চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড: একটি মূল্যায়ন

আশীষ বিশ্বাস ১৭:২১ , জুন ১৬ , ২০১৭

আশীষ বিশ্বাসচীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) প্রকল্পের মূল লক্ষ্য যুক্তরাজ্য ও পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে চীনের সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন। সেই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার মধ্যে গড়ে উঠবে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্র।
এ প্রকল্পকে অনেকেই উচ্চাভিলাষী বলে উল্লেখ করতে পারে। কারণ এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো। আর্থিক মন্দায় পড়া শতাধিক দেশের মধ্যে নতুন সংযোগ সৃষ্টি হবে এর মাধ্যমে। এতে করে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন।
সমালোচকদের মতে, এ বৃহৎ প্রকল্পে পুরো বদলে যাবে অর্থনৈতিক খেলা। এর ফলে চীনা অর্থনীতির ভিত্তি যেমন আরও মজবুত হবে, তেমনি তার পরিধি বৃদ্ধি পাবে ব্যাপকহারে। যা পরে রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করবে।
বাংলাদেশ ও ভারতে ওবিওআর-এর সমর্থক যেমন রয়েছে, তেমনি আছে এ প্রকল্পের সমালোচকরা। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতকে চীনের সঙ্গে সংযোগকারী বিসিআইএম প্রকল্প ওই ওবিওআর-এরই অংশ।
এ সময়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় চীনের উপস্থিতি বেশ ভালো করেই বোঝা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পর চীন সেখানে হাম্বানটোটা বন্দর গড়ে তোলে, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিই চীনাদের হাতে। একইভাবে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের সঙ্গে জিনকিয়াং প্রদেশের সংযোগকারী সিপিইসি মহাসড়ক গড়ে তোলে চীন।
এখন প্রশ্ন হলো– এসবের মধ্য দিয়ে ওই দেশগুলো কী অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং এখন পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদী ফলই বা কী এসেছে? তবে এসব প্রশের আগেই ওবিওআর প্রকল্পের টাইমিং এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেওয়া যেতে পারে।
রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ এ বিষয়ে একমত যে, বেইজিং এমন এক সময়ে ওবিওআর প্রকল্প শুরু করেছে, যখন চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মন্দায় নিমজ্জিত। রিয়েল এস্টেটে অর্থনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য নতুন বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণকাজে বিনিয়োগ করাটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছিল।
বর্তমানে চীন বছরে প্রায় ১১ লাখ টন স্টিল উৎপাদন করতে পারে। তবে বর্তমানে দেশটির অভ্যন্তরীণ চাহিদা সাত লাখ টনেরও কম। ভারতীয় বিশ্লেষক মোহন গুরুস্বামী সাম্প্রতিক এক লেখায় এ বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, চীন এই অতিরিক্ত স্টিল তখনই উৎপাদনে আগ্রহী হবে; যখন তা সেতু, মহাসড়ক বা টানেলের নির্মাণ কিংবা ওবিওআর প্রকল্পের অধীনে সড়ক প্রকল্প সম্প্রসারণের মতো কাজ বেশি থাকবে।

তবে মোহন গুরুস্বামীর মতে, বিদেশে রফতানি করে চীনা অতিরিক্ত উৎপাদনের সমস্যা মিটবে না। বিশ্বে স্টিলের চাহিদায় অন্যতম ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা চীন থেকে দেড় লাখ টন স্টিল নিচ্ছে প্রতি বছর। এরপরেও চীনের প্রায় তিন লাখ টন স্টিল অকেজো পড়ে থাকবে। সিমেন্ট এবং অন্যান্য নির্মাণ উপকরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মন্দা চলায় বাজারে স্টিল, সিমেন্টের মতো নির্মাণ উপকরণের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

তবে বৈদেশিক মুদ্রা মজুদের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান এখনও এক নম্বরে। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার। বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার কারণে পশ্চিমা বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা দেশটির মজুদ অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ওই অর্থের একটি বড় অংশ স্বল্প সুদে মার্কিন প্রশাসনের বন্ড কিনে রাখা হয়েছে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের মূল্য কমতে থাকায়, ওই মজুদের পরিমাণও কমে এসেছে। ওই অর্থ যত বেশি সময় ধরে ব্যাংকের ভল্টে বন্দি থাকবে, ততই অবমূল্যায়ণ হবে ওই অর্থের।

বৃহৎ অবকাঠামোগত নির্মাণের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ক্রিয়াশীল করা যায় মজুদ অর্থকে। যা হতে পারে ওবিওআর-এ বিনিয়োগের একটা বড় কারণ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ওই প্রকল্পে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে। তবে ফলাফল সঙ্গে সঙ্গেই আসবে না। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ফল একটা বড় সময় ধরে ভোগ করবে চীন। যা ওই রিজার্ভের ওপর ধার্য খুব অল্প সুদের চেয়ে অনেক বেশি হবে।

ওবিওআর একদিকে চীনের নিশ্চল পড়ে থাকা মজুদ অর্থকে কার্যকর করছে। অন্যদিকে তাদের অতিরিক্ত উৎপাদনকেও কাজে লাগানো যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে চীনা শ্রমিকদের কার্যকরভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকার ছোট অর্থনীতির দেশগুলোকে ‘সহজ শর্তে’ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রও তৈরি হবে। আর এ ঋণের সুদ কিন্তু আসবে বহু বছর ধরে।

তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে চীন ওবিওআর প্রকল্পে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। কিন্তু ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন ৭৫ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি সতর্কতার সঙ্গেই পা ফেলতে যাচ্ছে।

পশ্চিমা বিশ্লেষকরা সড়কপথে যোগাযোগেরে জন্য খরচের বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে টম হল্যান্ড বলেন, ‘সড়ক বা রেলপথে আমদানি-রফতানিতে যে খরচ পড়ে, সমুদ্রপথে তা অনেক কম। এর মূল কারণ হলো পণ্য পরিবহনের সময় ও পরিমাণ। সমুদ্রপথে একইসঙ্গে অনেক বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহন সম্ভব। আর এজন্য অনেক দেশ সমুদ্রপথকেই বেছে নিতে পারে।’

এবার আসা যাক চীন নিয়ে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে। এ দুটি দেশের জনগণ এবং রাজনীতিকরা চীনা প্রকল্পকে পুরোপুরি ইতিবাচকভাবে দেখেনি। ধারণা করা হয়, শ্রম ও অন্যান্য চীনা উপকরণ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে হাম্বানটোটা বন্দর নির্মাণের বেশিরভাগ অর্থই তুলে নিয়েছে চীন। সেই সঙ্গে বাণিজ্যিক খাতে মোটা ছাড় তো আছেই। এখনও এই ছাড় দেওয়া নিয়ে দু’দেশের মধ্যে চলছে দর কষাকষি। চীনকে ছাড়া ছাড় ঘোষণা করে ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার।

পাকিস্তানে এ পরিস্থিতি আরও খারাপ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিপিইসি মহাসড়ক কার্যত দেশটিকে দু’ভাগ করে দিয়েছে। বালুচ ও অন্যান্য বিদ্রোহীদের আক্রমণ থেকে পাকিস্তানে কর্মরত চীনা কর্মকর্তাদের রক্ষার জন্য সেখানে মোতায়েন রয়েছে দেড় হাজারেরও বেশি আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য। কিছুদিন আগে দুর্বৃত্তরা দুই চীনা নাগরিককে অপহরণের পর হত্যা করেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছিল চীন। গত সপ্তাহে এক পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ কলকাতায় একটি সমাবেশে বলেন, ‘এখন কোনও পর্যটকের কাছে পাকিস্তানকে চীনের উপনিবেশ বলেও মনে হতে পারে!’

বিশ্লেষকদের মতে আরও আতঙ্কের বিষয় হলো, চীনের মধ্য ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সিপিইসি মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানের হাজার হাজার একর কৃষি জমি লিজ নিয়ে রেখেছে। এমন রুক্ষ অঞ্চলে এত বৃহৎ এলাকা লিজ নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ কী, তা সময়ই বলতে পারবে।

শোনা যাচ্ছে, পাকিস্তানে চীন নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের চেষ্টা করছে। অবশ্য এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে বেইজিং। তবে মিয়ানমারের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েমের আগে বেইজিং হয়তো এ বিষয়ে ইসলামাবাদকে জানানো জরুরি নাও মনে করতে পারে। উল্লেখ্য, দীর্ঘ সময় ধরে মিয়ানমারে চীনের নিয়ন্ত্রণের ফলে এখন জনগণের মধ্যে দেশটি আর জনপ্রিয় নয়।

বাংলাদেশ ও ভারতের উচিত চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তাহলেই ভবিষ্যতে যে বৃহৎ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকট সামনে আসতে পারে, তা এড়াতে পারবে দুই দেশ।

লেখক: সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x