Vision  ad on bangla Tribune

‘ বাবারা কি ধর্ষক হয়?’

বিথী হক ১২:৫৫ , জুলাই ১৭ , ২০১৭

বিথী হকপ্রিয় বাবা,
তোমার খবর পড়ার অভ্যাসটা নিশ্চয়ই আছে। গতকালের পত্রিকায়, টেলিভিশনে খবরটা দেখেছো? ‘১২ বছরের কন্যা সন্তান ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, বাবার দ্বারা’! খবরটা শুনে তোমার কেমন লেগেছে তা আমি বুঝতে পারি। আমার তখন ভাবতে খুব ইচ্ছে করছিল, আমি জন্মাইনি। আমার খুব ভাবতে ইচ্ছে করছিল এই পৃথিবীতে আমার কোনও অস্তিত্ব নেই, আর তোমারও নেই। বাবা, তোমার ভালোবাসা-আদর যেমন করে শৈশব-কৈশোর রাঙিয়ে তুলেছিল, এখনও যেমন করে রাঙায় তার রং কি কখনও ওরা দেখেছে বাবা? ওরা জানে বাবারা পৃথিবীকে রঙিন করে রাখে?
সেইসব শীতের রাতে তোমার মনে পড়ে বাবা? উত্তরবঙ্গের হাঁড় কাপানো শীত, রাতের বেলা লেপের ওম ছেড়ে বেরুলে দাঁতে দাঁত লেগে যেত। আমি মাঝরাতে ঘুম থেকে জেগে বাথরুমে যাওয়ার জন্য চিৎকার জুড়ে দিতাম। মা যেন এই দুনিয়ায় নেই এমন করে চোখ বন্ধ করে বিছানায় পড়ে থাকতো। আমি কিন্তু ঠিক জানতান, মা জেগে আছে। সারাদিনের ক্লান্তি মেটাতে এখন আমি মরে গেলেও শেষ ভরসা তুমিই। তুমি তখন আমাকে বাথরুমে বসিয়ে দিয়ে হিম বাতাসে একটা শাল পেঁচিয়ে কলতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে, কখনও কখনও আমি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়েই পড়তাম। আমার শরীর যেন আমার দায় নয়। কোনোদিন দেখিনি তুমি বিরক্ত হয়েছো, বকা দিয়েছো!
একবার তুমি আমাকে বলে গেলে কালোপুরের মেলায় যাচ্ছো। আমার জন্য গোলাপি রঙের মালা কিনে আনবে, আর একটা পুতুল। তারপর সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত হলো, তোমার দেখা নেই। হঠাৎ শুনলাম কালোপুরের মেলা থেকে আসার সময় নদীতে একটা নৌকাডুবি হয়েছে। আমি আর মা জড়াজড়ি করে সারারাত বসে ছিলাম। তারপর রাত তিনটেয় খটখটে শুকনো তুমি আর তোমার হাতে গোলাপি মালা দেখে আমার যেন খুশী আর ধরে না। মালা ছুঁড়ে ফেলে তোমাকে জড়িয়ে ধরে আমার তখন কী কান্না! মা আর তুমি তো থামাতেই পারলে না, অবশেষে চোখে জল নিয়েই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

বাবা জানো, গতকালের খবর বলছে মেয়েটাকে নাকি তার বাবা ধর্ষণ করেছে! তোমার বিশ্বাস হয় বাবা? ‘বাবা’ শব্দটির সঙ্গে ‘ধর্ষণ’ শব্দটা যায়? তুমিই বলো! প্লিজ বলো বাবা, এসব যেন ওরা আর না বলে। আমার লজ্জা করে, আমার তোমাকে নিয়ে লজ্জা হয়। আমার লজ্জা হয় এই ভেবে যে মেয়েটি জানলো না, তোমার মতো অসংখ্য বাবা গায়ের রক্ত-চামড়া, স্বপ্ন বেচে বেচে আমাদের বড় করে তুলছে রোজ। আমার লজ্জা লাগে বাবা, মেয়েটি কোনদিন ‘বাবা’ শব্দের প্রেমের স্বরূপ জানবে না।

আমার জানতে ইচ্ছে করে, ওইসব বাবারাও কি তোমার মতো দেখতে হয়? তাদের মাথায়ও কি কালো মিশমিশে কোঁকড়া চুল থাকে, তেলের মতো কালো চামড়া আর ঝকঝকে দাঁত থাকে? আমার জানতে ইচ্ছে করে তারা কি আর সব বাবাদের মতোই? সন্তানের পরীক্ষার ফল হাতে নিয়ে বিশ্বজয়ের হাসি হাসতে পারে? ‘সাহারাতে ফুটলরে ফুল’ বলে টান দিয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়? ফজরের আযান হলে গা থেকে আলতো করে পুতুলের মতো ছোট ছোট হাত-পা সরিয়ে পা টিপেটিপে মসজিদে যায়? ঈদের দিন ভোরবেলা সাইকেলের সামনে বসিয়ে নতুন জামা কিনতে যায়? এসব উত্তর আমায় কে দেবে? কে নিবৃত্ত করবে আমার হৃদয় পোড়া আগুন। কী দিয়ে কাটবে ভয়ানক এই অনুভূতি? সবাই যখন বলে ‘বাবারা ধর্ষকও হয়’, আমার তখন চোখ ফেটে জল আসে, মরে যেতে ইচ্ছে করে। ‘বাবা’ শব্দটা কানে বাজলেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তোমার চেহারা, সাদা রঙের চুল, ধীর-মিষ্টি কণ্ঠ, ঝকঝকে হাসি। অপমানে আমার মিশে যেতে ইচ্ছে করে।

ক’দিন আগে যখন সৎ বাবা কর্তৃক মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়ছিলাম, তখনও নিজেকে প্রবোধ দিতে পারছিলাম। প্রবোধ দিচ্ছিলাম এই ভেবে যে, সেটা সৎ বাবা। আপন বাবা নিশ্চয়ই এমন হবে না। ভাবছিলাম কন্যা সন্তান আছে এমন মায়েরা দ্বিতীয় বিয়েটা চিন্তা-ভাবনা করেই যেন করে! কিন্তু এখন তো আর নিজের কাছে কোনও যুক্তি অবশিষ্ট নেই। নিজেকে প্রবোধ দিতে আর কোনও অজুহাত এনে সামনে দাঁড় করাতে পারছি না। কী ভীষণ অসহায় লাগছে নিজেকে জানো! নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে পারছি না সৎ বাবার কাছে মেয়ে নিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকবার ভাবা উচিত। মায়েদের কি ভাবনার চর্চা করতে হবে পৃথিবীর সকল বাবাও পুরুষ?

যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম তখন কোথাও যাওয়ার সময় মা বারবার বলতো, বাবা আর আপন ভাই ছাড়া পৃথিবীতে কেউ আর নিরাপদ নয়। মায়ের মতো সব মায়েরাই এই ভাবনার ওপর কন্যাদের নিরাপত্তার ঘরবাড়ি বানায় কিনা তা জানি না, তবে অনেক মা বানায় সে ব্যাপারে আমি মোটামুটি নিশ্চিত। বাবা একবারও ভেবেছ, এখন থেকে পৃথিবীর মায়েরা তাদের সন্তানকে কিভাবে নিরাপত্তার শিক্ষা দেবে? পৃথিবীর সকল পুরুষই পুরুষ, কেউ বাবা নয় বা কেউ ভাই নয় এই বলে? কন্যারা জানবে তার জন্য পৃথিবীর কোথাও কোনও নিরাপত্তা নেই, নিজের ঘর নেই, বারান্দা নেই, চিলেকোঠা নেই? এর চেয়ে বড় ঘটনা, এর চেয়ে বড় লজ্জা, এর চেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন আর কি কিছু আছে?

এসব নষ্ট ঘটনা, সত্য আর নির্জলা বিষের ঠিকানা জানতে পেরে যদি পৃথিবীর কোনও মা আর কন্যা সন্তান জন্ম দিতে না চান, কোনও কন্যা যদি বাবা না চায়, বাবার পরিচয় জানতে না চায়, কোনও কন্যাই যদি জন্মাতে না চায় তখন কি হবে বাবা? তোমার মতো বাবাদের তখন একটা ছোট্ট পুতুল আর তার ছোটবেলার জন্য ঝরঝর করে কাঁদতে ইচ্ছে করবে না বাবা? তোমাকে বলেছিলাম না পরের সবজনমে আমি তোমার সন্তান হয়েই জন্মাতে চাই? আমি আর জন্মাব না বাবা। আমি শুধু চাই ওরা যেন তোমার সন্তান হয়ে জন্মায়। ওরা যেন জানতে পারে বাবা কেমন প্রেমের নাম। ওরা যেন জানতে পারে ‘বাবারা ঈশ্বর হন, ধর্ষক নন’।

লেখক: সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x