একটি মিছিলের খসড়া

রেজানুর রহমান ১৮:৪০ , জানুয়ারি ০৮ , ২০১৮

রেজানুর রহমানসোবহান সাহেব ঢাকায় এসে অনেকটাই বিপাকে পড়েছেন। কোনও কিছুর সঙ্গেই তাল মেলাতে পারছেন না। আজ সকাল বেলার কথাই ধরা যাক। ফজরের আজানের শব্দে ঘুম ভেঙেছে। প্রচণ্ড শীত। তবু লেপের ওম সরিয়ে ওজু সেরে নামাজ পড়লেন। গ্রামের বাড়িতে এই সময় এককাপ গরম চা বরাদ্দ থাকে তার জন্য। শহরের বাড়িতে কে কার খোঁজ রাখে! আকাশ ফর্সা হয়েছে। রোদও উঠেছে। অথচ গৃহপরিচারিকাও ঘুম থেকে ওঠেননি। তারা কি সকালের সূর্য দেখেন না? আহারে! কী দুর্ভাগা!

সকালে নাস্তার টেবিলে বসে অবাক হলেন সোবহান সাহেব। ছোট নাতি এগারো বছরের আবিদকে অনেক সাধ্য-সাধনার পর ঘুম থেকে তোলা গেছে। ড্রাইভার তাকে স্কুলে নিয়ে যাবেন। তিনি বার বার তাগাদা দিচ্ছেন, আবিদ ভাইয়া জলদি করেন। আরেকটু পরে বের হলে ট্রাফিক জ্যামে আটকে যামু। তখন কিন্তু আমাকে ব্লেইম দিতে পারবেন না। ড্রাইভারের কথায় মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছে না আবিদ। যতনা নাস্তা খাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি খাচ্ছে ফেসবুক। এই বাসায় ঢোকার পর থেকেই সোবহান সাহেব খেয়াল করেছেন, কমবেশি সবাই মোবাইলে ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত। বিশেষ করে এগারো বছরের এই ছেলেটি ফেসবুক ছাড়া যেন কিছুই বোঝে না। রাতে অদ্ভুত একটা বিষয় খেয়াল করেছেন। এই বাসায় তিনটি ঘরে তিনটি টেলিভিশন সেট। একটা ড্রয়িং রুমে। আরেকটা আবিদের ঘরে। অন্যটা আবিদের মায়ের ঘরে। রাতে টেলিভিশনে দেশের খবরা-খবর দেখে ঘুমাতে যান সোবহান সাহেব। এটাই তার নিত্য দিনের অভ্যাস। অথচ ঢাকায় ছেলের বাসায় এসে দেশের খবর দেখার সুযোগ পাচ্ছেন না। এদের বাসায় বাংলা পত্রিকা রাখা হয় না। তিনটি টেলিভিশন সেটিই বিদেশি চ্যানেল দেখা হয়। ঢাকায় আসার পর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকদের অনশন করতে দেখেছেন। তারা শেষপর্যন্ত অনশন ভাঙলেন কিনা, তা জানার বড্ড ইচ্ছে হচ্ছিল। দেশের যেকোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেলে চোখ রাখলেই খবরটা জানা যাবে। কিন্তু তিনটি টিভি সেটের একটিতেও দেশের টিভি চ্যানেল খোলা নাই। ড্রয়িং রুমে একটি বিদেশি টিভি চ্যানেলে ভারত বনাম সাউথ আফ্রিকার ক্রিকেট খেলা দেখছে বড় নাতি সাব্বির। আবিদের ঘরে বিদেশি টিভি চ্যানেলে কার্টুন চলছে। আর আবিদের মায়ের ঘরে পাশের দেশের একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে ধারাবাহিক নাটক চলছে। সোবহান সাহেব ভেবেছিলেন, আবিদের মাকে অনুরোধ করবেন, বউমা পাঁচ মিনিটের জন্য কি দেশের কোনও একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালু করা যাবে? প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকেরা আমরণ অনশন করছেন। শেষ পর্যন্ত তাদের কী হলো, জানা দরকার।


কিন্তু একথা বউমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারেননি সোবহান সাহেব। কারণ, বউমা তখন টিভির দিকে তাকিয়ে কাঁদছেন আর চোখ মুচছেন। হঠাৎ তার মোবাইলে ফোনে কল এলো। অবাক কাণ্ড! পাশের ঘর থেকে আবিদ তার মাকে ফোন দিয়েছে। আবিদের মা ফোন রিসিভ করে বিরক্ত মুখে বললেন, আবিদ এখন একদম ঝামেলা করবে না। আমার মন খুব খারাপ। জানো, জামাই রাজার ইশান ও নীলাশার সংসার বোধ করি টিকবে না! বলেই কেঁদে ফেললেন আবিদের মা।
এই দৃশ্য দেখার পর থেকেই সোবহান সাহেব ভেবেছিলেন, ছেলের সঙ্গে একবার বৈঠকে বসবেন। কিন্তু ছেলের সাক্ষাৎ পাওয়াও মুশকিল। রাতে পাঁচ মিনিটের জন্য দেখা হয়েছিল। শুধু জিজ্ঞেস করেছে, বাবা তোমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?
না, আমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। তোর কি একটু সময় হবে? কিছু কথা বলতাম।
ছেলে ব্যস্ততা দেখিয়ে বলেছিল, আজ আমি খুবই টায়ার্ড বাবা। অফিসে একটা ঝামেলা যাচ্ছে। রাতে কিছু ফাইল-পত্র দেখতে হবে। কাল সকালে না হয়।
সকালে ছেলেকে পাওয়া গেলো না। কোন ফাঁকে অফিসে চলে গেছে, টেরই পাননি সোবহান সাহেব। আবিদের সঙ্গে সকালের নাস্তা খেতে বসেছেন। কিন্তু আবিদ নাস্তার চেয়ে ফেসবুক খাচ্ছে বেশি। তার একহাতে পরোটার ছেঁড়া অংশ। অন্য হাতে মোবাইল। আবিদকে মৃদু ধমক দিলেন সোবহান সাহেব। দাদু ভাই আগে নাস্তা খাও।
সোবহান সাহেবের কথায় মোটেই গুরুত্ব দিলো না আবিদ। আধাছেঁড়া পরোটা মুখে দিয়ে মোবাইলে ফেসবুক খেতে খেতেই ড্রাইভারের সঙ্গে স্কুলের উদ্দেশে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো।
সোবহান সাহেবের মন খারাপ। ঢাকায় এরা এত ব্যস্ত জানলে কোনোমতেই ঢাকায় আসতেন না। সকালের নাস্তা খেয়ে বাসা থেকে বের হলেন। প্রেসক্লাবের দিকে যেতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষকদের শেষ পর্যন্ত কী হলো, দেখা দরকার। লিফটে উঠেছেন। পাশের বাসার এক ভদ্রলোক সঙ্গে একটি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে লিফটে আগে থেকে দাঁড়িয়ে আছেন। সোবহান সাহেবের ধারণা ছিল, লোকটি তাকে দেখে হয়তো সালাম দেবেন। কারণ গ্রামে সাধারণত বয়োঃজ্যেষ্ঠদের দেখলে সবাই সালাম দেয়। কুশল জানতে চায়। কিন্তু এই লোক সালাম তো দিলেনই না। বরং এমনভাবে তাকালেন. যেন সীমাহীন বিরক্তি তার ওপর ভর করেছে। তার পাশে দাঁড়ানো ছোট্ট শিশুটি বেশ ফুটফুটে। সে সোবহান সাহেবের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সোবহান সাহেব তার গাল ছুঁয়ে আদর করতে চাইলেন। লিফটের দরজা খুলে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হলো না। লোকটি শিশুটির হাত ধরে হনহন করে লিফট থেকে বেরিয়ে গেলো!
রাস্তায় নেমে এলেন সোবহান সাহেব। গুলশান নিকেতন থেকে পল্টন এলাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের দিকে যাবেন! রিকশায় সেখানে যাওয়ার সুযোগ নেই। সিএনজি অটোরিকশাই ভরসা। পরপর পাঁটি অটোরিকশার ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বললেন। কেউই মিটারে ভাড়া যেতে রাজি নয়। একজন চাইল আড়াইশ টাকা। দুই জন দুই শ ত্রিশ। অন্য দুই জন মিটারে যেতে রাজি কিন্তু মিটারে যা ভাড়া উঠবে তার থেকে ৩০ টাকা বেশি দিতে হবে। অবশেষে একজনকে পাওয়া গেলো, সে মিটারে যেতে রাজি আছে। তবে আবদার করে বললো, আপনে খুশি হয়ে যা দেবেন, তাতেই সই। ওঠেন তো। সিএনজি অটোরিকশায় উঠে বসলেন সোবহান সাহেব। নাবিস্কো মোড়ের কাছে এসে সিএনজি অটোরিকশা ওই যে থামলো, আর নড়ার কোনও লক্ষণ নেই। আগেপিছে প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। অটোরিকশার ড্রাইভার আনমনে বিরক্তি প্রকাশ করেই চলেছে, এই শহরে মানুষ থাকে! পাঁচ মিনিটের রাস্তা যেতে সময় লাগে দেড় থাইক্যা দুই ঘণ্টা। অর্থের ক্ষয়, সময়ের ক্ষয়। সবচেয়ে বড় কথা মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। মনে করেন, হুদা কাজে আপনি রাস্তার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা আছেন। মেজাজ কিভাবে ঠিক রাখবেন?
মজার ব্যাপার হলো, মগবাজার ওভার ব্রিজে ওঠার আগে সিএনজি অটোরিকশার মিটারে দুই শ টাকা পার হয়ে গেছে। ওভার ব্রিজে ওঠার পর আবার ট্রাফিকজ্যাম শুরু হলো। ড্রাইভার আগের মতোই খিস্তি আওড়াচ্ছেন–‘এই শহরে কোনও কিছুরই সঠিক পরিকল্পনা নাই। আপনি ওপর দিয়া সর সর কইর‌্যা নিচে নামলেন। কিন্তু নিচে সরসর কইর‌্যা যাওয়ার সুযোগ তো থাকতে হবে। সেই সুযোগ তো নাই। তাই প্রতিদিন যা হওয়ার তাই হইতেছে। সামনে এই শহরের ওপর আরও কঠিন সাজা আসবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মনে করেন আরও ৩০ ভাগ গাড়ি এই শহরে ঢুকবে। তখন যে শহরের অবস্থা কী হবে, বলা মুশকিল!’
অবশেষে সিএনজি অটোরিকশাটি যখন প্রেসক্লাবের সামনে এসে থামলো তখন তার মিটারে ২৮০ টাকা উঠে গেছে। ড্রাইভারের মুখে তৃপ্তির হাসি! সোবহান সাহেব বুঝে পেলেন না ড্রাইভার এভাবে হাসছে কেন? পকেট থেকে ৩০০ টাকা বের করে দিলেন। ড্রাইভার আরও খুশি হয়ে তার অটোরিকশা নিয়ে চলে গেলেন।
প্রেসক্লাবের সামনে ফুটপাতের ওপর একদল শিক্ষক বসে আছেন। কিন্তু তাদের অচেনা মনে হচ্ছে। দুই দিন আগে যাদের এখানে দেখে গেছেন, তারা নেই। তার মানে তাদের দাবি-দাওয়া কি মিটে গেছে? পাশেই দাঁড়ানো এক যুবককে জিজ্ঞেস করতেই ঘটনাটা তার কাছে পরিষ্কার হলো। এমপিওভুক্তির দাবিতে যারা আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে অনশন ভঙ্গ করেছেন। যার যার ঠিকানায় চলে গেছেন। নতুন করে যারা আন্দোলন শুরু করেছেন, তারা মাদ্রাসাশিক্ষক। সবকিছু অবাক লাগছে সোবহান সাহেবের কাছে। প্রেসক্লাবের সামনের এই রাস্তাটি কি তাহলে দাবি আদায়ের মোক্ষম জায়গা। ননএমপিও শিক্ষকদের আগে আন্দোলন করেছেন দেশের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষকেরা। তাদের আন্দোলন শেষ। আন্দোলন শুরু হলো ননএমপিও শিক্ষকদের। তাদের পর আন্দোলন শুরু করেছেন মাদ্রাসাশিক্ষকেরা। এরপরও কি আন্দোলনের নতুন তালিকা আছে?
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলেন সোবহান সাহেব–এই যে সবাই আন্দোলন করছেন, শুধুই কি নিজেদের লাভের জন্য? জাতীয় স্বার্থ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? এগারো বছরের একটি শিশু ফেসবুকের প্রতি এই যে এত আকৃষ্ট হয়েছে, এর লাগাম ধরবে কে? বাড়ির গৃহিণী বিদেশি অবাস্তব কাহিনির টিভি সিরিয়াল দেখে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়। তাকে ফেরাবে কে? নিজেদের এত টিভি চ্যানেল তবুও কেন এত আগ্রহ অন্যের প্রতি? এই ঘর থেকে ওই ঘরে ফোনে কথা বলার সংস্কৃতি চালু হলে পারিবারিক মূল্যবোধ বলে কি কিছু থাকবে? এ ব্যাপারে কার্যকর পজিটিভ ভূমিকা পালন করতে পারেন একমাত্র শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক-শিক্ষিকারাই। তারা কি আদৌ এ ব্যাপারে ভাবেন?
স্যার, আসসালামুআলাইকুম। একজন তরুণের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলেন সোবহান সাহেব। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মাঝবয়সী এক তরুণ। তার হাতে ধরা একটি প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা–আপনি কি দেশকে ভালোবাসেন? তাহলে দেশের পণ্য কিনুন, দেশের টেলিভিশন দেখুন, দেশের সংস্কৃতিকে লালন করুন, গুণীদের শ্রদ্ধা ও সম্মান জানান, আর হ্যাঁ, প্রতিদিন দেশের জন্য একটা ভালো কাজ করুন।
তরুণটির পেছনে তারই বয়সী আরও কিছু তরুণ-তরুণী এসে দাঁড়িয়েছেন। তাদের হাতেও প্ল্যাকার্ড। তরুণটি বললেন, স্যার আমাদের সাথে যাবেন?
কোথায়? জানতে চাইলেন সোবহান সাহেব।
আমাদের মিছিলে।
সোবহান সাহেব ছেলেটির হাত থেকে প্ল্যাকার্ডটি নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালেন। একসময় তার মনে হলো মিছিলটা বড় হচ্ছে। অনেক বড়।

লেখক : সম্পাদক, কথাসাহিত্যিক, পরিচালক, নাট্যকার।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

x