বিশ্ব শান্তির মডেল শেখ হাসিনা

সাজ্জাদ সাকিব বাদশা ১৪:৪৪ , অক্টোবর ১১ , ২০১৭

সাজ্জাদ সাকিব বাদশা১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাষ্ট্রযন্ত্র রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্য যাবতীয় অধিকারকে অস্বীকার করে। এই অস্বীকার ১৯৪৮ সালে প্রণীত মানুষকে মর্যাদাবান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া ও জীবন পরিচালনা করার ঐতিহাসিক ও মহান বৈশ্বিক আইন ‘মানবাধিকারের সার্বজনিন ঘোষণাপত্রের’ও চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘন। ১৯৮২ থেকে ২০১৭। তিন যুগের দীর্ঘ এই সময়ে জাতিসংঘ, বিশ্বের শক্তিধর মোড়ল রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংস্থা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ফোরাম সকলে মিলেও জন্মভূমিতে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। একইসঙ্গে, মিয়ানমারকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সব মানুষের জন্য সমান সুযোগসম্পন্ন মানবিক রাষ্ট্রের পথেও ফিরিয়ে আনতে পারেনি। পাশাপাশি, রোহিঙ্গা সম্প্রদায় যে ধর্মের অনুসারি, সেই ধর্ম সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক রাষ্ট্রগুলোও রোহিঙ্গাদের অধিকারকে যৌক্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি বিন্দুমাত্রও। উপরন্তু, দিনকে দিন রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সব থেকে মূল্যহীন, সহায়হীন, অধিকারহীন জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
রোহিঙ্গা সমস্যাটি প্রাথমিকভাবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। একসময় ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে থাকা রোহিঙ্গারা ক্রমেই ক্ষমতাহীন থেকে জাতীয় দুশমনে পরিণত হয় মিয়ানমারে অগণতান্ত্রিক তথা সামরিক শাসনের ডালপালা বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে। অভ্যন্তরীণ এই সমস্যা প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে যখন রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের নিধন ও নির্মূলের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাটি বাংলাদেশ সংলগ্ন হওয়াই প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংক্রান্ত শরণার্থী সমস্যার সম্মুখীন হয় শুরু থেকেই। নির্যাতনের ফলে বাঁচার জন্য সীমানা অতিক্রম, সেনাবাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পুশ-ইন, জীবনযাত্রার উন্নতমান ও নিরাপত্তার কারণে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার স্বাভাবিক প্রবণতা, রোহিঙ্গাদের মধ্যকার জাতীয়তাবাদী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নানাবিধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় খোঁজার প্রচেষ্টা ইত্যাদি বহু কারণে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার স্বল্প ও অধিক সংখ্যায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশ ঘটে এবং তা বাংলাদেশের সংশিষ্ট এলাকার সমাজ-অর্থনীতিতে নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই নেতিবাচক প্রভাব এতোটাই প্রকট আকার ধারণ করে যে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পরিচয়ে পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাবিধ অপকর্মে জড়িত হয়ে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করে চরমভাবে। তাছাড়া সমুদ্রপথে বিভিন্ন ইসলামি এমনকি ইউরোপীয় রাষ্ট্রে প্রবেশ করেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় রোহিঙ্গাদের। এভাবে রোহিঙ্গা সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা থেকে ক্রমেই প্রতিবেশী দেশ হয়ে দূরবর্তী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।

সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, আমেরিকা-ইউরোপ জোটের দ্বারা মিয়ানমার নানাবিধ অবরোধের সম্মুখীন হয়। এই অবরোধের সময় দেশের ভঙ্গুর অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য মিয়ানমার একান্তভাবে সহযোগিতা পায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে। চীনের পরে যে রাষ্ট্রটি মিয়ানমারকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান করে তা হলো ভারত। এই সুবিধা একইসঙ্গে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক এবং অবকাঠামোগত। চীন ও ভারত অনেকটা প্রতিযোগিতা করেই মিয়ানমারের পাশে থাকার নাম করে সেখানে নিজেদের ব্যবসায়িক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ মিলিয়ে নেয়। পুরো এশিয়া মহাদেশে প্রভাব ও অবাধ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমেরিকা ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জোটের জন্য নিষিদ্ধ মিয়ানমার একসময় বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বঙ্গোপসাগর বেল্টে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য চীন, ভারত ও রাশিয়াকে প্রতিযোগিতায় পেছনে ফেলতে তাই মাঠে নামে তারা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে প্রণীত ‘ওবামা ডকট্রিন’ অনুযায়ী তাই দেখা যায় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে নিষিদ্ধ দেশ মিয়ানমারে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কয়েকবার সফরে আসেন। যার ফলশ্রুতিতে ওঠে যায় মিয়ানমারের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা। সামরিক শাসক নিজের গায়ের পোশাক বদলিয়ে গৃহবন্দী অং সান সু চি’কে মুক্তি দিয়ে একটি লেবাসধারী গণতন্ত্রের পোশাক পড়ে। বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান দৃঢ় করার জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশগুলোর কাছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানসম্পন্ন দেশ মিয়ানমার হয়ে ওঠে একটি আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা ক্ষেত্র। অর্থাৎ মিয়ানমার শক্তিধর দেশগুলোর কাছে চকচকে হীরক খণ্ডে পরিণত হয়। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের লেবাসধারী সামরিক প্রশাসনের যে কোনও কার্যক্রমকে সমর্থন ও বৈধতা প্রদান করা পরাশক্তি দেশগুলোর জন্য একটি নিত্য কর্মে পরিণত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে, একই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকেও নিতে চেয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছে মূলত বাংলাদেশের গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনার কারণে। ক্ষমতায় থেকে সরাসরি এবং ক্ষমতায় না থেকেও আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা তাঁর দল আওয়ামী লীগের মাধ্যমে পরাশক্তি দেশগুলোর এই অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়া, সু চি’র মুক্তি পাওয়া, লেবাসধারী গণতন্ত্রের প্রচলন হওয়া ইত্যাদি নানাবিধ পরিবর্তন সাধন হওয়ার পরেও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন ঘটে না। বিশ্ব বিবেক বাণিজ্যের খেলায় মেতে ওঠায় রোহিঙ্গাদের অধিকারের দাবি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মাধ্যমেও ওঠে আসে না উল্লেখজনকভাবে। অধিকন্তু, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলকে বৃহৎ বাণিজ্যিক ভূমি হিসেবে ব্যবহার করার যে প্রলোভন দেখায় পরাশক্তিধর বিভিন্ন দেশকে, তা তারা লুফে নেয়। বৈধতা দেয় রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো সরকারের যে কোনও অমানবিক ও নৃশংস কর্মকাণ্ডকে। যার ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর মানবাধিকার বিরোধী সামরিক অপারেশন পরিচালনা করে। যার অবধারিত ফলাফল বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রবেশ। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের স্থান দেওয়া ও লালন-পালন করা বিভিন্ন দিক দিয়েই ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক। এছাড়া অর্থনৈতিক দিকটি তো আছেই। তরপরও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় সরকার সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় প্রদান করে। শুধু আশ্রয়ই না, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো অমানবিক নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের জীবন বাঁচাতে দেশের প্রশাসনিক সবগুলো ইউনিটকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষও রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।

প্রসঙ্গ হলো, বিশ্বের মহান ও শক্তিধর দেশগুলো যখন রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক, মানবিক অধিকারকে নিজেদের লাভ-ক্ষতির সমীকরণ দিয়ে বিচার বিবেচনা করে মুখ বন্ধ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, জাতিসংঘে মিয়ানমারকে সমর্থন করে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছে, অর্থনৈতিক-সামরিক সহযোগিতা প্রদান করছে, ভেটো ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে মিয়ানমার সরকারের মানবতা বিরোধী অপরাধ কর্মকাণ্ডকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরম মমতায় ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘আমরা ১৬ কোটি মানুষের খাবার জোগাতে পারলে ছয় লক্ষ রোহিঙ্গাদেরও খাওয়াতে পারবো’। আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলছেন, ‘প্রয়োজনে আমার দেশের মানুষ একবেলা কম খেয়ে রোহিঙ্গাদের খাবার দেবে’। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থী সৃষ্টি, এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের বেঁচে থাকা মাত্র দুই সদস্য শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার উদ্বাস্তু জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রধানমন্ত্রী অসহায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহযোগিতা প্রদানের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যা কেবল একটি কাগুজে সিদ্ধান্ত নয়। দেশের প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রতিটি মন্ত্রণালয়, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে মানবিকতা প্রদর্শনের একটি অনন্য নজির স্থাপন করেন। শুধু তাই নয়, বহির্বিশ্বে বিশেষ করে জাতিসংঘের অধিবেশনে শেখ হাসিনা দৃপ্ত কণ্ঠে রোহিঙ্গাদের বৈধ সব অধিকার ফিরিয়ে দিতে যেন মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করা হয় আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের কাছে তা তুলে ধরেন এবং সহানুভূতি লাভ করেন।

মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা জাতিসংঘে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন যা বিশ্ব শান্তির মডেল হিসেবে সর্ব মহলে গৃহীত ও প্রশংসিত হয়েছে। মানবতা প্রদর্শনে ও বৈশ্বিক নেতৃত্বে এভাবেই শেখ হাসিনা তাঁর মহিমা প্রদর্শন করে চলেছেন। মাতৃসম মমতায় নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশ্বের প্রতিটি নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষের পক্ষ থেকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ শেখ হাসিনাকে জানাই কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ ও পরিচালক সিআরআই।

 

Advertisement

Advertisement

Pran-RFL ad on bangla Tribune x