Vision  ad on bangla Tribune

গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুন: দুর্ঘটনা না হত্যা?

মুনজের আহমদ চৌধুরী ২২:০৯ , জুন ১৭ , ২০১৭

 

মুনজের আহমদ চৌধুরীলন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও পরবর্তী উদ্ধার-প্রক্রিয়া নিয়ে পুরো ব্রিটেনেই অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ ঘটনায় বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব খুঁজছে সাধারণ মানুষ।
লন্ডনের বহুতল ফ্ল্যাটগুলোতে বাস করেন মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। আর পুড়ে যাওয়া ভবনটির অধিকাংশ বাসিন্দাই নন ইংলিশ ও বাঙালিসহ এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটির। দীর্ঘদিন ধরেই ওই ভবনের টেনেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ভবনটির নিরাপত্তা, বিশেষ করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ত্রুটির ব্যাপারে অভিযোগ করে আসছিল। কিন্তু এরপরও কেন অভিযোগগুলো আমলে নেওয়া হয়নি? এমন বাস্তবতায় সন্দেহের তর্জনি উঠছে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী আচরণের দিকেও। কারণ ভবনটির বেশিরভাগ বাসিন্দাই অভিবাসী।
কয়েক বছর আগে ব্রিটেনে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের এক পর্যবেক্ষণে পুলিশে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের চিত্র উঠে এসেছিল।
ডেভিট লেমি এমপি শুক্রবার ঘটনাটিকে করপোরেট ম্যানস্লোটার উল্লেখ করে বলেছেন, আমরা এ ঘটনায় গ্রেফতার ও বিচার চাই, রিভিউ নয়। অপরাধ হিসেবে একে অভিহিত করেছেন এই ব্রিটিশ সাংসদ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফায়ার ব্রিগেডের সর্বোচ্চ সক্ষমতার চেয়ে গ্রেনফেল টাওয়ারের উচ্চতা ছিল তিনগুণেরও বেশি। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকার মতো দেশগুলোতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা অনেক আধুনিক ও কার্যকর। তারা বলছেন, একুশ শতকে ব্রিটেনের মতো দেশে এমন ঘটনা অকল্পনীয়।

১৯৬৮ সালে লন্ডনের নিউহামে ২২তলা ভবনে সন্দেহজনক গ্যাস বিস্ফোরণের দুর্ঘটনার কথা জেনেও  ছয় বছর পর (১৯৭২-৭৪) কেন নতুন করে হাই রাইজ ভবন তৈরি করা হলো, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন না করেই? ভবনটিতে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা অপ্রতুল ছিল। লন্ডনে বিভিন্ন ভবনের ভেতরে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ময়নাতদন্তকারীরা জানিয়েছেন, আগুনের সূত্রপাতের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ছেটানোর ব্যবস্থা থাকলে এত প্রাণহানি ঘটত না। প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন থাকলেও মিলছে না উত্তর। উদ্ধার প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কেন আরও জনবল নামানো হলো না?

যেখানে জঙ্গি হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে থেরেসা মে’র সরকার সড়কে সেনাবাহিনী নামালো, সেখানে শত প্রাণের মৃত্যুর মিছিলে কেন সেনাবাহিনীর অন্তত কারিগরি ও প্রকৌশলগত সহায়তা নেওয়া হলো না, এমন সব প্রশ্ন ব্রিটেনে স্যোশাল মিডিয়ার গণ্ডি ছাপিয়ে মূলধারার মিডিয়ায় আলোচিত হচ্ছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ভবনের ওপরতলার বাসিন্দাদের সরিয়ে নিতে হেলিকাপ্টার ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সগুলো ব্যবহার না করার বিষয়টির স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি দায়িত্বশীলরা। অথচ এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়  বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশেও হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়।

ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে লন্ডনসহ অন্যান্য শহরে পুরনো বহুতল আবাসিক ভবনগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ত্রুটির শঙ্কার কথা।

ব্রিটেন বিগত বছরগুলোতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশে দেশে যুদ্ধের নামে জনগণের ট্যাক্সের যে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, সে অর্থে গ্রেনফেল টাওয়ারের মতো শত শত নতুন ভবন নির্মাণ করা যেত। এতে করে জরাজীর্ণ ভবন ব্যবহারের ঝুঁকি যেমন কমত, তেমনি লাঘব হতো দেশটির তীব্র হাউজিং সংকটও।

জনগণের প্রাণরক্ষা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ব্রিটেনের গত দু’টি নির্বাচনে ট্রাম্পের মার্কিনি হাওয়ার জাতীয়তাবাদ আর সন্ত্রাস যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, ততটা গুরুত্ব পায়নি অভ্যন্তরীণ জননিরাপত্তার দিকটি। বরং লাশ উদ্ধার নিয়ে এক ধরনের অস্পষ্টতা ব্রিটেনের বহমান বাহ্যিক স্বচ্ছতাকেও করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। 

দুই.

আমরা, বিশেষ করে প্রবাসীরা কথায় কথায় বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা আর ব্যর্থতার বিপরীতে ব্রিটেনের মতো দেশগুলোর সাফল্যের উদাহরণ টানি। কিন্তু, রানা প্লাজা, লঞ্চ ডুবি বা ভবন ধসের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতায় বাংলাদেশের সাধ্যের সীমাবদ্ধতা উৎরে যাওয়া সাফল্যের নিদর্শন রয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার যন্ত্রের অপ্রতুলতায় বা দ্রুততার তাগিদে জীবন দিয়েও আহত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ কিন্তু ব্যতিক্রমকে অতিক্রম করেছে আগেই। আর লন্ডনের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশি ইবতেশাব রহমান শাকিলদের খাবার, তোয়ালে থেকে শুরু করে ইফতার সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসা ব্রিটেনের দুর্যোগে বাংলাদেশির সহমর্মী মানবিকতার আলো আরও উজ্জ্বল করেছে।

গ্রেনফেল টাওয়ারে উদ্ধারকাজে গতিহীনতার দায় ব্রিটেনের নতুন ঝুকিঁপূর্ণ সরকারকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছে। বিশ্ব নিরাপত্তার চিন্তক রাষ্ট্রে জননিরাপত্তায় শুভঙ্করের ফাঁকি প্রবলভাবে যে উন্মোচন হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। অবশ্য উদ্ধার, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অসন্তোষ নিয়ে শুক্রবারের জনবিক্ষোভে সরকারের টনক জোরেশোরেই নড়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে জনতার বিক্ষোভের পর শনিবার তিন সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য  বিকল্প বাড়ির ঘোষণা মিলেছে।

ব্রিটেনের রানীর ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন জনগণকে।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক

 

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x