, তারা এমনিতেই ঠাণ্ডা, কোনও ঝামেলা হবে না।’
এবার আমার এই ধারণা যেসব তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরছি:
১. গত শুক্রবার (২৮.১০.১৬) ফেসবুক পোস্টের বিষয়টি এক কান দুই কান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
২. শনিবার উত্তেজনা দেখা দেয় এবং ওইদিন বিকেলে রসরাজকে ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে আটক ও পিটুনি দিয়ে পুলিশে দেওয়া হয়।
২. রবিবার নাসিরনগর উপজেলা সদরে দু’টি প্রতিবাদ সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয় (হেফাজত ও আহলে সুন্নাত)।
৩. দু’টি  সমাবেশের অনুমতি দিলেও রবিবার সমাবেশ এলাকা এবং কাছেই হিন্দুপল্লিতে মাত্র কয়েকজন পুলিশ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়।
৪. তবে একদিন আগে শনিবারই হিন্দুরা নিরাপত্তা চাইলেও তাদের বাড়তি কোনও নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি।
৫. রবিবার সমাবেশ শুরুর সময় সকাল ১০টার দিকে ওসি থানায় নির্লিপ্ত বসেছিলেন।
৬. সমাবেশে উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এ টি এম মনিরুজ্জামান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. সুরুজ আলীসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের কর্মীদের নিয়ে যোগ দেন লাঠিসোটাসহ। তারাও বক্তব্য দেন এবং রসরাজের ফাঁসি দাবি করেন।
৭. সমাবেশ চলাকালে সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
৮. সমাবেশ থেকেই কয়েক গ্রুপে ভাগ হয়ে হিন্দুপল্লিতে হামলা চালানো হয়।
৯. হামলা শুরুর পরপরই ওই এলাকায় যে কয়েকজন পুলিশ ছিল তারও দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
১০. হামলাকারীদের ঠেকাতে পুলিশ নয়, দুই ঘণ্টা পর বিজিবি এলাকায় আসে। অতিরিক্ত পুলিশ আসে তারও একঘণ্টা পর।
১১. আক্রান্ত হিন্দুপল্লির দূরত্ব সমাবেশ থেকে হাঁটা দূরত্বে আধা কিলোমিটারের মধ্যে নাসিরনগর উপজেলা সদর ইউনিয়নেই।
এবার আসি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক-এর কথায়। ছায়েদুল হক শুধু মন্ত্রীই নন, তিনি নাসিরনগরের এমপিও। এই ঘটনায় তিনি কী ভূমিকা নিয়েছেন, তা একটু দেখা যাক:
১. রবিবারে হামলার দু’দিন পর মঙ্গলবার তিনি নাসিরনগর যান। গিয়ে ওঠেন ডাকবাংলোয়।
২. মঙ্গলবার সারাদিন তিনি ডাকবাংলোয় অবস্থান করলেও আক্রান্ত হিন্দুপল্লিতে যাননি। যদিও ডাকবাংলো থেকে হিন্দুপল্লি আধা কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে।
৩. হামলার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল ‘কিছুই হয় নাই, কয়েকটা মন্দির ভেঙেছে’।
৪. মঙ্গলবার সাংবাদিকরা ডাকবাংলোয় গেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মন্ত্রীর সামনেই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। মন্ত্রীও নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ নেন।
৫. হামলার বিচার হবে কিনা, প্রশ্ন করলে জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘আল্লারে জিগান। কী প্রশ্ন! বিচার হবে কিনা? এটা কোনও প্রশ্ন?’
৬. হিন্দুরা তার কাছে গেলে তিনি ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালি দেন। অভিযোগ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথের।
৭. মন্ত্রী একদিন ডাকবাংলোয় অবস্থানের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে ক্ষতিগ্রস্ত গৌরমন্দির পরিদর্শন শেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে ‘মত-বিনিময়’ করেন।
৮. তখন মন্ত্রী জানান,‘ কোনও মৌলবি বা হেফাজত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটাননি, বহিরাগতরা এই হামলা চালিয়েছে। আমার কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট আছে।’
৯. মন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকা অবস্থায়ই বৃহস্পতিবার রাতে ফের হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেওয়াসহ হামলা চালানো হলো।
১০. গভীর রাতে এই হামলার সময় কোনও পুলিশ পাহারা ছিল না।
এবার এই দুই প্রকার তথ্য মিলিয়ে কিছু প্রশ্ন এবং মন্তব্য করা যায়। আমি মনে করি, নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে দু’টি সমাবেশের অনুমতি মৎস্যমন্ত্রীর সায় না পেয়ে দেওয়া হয়নি। কারণ, তিনি শুধু মন্ত্রীই নন ওই আসনের এমপিও। মন্ত্রীর আচরণ ও কথায়ই প্রমাণ করে তিনি প্রশাসনের সব সিদ্ধান্তের পক্ষে। এর কারণ হতে পারে যে, তার কাছে জিজ্ঞেস করেই প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে।
পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকায় আহলে সুন্নাত ও হেফাজতপন্থীরা শক্তিশালী। মন্ত্রী হয়তো চেয়েছিলেন, ভোট বা ক্ষমতার হিসেবে তাদের ধরে রেখে হিন্দুদের ওপর ‘ক্ষোভ প্রকাশের’ একটা সুযোগ দিতে। আর সেই প্রক্রিয়ায় পুলিশ যেন কোনও ঝামেলা না করে , সে নির্দেশ পুলিশ প্রশাসনকে আগেই দেওয়া ছিল। ফলে পুলিশ মাঠে ছিল না, ওসি ছিলেন থানায় বসে।
আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নাসিরনগরে দফায় দফায় কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি যে, ‘উপজেলা প্রশাসন সমাবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছিল জেলা প্রশাসনের চাপে। আর ১৪৪ ধারা জারি করতে উপজেলা প্রশাসন চাইলেও জেলা প্রশাসন নাকি সেই অনুমতি দেয়নি।’
এখানেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার। ভাবা হয়েছে ‘প্রতিবাদকারীদের’ ঠেকাতে যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন হবে, তার চেয়ে ‘ক্ষোভ প্রশমনে’ সুযোগ দিলে তা অনেক সহজ হবে। সেক্ষেত্রে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলে তারাতো আর প্রতিবাদ ছাড়া প্রতিশোধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে না। কয়েকদিন পর এমনিতেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। এতে দু’দিকই রক্ষা পাবে। উগ্রবাদীরাও খুশি খাকবে। আর হিন্দুদের মাথায় হাত বুলিয়ে বশে রাখা যাবে। আর সেই ছক অনুসরণ করেই মন্ত্রী হয়তো তার প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলেন,‘কিছুই হয়নি’।
কিন্তু ঠাণ্ডা হয়নি। সংবাদ মাধ্যম সরব হয়। প্রতিবাদ শুরু হয়। হামলার ধরন দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বিবেকবান মানুষ। তাই প্রতিক্রিয়া আঁচ করতে পেরে মন্ত্রী একটু সময় নেন। রবিবার সকাল থেকে হামলা শুরু হলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এলাকায় না গিয়ে এলাকায় যান মঙ্গলবার। এলাকায় গিয়ে তারা ডাকবাংলো থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে আক্রান্ত এলাকায় যাননি। পুরো একদিন কাটান ডাকবাংলোয়। চেষ্টা করেন পরিস্থিতি তার অনুকূলে আনতে।
ওইদিন সাংবাদিকরা তার কাছে গেলে তাই তিনি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাংবাদিকদের ওপর চটে যান। মন্ত্রী বলেন, ‘তেমন কিছুই হয়নি, সাংবাদিকরা বাড়াবাড়ি করছে। তিনি বিচারের কথা আল্লাহর কাছে জানতে বলেন। আর হিন্দুরা তার কাছে গেলে ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালি দেন। তাদের অপরাধ তারা হামলার কথা সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন। এমনকি যারা সাংবাদিকদের কাছে হামলার ক্ষয়-ক্ষতির কথা বলেছেন তাদের ডেকে আনার নির্দেশ দেন উত্তেজিত হয়ে।
আমি মনে করি, মন্ত্রী আগের ঘটনা ধামাচাপা দিকে গিয়ে নতুন করে উস্কানি দিয়েছেন। তার ‘সাংবাদিকরা বাড়াবাড়ি করছে’ এবং ‘মালাউনের বাচ্চা’ জাতীয় শব্দগুচ্ছ হামলাকারীদের নতুন হামলায় উৎসাহ জুগিয়েছে। হামলাকারীরা সে কারণেই বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আবারও নাসিরনগরের হিন্দুপল্লিতে আগুন দেওয়া সাহস পেয়েছে। মন্ত্রীর অবস্থান এবং বক্তব্য পুরোপুরি হামলাকারীদের পক্ষেই গেছে। তাই মন্ত্রী নাসিরনগরে থাকা অবস্থায়ই তারা ফের হামলা করতে ভয় পায়নি।
মন্ত্রী বুধবার বলেই দিয়েছেন কারা হামলা করেননি। কারা হামলা করেছে, তাতো বলেননি। তাই নতুন হামলায় কেন ভয় পাবে হামলাকারীরা।
আমি এতক্ষণ যে ছকের কথা বললাম, সেটা একটা পুরনো ছক। নতুন কোনও আবিষ্কার নয়। চার বছর আগে কক্সবাজারের রামু বৌদ্ধ বসতি এবং মন্দিরে হামলার ঘটনা একটু খেয়াল করে দেখলে দেখবেন সেখানেও ফেসবুক কাহিনি। তারপর প্রতিবাদ সমাবেশ। সেই সমাবেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ। সেখান থেকে দলে দলে ভাগ হয়ে হামলা। হামলার আগে ও হামলার সময় পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের কথা-‘যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়, তারাই এই হামলা চালিয়েছে।’ নাসিরনগরেও পুলিশ তাই বলেছে।
এই হামলার ছকের মধ্যে একটি রাজনীতি আছে। এরমধ্যে স্বার্থের হিসাব আছে। আছে ভোটের হিসাব। আর সেই হিসাবের কাছে মানবতা পাত্তা পায় না। সংবিধান কী বলেছে, তা গুরুত্ব পায় না। আইনে কী আছে, তা কার্যকর হয় না। কার্যকর হয় সংখ্যাগুরুর আধিপত্য। সংখ্যালঘুর অসহায়ত্ব। তবে একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন, সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘু একটা আপেক্ষিক বিষয়। আজ এই আমি বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু। কাল এই আমি যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘু। একটু ভাববেন প্লিজ।
‘এখানে তুমি সংখ্যালঘু/ ওখানে তুমি জমজমাট/ এখানে তুমি বস্তিবাসী/ ওখানে চষো রাস্তাঘাট/ এখানে তুমি ভয় পেয়েছ/ এখানে তুমি নিঃসহায়/ এখানে তুমি নাম হারানো/ ওখানে চেনা আমান ভাই...
কোথায় যেন মানুষ কাঁদে/ কোথায় যেন কাঁদছে হায়/ মানুষ বড় ভয় পেয়েছে/ মানুষ বড় নিঃসহায়।’
শিল্পী: মৌসুমী ভৌমিক। গানের শিরোনাম: সংখ্যালঘু

লেখক: সাংবাদিক
ইমেইল:swapansg@yahoo.com

x