ভিলেন শুধু সিএনজি চালকরা নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিও

গোলাম মোর্তোজা ১৬:০৮ , ডিসেম্বর ০৭ , ২০১৭

গোলাম মোর্তোজাবাংলাদেশের চেয়ে বহু গরিব দেশ বিশ্বে আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্যে গণপরিবহন নেই, এমন দেশ বিশ্বে দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাসের ঢাকা শহরে জনমানুষের উপযোগী কোনও পরিবহন ব্যবস্থা নেই। বাস আছে, নৈরাজ্যের চূড়ান্ত রূপ নিয়ে। নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন পরিবহনের জন্যে। নারী-শিশু-বৃদ্ধের এমন দুর্ভোগের চিত্র কেউ অন্য কোনও দেশে বা শহরে দেখেছেন কিনা জানি না। বাসে ওঠা যায় না। সিএনজি যেতে চায় না। যেতে চায় না মানে, ১০০ টাকার ভাড়া ৪০০ বা ক্ষেত্রবিশেষে ৫০০ টাকাও চায়। দামাদামি করে ২০০ বা ৩০০ টাকায় মানুষ যায়। তার চেয়ে বড় কথা সিএনজি চালকরা পায়ের ওপর পা তুলে রাস্তার পাশে বসে থাকেন।  ‘যাবেন?’- যাত্রীর দিকে না তাকিয়ে ‘না’ বলেন। কোনও কোনও সময় ৫০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা চেয়ে সিগারেট টানতে থাকেন। সিএনজি চালকদের আচরণে ঢাকা নগরের মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ।
এমন অবস্থায় ‘উবার’ এবং ‘পাঠাও’ অ্যাপস ভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু হলো ঢাকা শহরে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। মধ্যবিত্তের কাছে সিএনজির গুরুত্ব কমতে শুরু করলো। আগে সিএনজি চালকরা যাত্রীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন, এখন যাত্রীরা সিএনজি চালকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করলেন। আয় কমে যেতে থাকলো সিএনজি চালকদের। ধর্মঘটের ডাক দিলেন ‘উবার’, ‘পাঠাও’ এর বিরুদ্ধে। সাধারণ মানুষের ক্ষুব্ধতার প্রকাশ দেখা গেল। ‘ধর্মঘটকে স্বাগত’,  ‘ধর্মঘট সারাজীবন চলুক’-এসব মনোভাবের প্রকাশ দেখা গেল। সাধারণ মানুষ যেহেতু জিম্মি ছিল সিএনজি চালকদের কাছে, চালকদের আসন্ন বিপদের সময়ে মানুষের কোনও সহানুভূতি পেলেন না তারা। উল্টো মানুষ খুশি হলেন। প্রত্যাশা করতে থাকলেন, সিএনজি চালকেরা যাতে আরও বিপদে পড়েন।


ঢাকা শহরের নগর ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ভিলেন সিএনজি চালকরা। গরিব এই চালকদের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনও রকম সহানুভূতি নেই। সিএনজি চালকদের আচরণই তাদের ভিলেনে পরিণত করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, তাদের এই ভিলেন হয়ে ওঠার নেপথ্যে অন্য কোনও কারণ বা কী কারণ বিরাজমান, তা খুব একটা আলোচিত হয় না। ‘মালিকরা জমা বেশি নেয়’- তাছাড়া আর কোনও বিষয় প্রায় আলোচিত হয়ই না। এই না জানা বা কম আলোচিত হওয়া অন্য কোনও বিষয় এক্ষেত্রে আছে কিনা, সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।


১. এক সময় ঢাকা শহরে চলতো ‘বেবি ট্যাক্সি’। ১৯৯৯ সালে অত্যধিক শব্দ এবং দূষণ সৃষ্টিকারী ‘বেবি ট্যাক্সি’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই সময় ভারত থেকে সিএনজি অটোরিকশা আমদানির সুযোগ দেওয়া হলো। মূলত বেবি ট্যাক্সির মালিকরাই সিএনজি আমদানির সুযোগ পেলেন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১২ হাজারের মতো সিএনজি আমদানি করা হলো। ‘সিএনজি’র কারণে যানজট সৃষ্টি হয়’- এই কারণ দেখিয়ে নতুন করে সিএনজির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করলো বিআরটিএ।
২. ২০০৭ সাল থেকে বিকল্প উপায় বের করা হলো। বিআরটিএ এবং সিএনজি মালিকদের সম্মিলিত যোগসাজশে নতুন করে রাস্তায় নামতে থাকলো সিএনজি। বাণিজ্যিক রেজিস্ট্রেশন বা রোড পারমিট বন্ধ থাকলেও ‘প্রাইভেট’রেজিস্ট্রেশন ও রোড পারমিট দিতে শুরু করলো বিআরটিএ। ‘প্রাইভেট’ এর নামে ভারত থেকে আমদানি হয়ে এলো প্রায় ৭ হাজার ৫০০ সিএনজি। বিআরটিএ এবং পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশে প্রায় সব ‘প্রাইভেট’ সিএনজি চলতে থাকলো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে।
বিআরটিএ’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা শহরে বাণিজ্যিক ১২ হাজার এবং প্রাইভেট ৭ হাজার ৫০০, মোট ১৯ হাজার ৭৫০টি সিএনজি চলছে।
৩. বিআরটিএ সিএনজির নতুন রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ রেখেছে। পুরনো রেজিস্ট্রেশনের ভিত্তিতে পুরনো সিএনজি পরিবর্তন করে, নতুন সিএনজি রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ রেখেছে। এ কারণে ভারত থেকে সিএনজি আমদানি হচ্ছে, নতুন সিএনজি রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ থাকলেও। পুরনো সিএনজির পরিবর্তে নতুন সিএনজির রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী পুরনোটি আর রাস্তায় চলার কথা নয়। বাস্তবে একই রেজিস্ট্রেশনে পুরনো নতুন দুটিই চলছে কিনা,তা দেখার কেউ নেই বলা ঠিক নয়। যারা দেখবেন তাদের সম্মিলিত যোগসাজশে অরাজকতা তৈরি করে রাখা হয়েছে।
নতুন করে যেহেতু রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ, সেহেতু অবিশ্বাস্য রকমের গুরুত্বপূর্ণ বা মূল্যবান হয়ে উঠেছে পুরনো রেজিস্ট্রেশনের কাগজ। বিআরটিএ’র রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার ফি ছিল ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এখন তা বেড়ে ৮০০০ টাকা হয়েছে। ধারণা করতে পারেন ৮০০০ টাকার রেজিস্ট্রেশন কাগজটির মূল্য কত? ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে এখন তা ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। হ্যাঁ, ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৮০০০ টাকার রেজিস্ট্রেশন কাগজটির মূল্য এখন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। একজন আরেকজনের থেকে এই দামে কিনছেন। এই মূল্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলা সিএনজি রেজিস্ট্রেশন কাগজের।
‘প্রাইভেট’ রেজিস্ট্রেশন কাগজের মূল্য ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা।
গত পাঁচ-সাত বছরে যারা একটি সিএনজির মালিক হচ্ছেন, তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে বাণিজ্যিকের ক্ষেত্রে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা। প্রাইভেটের ক্ষেত্রে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা।
এই তথ্য আপনার কাছে যত ‘অবিশ্বাস্যই’ মনে হোক না কেন, এটাই সত্য।
ভারতে একটি সিএনজির মূল্য পড়ে ২ লাখ ৬০ হাজার রুপির মতো রেজিস্ট্রেশন এবং রাস্তায় চলাচলের অনুমোদন ফিসহ। শুল্কসহ নতুন একটি সিএনজির প্রকৃত মূল্য বাংলাদেশে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। শুরুতে দাম ছিল এক লাখ টাকারও কম। আর সেখানে রেজিস্ট্রেশনের কাগজই বিক্রি হচ্ছে ১২ লাখ টাকায়!

আরও পরিষ্কার করে বলি, ১২ লাখ টাকা শুধু রেজিস্ট্রেশন কাগজের দাম, সিএনজি ছাড়া। পুরনো সিএনজিসহ দাম ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা।

যেখানে ৮ থেকে ১৫ লাখ টাকায় ভারতীয় নতুন প্রাইভেট কার বা জাপানি ইউজড কার কেনা যায়, সেখানে ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা খরচ করে সিএনজি কেনা হচ্ছে।

৪. ‘প্রাইভেট’ নাম দিয়ে সিএনজি কিনেছে ঢাকা শহরের প্রভাবশালীরা। কারও কারও ২৫ থেকে ৩০ টি ‘প্রাইভেট’ সিএনজি আছে। এদের অনেকে পুলিশ। এই তালিকায় কয়েকজন সাংবাদিকের নামও আছে। একটি ‘প্রাইভেট’ সিএনজি ঢাকা শহরে চলার জন্যে প্রতিমাসে পুলিশকে দিতে হয় কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা। টোকেনের মাধ্যমে এই টাকা নেওয়া হয়। ৭৫০০ সিএনজি থেকে  ৫০০০ টাকা করে নেওয়া হলে, প্রতিমাসে শুধুমাত্র এই খাত থেকেই আয় হয় ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। পুলিশের মালিকানাধীন সিএনজিগুলো যদি টাকা না দেয়, তবুও কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা আসে এই খাত থেকে। এর বাইরে বাণিজ্যিকভাবে চলা প্রতিটি  সিএনজি চলার বিপরীতে পুলিশকে টাকা দিতে হয়।

প্রতিটি সিএনজি দুই বেলা হিসেবে ভাড়া দেন মালিকরা। বাণিজ্যিক সিএনজির এক এক বেলার ভাড়া ৯০০ টাকা, সারাদিনে ১৮০০ টাকা। ‘প্রাইভেট’ সিএনজির রাতের শিফটের ভাড়া ৫০০ টাকা, দিনে ৭০০ টাকা অর্থাৎ সারাদিনে ১২০০ টাকা।

গ্যাসের মূল্য, ছোটখাটো মেরামতের খরচ চালকদের।

৫. বিবেচনা করার বিষয় ১৫ বা ১৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা আয় কি খুব বেশি? মেরামত বা যন্ত্রাংশ সংযোজন খরচ আছে, প্রতিমাসে ৫০০০ টাকা পুলিশকে দেওয়ার ব্যাপার আছে। সিএনজি প্রায় নিয়ম করে ছিনতাই হয়। ছিনতাই হয়ে যাওয়া সিএনজি ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হয়। একদম শুরু থেকে ছিনতাইকারীদের নেটওয়ার্ক এবং ফিরিয়ে দেওয়া দালালারা তৎপর। পুলিশসহ সবাই সব কিছু জানে, এভাবেই চলছে।

এত ব্যয়ের পরও সিএনজিতে বিনিয়োগ লাভজনক ব্যবসা। কারণ, জনগণ জিম্মি। ১০০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা দিয়ে হলেও তাদের যাতায়াত করতে হয়। টাকার পরিমাণ বেশি এবং চালকদের ব্যবহার, জনমানুষের কাছে তাদের ভিলেনে পরিণত করেছে। তাদের ব্যবহার যদি একটু ভালো হতো, তারা যদি যাত্রীর চাহিদা অনুযায়ী সব দিকে যেতে রাজি হতেন, তবে তারা জনমানুষের কাছে এতটা ভিলেন হিসেবে পরিচিতি পেতেন না। সব খরচ বাদ দিয়ে একজন চালক যে অনেক বেশি টাকা প্রতিদিন আয় করেন, তা নয়।  তারা একজন যাত্রীর থেকে তিনগুণ ভাড়া আদায় করে, দুই ঘণ্টা গল্প করে কাটান। কোথাও যেতে রাজি হন না। এসব কারণে যাত্রীদের যাবতীয় ক্ষোভ চালকদের বিরুদ্ধে। উবার, পাঠাও’ এর কারণে সিএনজি চালকরা যখন যাত্রী হারিয়ে বিপদের মুখে পড়ছে, তখন সাধারণ মানুষ খুশি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সংবেদনশীলতার জায়গা থেকে তারা অনেক আগে নিজেদের বহুদূরে সরিয়ে নিয়ে গেছেন।

৬. যাত্রীদের প্রতি চালকদের আচরণ অবশ্যই সঠিক নয়। মিটারে না চলা, বেশি ভাড়া নেওয়া, যেতে না চাওয়া-এসবের জন্যে সরাসরি চালকরা দায়ী। কিন্তু যাত্রীদের পক্ষ হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে দায়িত্ব পালন করার কথা, তা করা হয় না। আইন মানতে বাধ্য করার জন্যে, কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। লোক দেখানো দুই চার দিনের ব্যবস্থা দিয়ে আইন প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

বিআরটিএ’র অস্বচ্ছ- অসৎ নীতির কারণে একটি পুরনো রেজিস্ট্রেশনের কাগজ বিক্রি হচ্ছে ১২ লাখ টাকায়। এর জন্যে চালকরা দায়ীও নন, লাভবানও নন। দায়ী বিআরটিএ তথা রাষ্ট্রীয় নীতি, লাভবান বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং পুলিশ।

সামগ্রিকভাবে গণপরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য, তারই ক্ষুদ্র একটি অংশ সিএনজি। এই নৈরাজ্যের দৃশ্যমান ভিলেন চালকরা। মালিক, পুলিশ, নীতি নির্ধারকরা কে কতটা দায়ী, তা অনুসন্ধানের সময় কারও নেই। চালকদের সামনে রেখে লাভবান হচ্ছেন অন্যরা । মূলত এই অন্যদের শেল্টারেই চালকরা এত বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন। চালকদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন বা অসম্ভব ছিল না। অন্যরা নিজেদের লাভের হিসাব নিয়ে ব্যস্ত থাকায় চালকদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেনি, করছে না। এখন সিএনজিগুলোকে অ্যাপস ভিত্তিক করার চেষ্টার কথা জানা যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো উবার, পাঠাও -এর মতো এত বড় বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, সম্ভবত সিএনজি’র পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। সেতু নির্মাণের পর নদী পারাপারের জন্যে খেয়া নৌকার মাঝির যে অবস্থা হয়, এখন সিএনজি চালকদের হয়েছে তেমন অবস্থা। সিএনজি তার গুরুত্ব হারাচ্ছে, আগামী দিনে আরও হারাবে। টিকে থাকতে হলে বিকল্প উপায় বের করতে হবে, ধর্মঘট করে কোনও লাভ হবে না। শেয়ারে নির্দিষ্ট ভাড়ায় মূল সড়কের বাইরে এলাকাভিত্তিক চলাচল একটা উপায় হতে পারে। কোলকাতায় এভাবেই চলে। তবে যে কোনও কিছুর আগে চালকদের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। আর রাষ্ট্রীয় নীতি হওয়া দরকার জনবান্ধব, লুটেরা বা ক্ষমতাবান বান্ধব নয়।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

 

/এপিএইচ/

x