Vision  ad on bangla Tribune

একজন ডিমেনশিয়া রোগীর কথা

জেসমিন চৌধুরী ১৮:১০ , জুন ১৯ , ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীব্রিটেনের মতো একটা দেশে দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে মানুষকে, তাদের জীবনকে যতটুকু জানা যায়, ততটুকু বোধ হয় পৃথিবীর আর কোনও পেশায় সম্ভব নয়। ডাক্তার দেখেন রোগীকে, আসামিকে পুলিশ, মক্কেলকে উকিল। একজন দোভাষী দেখেন সবাইকে। প্রতিটা ভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট একটা জটিল বই পড়ার মতোই উত্তেজনাকর ও দ্যোতক অভিজ্ঞতা।
পুলিশ, স্কুল, আইন বিভাগ, কোর্ট, হাসপাতাল, মানসিক হাসপাতাল, সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের জন্য কাজ করতে গিয়ে মানুষের জীবনের নানা সমস্যার কথা জানা যায়। শুধু সোশ্যাল সার্ভিসেসের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণির মানুষের মনের গভীরে উঁকি দেওয়ার সুযোগ ঘটে। মানুষের জীবনযাপন ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে গভীর পরিজ্ঞান অর্জনের এই অনন্য সুযোগে নিজের বোধ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রতিনিয়ত আরও শাণিত হয়, মানুষের জীবনের সূক্ষ্ণ বেদনার সঙ্গে পরিচিতি হয় আরও গভীর। যেকোনও বিষয়কে বা সম্ভাবনাকে, তা যতই তুচ্ছ হোক, তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও ঠিক ততটাই কমে আসে। 
কিছুদিন আগে মাত্র দেড় ঘণ্টার একটা অ্যাসাইনমেন্টে একজন নব্বই বছরের ডিমেনশিয়া রোগী বৃদ্ধার সমস্ত জীবনটাকেই পড়ে এলাম, যদিও তার নিজের চিন্তাজগতই এখন কুয়াশাচ্ছন্ন। তবু সেই কুয়াশার মধ্য দিয়েই তীর্যক স্মৃতিরশ্মি ঝলক দিয়ে অনেক কিছু স্পষ্ট করে তুলছিল। এর আগে ধর্ষণ, এটেম্পটেড মার্ডার, শিশু যৌন নির্যাতন, ড্রাগের অপব্যবহার, ফ্রড ও নানান গুরুতর সামাজিক অনাচারের কেইসে আমি কাজ করেছি। সেই তুলনায় একজন বৃদ্ধার স্মৃতি বিভ্রমের গল্পকে খুব ক্ষুদ্র ও হালকা মনে হলেও আমার কাছে বিভিন্ন কারণে তার গল্পটা ছিল খুব মর্মস্পর্শী। সেই সঙ্গে জানলাম প্রকৃত পেশাদারেরা কাছের মানুষের চেয়েও কতটা বেশি সংবেদনশীল ও সহানুভূতিশীল হতে পারে।

বাইরে গাড়িতে চিকিৎসাকর্মীর জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় দেখলাম বৃদ্ধা নিজে দরজা খুলে বেরিয়ে ময়লার বিনে ব্যাগ ভর্তি আবর্জনা ফেলছেন, জানালা দিয়ে এক জোড়া চোখ তার ওপর নজর রাখছে। এই বয়সেও তার শারীরিক শক্তি ও সুস্থতা মুগ্ধতার দাবি রাখে, কিন্তু শুধু স্মৃতিবিভ্রাট একটা মানুষের জীবনকে কিভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে, তা জানা হলো ভেতরে যাওয়ার পর। তিনি কোথায় থাকেন, সঙ্গে কারা থাকে, ছেলেমেয়ের নাম কিছুই মনে করতে পারেন না, কিন্তু মৃত স্বামীর কথা প্রশ্ন করা হলে তার নাম, পরিচয়, মৃত্যুর সময় ও কারণ সবই নিখুঁতভাবে বলে গেলেন। ছেলের বউয়ের কাছ থেকে জানা গেলো তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে বিলেতে আসার এক সপ্তাহ পরেই তার স্বামীর মৃত্যু ঘটে। নতুন দেশের অচেনা পরিবেশে তিন সন্তানকে, পেটে চতুর্থ আরেকজন, নিয়ে সীমাহীন কষ্টে আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটে তার। তবু হাল ছাড়েননি। বাচ্চাদের বড় করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। খুব গোছানো স্বভাবের মানুষটির ভীষণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বাতিক ছিল যা তার নোংরা জীর্ণ কাপড় চোপড় আর ঠোঁটের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানের কালচে লাল রস দেখে আজ আর বোঝার উপায় নেই। এখন যখন সময় এসেছে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের সাফল্যের আনন্দ ভোগ করার তখনই ডিমেনশিয়া নামক রোগের আক্রমণে নিজের অস্তিত্বের ধারণাই হারাতে বসেছেন তিনি।

আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময়টুকুতে কয়েকবার অস্থিরভাবে বাথরুমে ছুটে গেলেন হাত পরিষ্কার করতে। বহু সময় ধরে পানির ট্যাপ চলছে, তিনি সাবান দিয়ে কচলে কচলে পরিষ্কার করছেন হাতের অদৃশ্য সব ময়লা। ছেলের বৌ ছুটে যাচ্ছে পেছন পেছন, আবার তাকে ধরে এনে বসাচ্ছে আমাদের কাছে। বার বার নিচু হয়ে ঝকঝকে পরিষ্কার কার্পেট থেকে অদৃশ্য সব ময়লা খুঁটে-খুঁটে আবার কার্পেটের ওপরেই ছুড়ে ফেলছেন। নিজের শরীরের সার্বিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টা আর বোঝেন না তিনি, যখন তখন অবলীলায় কাপড়ে প্রস্রাব করে বসেন কিন্তু সাবান দিয়ে কচলে হাত পরিষ্কার করেন দিনে কমপক্ষে পঞ্চাশ বার এবং বিছানা ও কার্পেট থেকে ময়লা পরিষ্কার করতে থাকেন অনবরত। তার পানি ঢালার শব্দে সারারাত ঘুমাতে পারে না বাড়ির লোকজন।  

নার্স প্রশ্ন করে, ‘কী পরিষ্কার করেন কার্পেট থেকে?’

‘বহুত ময়লা, দলা দলা ময়লা শরীল তাকি ফড়ে’।

হঠাৎ বর্তমানের কোনও কোনও কথা মনে পড়ে যায় তার। আমার হাত খামচে ধরে অনুনয় করেন, ‘আমার ছোট বউ’র বাইচ্চা অয় না। একটা ইঞ্জেকশন দিবায়নি তাইর লাগি?’

আমি অনুবাদ করে বললে নার্স উত্তর দেয়, ‘আমি তো তোমার জন্য কাজ করতে এসেছি। তোমার ছেলের বউয়ের চিকিৎসা করার এখতিয়ার নাই আমার।’

ওনাকে বুঝিয়ে বললে, উনি খুব বিরক্ত হন আমার ওপর, ‘আমি কুনো হি বেটিরে কইছিনি? তুমি বাঙালি ফুড়ি, তুমি এগু ইঞ্জেকশন দিয়া যাও।’  

ওনার কথায় আমি না হেসে পারি না, ‘খালাম্মা, আমার তো মাতা ছাড়া আর কুনতাউ করবার এখতিয়ার নাই।’

উনি আমার কথা বুঝতে পারেন না। সোফা থেকে নেমে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়েন। কিছুতেই মেঝে থেকে তুলে সোফায় বসানো যায় না তাকে। ছেলের বউ জানায় প্রায়ই এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে মেঝেতে বসে থাকেন তিনি। 

নার্স আমার কাছে জানতে চায়, ‘তোমার কি মনে হয় তিনি মেঝেতে আরাম করে বসেছেন?’

আমার মনে পড়ে যায় দেশের গ্রামের কথা যেখানে মেঝেতে বসতেই অভ্যস্ত বেশির ভাগ মানুষ, অন্তত আমার ছোটবেলায় তাই ছিল। আমার কাছে তার সোফায় হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে থাকাকে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হয়।

নার্স আবার প্রশ্ন করে, ‘এমন কী হতে পারে যে, অতীতে এ রকম মেঝেতে বসার অভ্যাস বা প্রচলন ছিল?’

প্রশ্ন শুনে ছেলের বউয়ের সম্মানে আঘাত লাগে, ‘ইতা কিতা মাতইন? আমরার গুষ্টিত কেউ কুনোদিন মাটিত বইছে না। সারাজীবন চেয়ারো আর সোফাত বইছি আমরা’।

আমি ছেলের বউয়ের সঙ্গে একমত হতে পারি না। বাংলাদেশের একটা প্রত্যন্ত গ্রামে শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের অনেকখানি কেটেছে যে নারীর, তার মেঝেতে বসার অভিজ্ঞতা থাকারই কথা। দোভাষী হিসেবে সাংস্কৃতিক তথ্য সরবরাহের অধিকারকে কাজে লাগিয়ে আমি নার্সকে জানাই সিলেটে ও বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে অবস্থাপন্ন পরিবারগুলোতেও শীতল পাটিতে পা মুড়ে অথবা মেঝেতে পিঁড়ি পেতে বসার প্রচলন ছিল এক সময়, হয়তো এখনও আছে।  নার্সের ধারণা তিনি তার শৈশবের স্মৃতির মধ্যে স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করছেন, অচেনা পরিবেশে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার আজীবন ক্লান্তি থেকে অবচেতন মনে মুক্তি পাওয়ার আকুলতা আছে হয়তো। বর্তমানের স্মৃতি তার মনকে ফাঁকি দিলেও অতীত হয়তো বার বার ফিরে আসে।

আমাদের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে তিনি হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠলেন বাইরে যাওয়ার জন্য। বাইরে নাকি পাগল এক মহিলা কাঁদছে। তার ঘরবাড়ি নেই, পেটে ক্ষুধা কিন্তু খাবার নেই। এই মহিলাকে খাবার দিতে হবে, কাপড় দিতে হবে। তাকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে পড়লো। আমরা জানালা দিয়ে তাকাই, বাইরে কেউ নেই।  

ছেলের বউয়ের দিকে ইঙ্গিত করে নার্স জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি ওকে চিনেন?’

উত্তর দিতে গিয়ে তাকে খুব বিভ্রান্ত দেখায়। কয়েক সেকেন্ড ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে আমাকে বলেন, ‘তাইরে হকল সময় দেখি। আমারে খুব মায়া করে। তুমি তাইরে চিনোনি?’

আমার কাছে জানতে চাইছেন নিজের ছেলের বউয়ের পরিচয় অথচ তিনি আমাকেই চেনেন না। নিজের অজান্তেই আমার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। যদিও ডিমেনশিয়া ছিল কিনা তার কোনও ডায়াগনোসিস হয়নি তবু আমাদের মাও জীবনের শেষ কয়েকটি বছর কাউকে চিনতেন না। ছেলে-মেয়ে সবাই তার কাছে হয়ে উঠত তার মৃত কোনও আত্মীয়, শৈশবের পরিচিত কোনও মানুষ। আবার হঠাৎ কখনও কাউকে চিনেও ফেলতেন। তখন অনেক কথা বলতেন, গল্প করতেন।

আমার মক্কেল মহিলাটি রাষ্ট্রের কাছ থেকে অনেক সাহায্য পাচ্ছেন। আমাদের সেদিনের কাজের ফল স্বরূপ তাকে নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হবে, বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে, তাকে দেখাশোনা করার জন্য তার ছেলের বউকেও নানান সুবিধা দেওয়া হবে। আমার মা বেঁচে থাকলে এখন এই মহিলার মতোই বয়স হতো। আমাদের দেশে এ রকম স্মৃতিবিভ্রাট নিয়ে আশেপাশের মানুষের জন্য নিছক আমোদ যুগিয়ে যাচ্ছেন অনেক বয়স্ক নারী-পুরুষ, যাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনও সাহায্যের ব্যবস্থা নেই।

আমার মা অথবা তার মতো আরও অনেকে যেসব সুবিধার কিছুই পাননি, সাত হাজার মাইল দূরে হলেও তারই বয়সের তারই পরিস্থিতির আরেক জন নারীকে সেসবের ব্যবস্থা করে দিতে সামান্য ভূমিকা রাখতে পেরে আমার সেদিনের কর্মদিবসটি বিশেষভাবে অর্থবহ হয়ে উঠলো। প্রায় সময়ই কাজ শেষে এই অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরি আমি। নিজের ও নিজের প্রিয়জনদের অনেক না পাওয়ার শূন্যতা অন্যদের প্রাপ্তিতে পূর্ণতা লাভ করে। আমার কাজ সামান্য দোভাষীর ভাষান্তরের কাজ থেকে আরও বড় কিছু হয়ে ওঠে।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x