‘তুই’-‘আপনি’ আর বেতের বাড়ি

জোবাইদা নাসরীন ১৫:৪৯ , আগস্ট ১১ , ২০১৭

জোবাইদা নাসরীনআমরা আড্ডাই দিচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার এক ছোটবেলার চাকমা বন্ধু হেসে বলছিলেন, ‘আমিতো ছোটবেলায় শিক্ষকদের অনেক মার খেতাম এবং প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় অনেকবার স্কুল কামাই করেছি।’ আমরা সবাই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকদের কম বেশি মার খেয়েছি, কিন্তু এই কারণে স্কুল কামাই করেছি বলে মনে হয় না। আমরা তাকে আরও ক্ষ্যাপানোর জন্য জিজ্ঞেস করলাম সে কী কী দুষ্টুমি করতো। তার মুখের চিত্র কিছুটা গম্ভীর হলো। তখন সে বললো, ‘সে ছোট বেলায় বুঝতে পারতো না শিক্ষকদের আপনি বলতে হয়।  তখনও সে স্কুলে চাকমা ভাষাই বলতো।  চাকমা ভাষায় সবাই সবাইকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করেন।  ‘আপনি’র কোনও জায়গা নেই। তখন সে সব সময় স্কুলের শিক্ষকদের ‘তুই’ করে বলতো।  কিন্তু তার বাঙালি শিক্ষক এটিকে গ্রহণ করেছেন তার বেয়াদবি হিসেবে।  তাই তাকে মারতেন। কিন্তু সেই বন্ধু ছোটবেলায় কিছুতেই বুঝতে পারেনি তার কী সমস্যা। কেন শিক্ষক তাকে মারছেন? তাই সে মন খারাপ করে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। এভাবেই তার শিক্ষা জীবন থেকে দুই বছর চলে গেলো।

গত ৯ আগস্ট প্রতি বছরের মতো পালিত হয়েছে বিশ্ব আদিবাসী দিবস। বিষয়ে অনেকেই লিখেছেন।  কিন্তু আমার এই লেখার বিষয় সেটি নয়। আমার লেখনির বিষয় কিভাবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে জীবনযাপনের মধ্যে নিয়ে আসা যায়।এই লেখার প্রেক্ষাপট কয়েকটি প্রায়োগিত অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে।  শুধু রাঙামাটিতেই নয় এরকম ভাবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ‘আদিবাসী’ অধ্যুষিত এলাকাতেই এরকম সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার অভাব থাকায় বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন সেখানকার জনগণ। 

কিছুদিন আগে আমি গিয়েছিলাম মধুপুর এবং কলমাকান্দা। গবেষণাটি কাজটি ছিল ‘আদিবাসী’ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে।  সেখানে গিয়ে জানতে পারি যে ‘আদিবাসী সমাজ’ সম্পর্কে সরকারি কর্মকর্তাদের খুব বেশি ধারণা না থাকার কারণে বেশ কিছু সমস্যা তৈরি হয়।  অনেক মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের সনদ পাননি কিংবা অনেকের সনদ থাকা সত্ত্বেও ভাতা পাচ্ছেন না। যেমন গারোদের পদবী এবং গোত্র সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে বাঙালি অফিসারদের হাতে পড়ে অনেক পদবী পরিবর্তিত হয়ে গেছে।  যারা ভারতে ট্রেনিং করতে গিয়েছিলেন তাদের পদবী তাদের বড় গোত্র নামে (সাংমা অথবা মারাক, কারণ ভারতে গারোরা এই দুটো গোত্র পদবীই ব্যবহার করেন) তাই মুক্তিযুদ্ধের সনদ এবং মুক্তিবার্তাতেও সাংমা এবং মারাক পদবী হিসেবেই আছে।  কিন্তু বাংলাদেশে বসবাসরত গারোরা তাদের উপগোত্রীয় পরিচয় নামের পাশে ব্যবহার করেন এবং তাদের বেশিরভাগেরই জাতীয় পরিচয়পত্রে উপগোত্রীয় পদবী আছে।  সমস্যা হলো তখন মুক্তিযোদ্ধার সনদ আর পরিচয়পত্রে পদবী এক না হওয়ার কারণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।  আবার যেমন কারও নামের পদবী হচ্ছে সাংমা এবং বাঙালি অফিসারদের সেই বিষয়ে ধারণা না থাকার কারণে সেটি হয়ে যাচ্ছে শর্মা হিসেবে।  শর্মা পদবীটি বাঙালি হিন্দু পদবী।  গারোদের আরেকটি উপগোত্রীয় পদবী হলো স্নাল।  কিন্তু কারও কারও কাগজপত্রে সেটি স্যান্যাল হয়ে গেছে। এটিও বাঙালি হিন্দুদের পদবী।  পরের সমস্যাটি আরও বোঝাপড়ার।  তারপর মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকেই অনেক জায়গায় ছিলেন।  কিন্তু গারো সমাজ অনুযায়ী বিয়ের পরে ছেলেরা স্ত্রীর বাড়িতে জামাই হয়ে আসে এবং তাদের ঠিকানা পরিবর্তন করে।  তাই সেখানেও তাদের ঠিকানা পরিবর্তন তাদের ভেতন ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে।  এই সমস্যাগুলোর সমাধান খুব সহজভাবেই করা যায় যদি সেই এলাকা বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তার সেই সংস্কৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে।

আরও অবাক হয়েছিলাম যেদিন আমার মারমা বন্ধু বলেছিল- তার বাবার নাম জীবন চৌধুরী।  সেদিনও সে বলেছিলে স্কুলের শিক্ষক তার বাবার নাম পরিবর্তন করে দেন।  এর কারণ হিসেবে বলেন যে তার বাবার শিক্ষক বাবাকে বলেছিলেন যে তিনি ওই মারমা নাম তার উচ্চারণ করতে সমস্যা হয় এবং তিনি তার বাংলা নাম দেবেন।  এভাবেই অনেক ‘আদিবাসী’র নামই পরিবর্তিত হয়েছে।  পরিবর্তিত হয়েছে অনেক স্থান এবং অঞ্চলের নাম।  আর এভাবেই খাগড়াছড়ির খাগড়াপুর হয়ে গেছে ইসলামপুর, বেবোনছড়া হয়ে গেছে ভাইবোন ছড়া, উত্তদাছড়ির নাম হয়ে যায় রসুলপুর, পাঅংকাবারীপাড়া হয়ে যায় ফাতেমানগর আর তৈ কুসুম হয়ে যায় কালাপানি ছড়া।

তাই সরকারি কর্মকর্তা এবং শিক্ষকদের ‘আদিবাসী’ স্কুল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অফিসে পোস্টিং দেওয়া হয় সেক্ষেত্রে বিসিএস এবং অন্যান্য কোর্সে জাতিগত বৈচিত্র্যতার বিষয়টি নিয়ে একটি কোর্স কিংবা অন্য কোনোভাবে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।  আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে বোধটি কাজ করে সেটি হলো ভিন্নতাকে আমরা অন্যতা হিসেবে পাঠ করি।  যেকারণে সাংস্কৃতিক বৈচিত্যতাকে আমরা সৌন্দর্য হিসেবে না থেকে অন্যতা হিসেবে পাঠ করতে শিখি।  আর ঠিক একই কারণে একজন চাকমা কিংবা মারমা শিক্ষার্থীর জীবনের প্রথম থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠের দাপট অনুভব করতে থাকে এবং এর উত্তাপ তার গায়ে লাগে।  অন্য সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেওয়ার বোধ এবং তাদের সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণেই ‘তুই’ আর আর ‘আপনি’ চর্চার পার্থক্যকে ধারণ করতে না পেরে শিক্ষার্থীকে এই অপরাধে মারেন।  প্রয়োজন আইনের বিষয়গুলোতে দোভাষী নিয়োগ দেওয়া।  কারণ আমরা জানি ‘আদিবাসীরা’ ভাষাগত সমস্যার কারণে অনেক সময় উকিল বা রাষ্ট্রীয় অফিসারদের বোঝাতে পারেন না তাদের বিষয়গুলো।  বহু বছর আগে উত্তরবঙ্গের একজন সাঁওতাল কৃষক অভিযোগ করেছিল যে তিনি বিক্রি করেছেন বারো (সাওতালী ভাষায় বারো মানে চার) আর রেজিস্ট্রি করার সময় নিয়ে নিয়েছে বারো কাঠা।  দুই ভাষার বারোর পার্থক্যকে ধরার মতো অফিসার নিয়োগ সরকারকেই নিয়োগ করতে হবে।

তাই আজ বড্ড প্রয়োজন সব সংস্কৃতির প্রতি সমভাবে অনুভূতিশীল হওয়া। এই অনুভুতিশীলতার চর্চা প্রাত্যহিক জীবন যাপনের দর্শনে নিয়ে আসা খুবই প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

zobaidanasreeb@gmail.com

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x