আসামের বাঙালি ‘মুসলমান খেদাও’ অভিসন্ধি

আনিস আলমগীর ১৪:৩০ , জানুয়ারি ০৯ , ২০১৮

আনিস আলমগীরব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান অঞ্চল মিলিয়ে অভিন্ন ভারত ছিল। এমনকি বার্মাও (বর্তমানে নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার) ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশের অংশ ছিল। শাসন কাজের সুবিধার জন্য মিয়ানমারকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তাই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে লোক যাওয়া অবাধ সুযোগ ছিল। বসতি করাতেও কোনও বাধা ছিল না।
আসাম আর বাংলা তো বহুদিন একসঙ্গে ছিল। মূলত বাংলাদেশের মানুষই আসামকে বাসযোগ্য করেছে। নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ অনেক কারণে বাংলা অঞ্চল থেকে ছিন্নমূল হয়ে হিন্দু মুসলমান আসামে গিয়ে বসতি গড়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর বাংলাদেশ অঞ্চল থেকে আসামে বা ভারতে কোনও মুসলমান যায়নি। তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ পশ্চিমবঙ্গে, আসামে ও ত্রিপুরায় গিয়েছিল ও সেখানে বসতি গড়েছে। হিন্দু মহাসভার নেতা ডক্টর শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী তো পণ্ডিত জওহর লাল নেহরুকে বাংলাদেশ থেকে সব হিন্দু নিয়ে সমপরিমাণ মুসলমান ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করেছিলেন। এ প্রস্তাব না মানায় শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী নেহরু-লিয়াকত চুক্তির পর পদত্যাগ করেছিলেন। এক্সচেঞ্জ প্রস্তাব নেহরু-লিয়াকত চুক্তিতে না থাকায় অর্থ কমিশনের সভাপতি ক্ষিতিশ চন্দ্র নিয়োগী আর অর্থমন্ত্রী জন মাথাইও নেহরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এক্সচেঞ্জ কেন নেহরু চাননি, তার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তা ছিল উপভোগ্য।
নেহরুর ধারণা ছিল, পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ১৫/১৬ বছরের মধ্যে। আর বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা যখন আর্থিক কারণে নিজেকে এবং নিজের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে পারবে না, তখন স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগ দেবে। এমন একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতি যেখানে নিশ্চিত, সেখানে লোক এক্সচেঞ্জর মতো একটি বিরাট ঝামেলার দায়িত্ব নিতে যাবেন কেন? নেহরুর ধারণা অনুযায়ী, পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছে সত্য, কিন্তু আর্থিক কারণে ভারতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রস্তাব করেননি কখনও।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান ভারতের মানুষের চেয়ে ভালো। এই পরিবর্তন বাংলার মানুষের কৃতিত্ব। আসলে বাংলা তো ছিল ফারমার্স স্লাম, দরিদ্র কৃষকের বস্তি। এই বস্তির এত উন্নতি হবে, তা নেহরুর কল্পনায় হয়তো ছিল না। ভূমিপূত্র দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে রাতও দিন হয়। ইসরায়েলের এক কোটি ইহুদির সঙ্গে আরবের ৩০ কোটি মানুষ পেরে ওঠে না সে কারণেই।

যাক, লিখতে বসেছি আসামের মুসলমানদের সম্পর্কে। প্রাসঙ্গিক বলে ইতিহাস টানতে হলো। আসাম ছিল কমিশনার শাসিত এলাকা। ব্রিটিশেরা যখন আসামকে প্রদেশ বানাতে চাইলেন, তখন কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ একটা প্রদেশ গঠনের জন্য যতটুকু রাজস্ব আয়ের প্রয়োজন হয়, ততটুকু রাজস্ব আসামে আদায় হতো না। তখন আসাম সীমান্তের বাংলাদেশের সিলেট জেলা এবং রংপুরের গোয়ালপাড়া মহকুমাকে আসামের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ১৮৭৪ সালে আসাম রাজ্য গঠন করা হয়েছিল।

বাংলাকে ভেঙে তার আড়াইটা জেলা নিয়ে যাওয়া বেদনাদায়ক বিষয় হলেও কখনও বাঙালিরা ব্রিটিশের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনে নেহরু সরকার যখন টালবাহানা শুরু করে, তখন তেলুগুভাষী অঞ্চলের গান্ধীবাদী নেতা পট্টি শ্রীরামুলু মাদ্রাজ থেকে তেলুগুভাষী অঞ্চল বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবিতে অমরণ অনশন শুরু করেছিলেন। ৯৩ দিন অনশনের পর তার মৃত্যু হলে ১৯৫৬ সালে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের জন্য লোকসভা বিচারপতি ফজল আলী কমিশন গঠন করেছিলেন। তার অন্য দুই সদস্য ছিলেন কে এস পানিক্কর ও হৃদয়নাথ কুঞ্জুর।

এই কমিশনের কাছে বিহারের বাংলাভাষী অঞ্চলকে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্য অনেক বাড়াবাড়ি হলেও আসামের বাংলাভাষীদেরকে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনও কথাই হয়নি। অথচ তখন বাংলাভাষীদের আসাম থেকে পৃথক করে পশ্চিমবাংলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই সমীচীন ছিল।

‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন করছে আসামিরা বহুদিন থেকে। ব্রিটিশ সরকার মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলনে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে ময়মনসিংহ ও পাবনা জেলা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তখন তিনি আসামের ধুবড়ীর ভাসানচরে গিয়ে বসতি করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে তিনি আসাম মুসলিম লীগের সভাপতিও হয়েছিলেন। ব্রিটিশের সময়ে আসাম সরকার ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনে সফল হয়নি মরহুম মওলানার দৃঢ় অবস্থানের কারণে।

১৯৩৭ সালের নির্বাচনে মওলানা ধুবড়ী থেকে থেকে মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য হিসেবে পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আসাম পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। আর দীর্ঘ ৮ বছর পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে মওলানা ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন করেছিলেন।

আসামে মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেসের যৌথ সরকার ছিল। মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন স্যার সৈয়দ মুহাম্মদ সাদউল্ল্যাহ আর কংগ্রেসের নেতা ছিলেন গোপীনাথ বারদুলুই। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত স্যার সৈয়দ সাদউল্লাহ ও গোপীনাথ বারদুলুই আসামের পর্যায়ক্রমে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কী পূর্ব বাংলায় কী আসামে, মওলানার খুঁটির জোর ছিল সাধারণ গরিব কৃষক। তিনি সময়ে সময়ে কৃষক সম্মেলন ডেকে কৃষকদের ঐক্যকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে রাখতেন। ১৯৪২ সালে তিনি কাগমারিতে কৃষক ও অভিবাসী সম্মেলন করেছিলেন। উত্তর প্রদেশের মওলানা আযাদ সোবহানী এ সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। লেখক সৈয়দ ওয়ালিউল্ল্যাহ্ এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার এক লেখায় লিখেছেন, সম্মেলনে দুই লাখ কৃষক ও অভিবাসী উপস্থিত ছিলেন।

আসাম ছিল জঙ্গলাকীর্ণ জায়গা। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, রংপুর, কুচবিহার, ত্রিপুরা ও সিলেট থেকে লাখ লাখ ভূমিহীন কৃষক গিয়ে আসামে বসতি গড়ে তুলে এবং জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষাবাদের ব্যবস্থা করেছিল। তেজপুর জেলায় তো কোনও উপজাতিও ছিল না। আর তেজপুর আবাদ করতে শত শত অভিবাসী কৃষক হিংস্র জন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছিলো। আসাম পরিষ্কার হওয়ার পর যখন উদ্বৃত্ত এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো তখন লাইন প্রথা চালু করা হলো।

এ প্রথা ছিল নির্মমতার, নিষ্ঠুরতার, জুলুমের শেষ নিদর্শন। মওলানা ভাসানী বলতেন মশা এত বড় বড় ছিল যে, সূতা দিয়ে মশার পা বাধা যেত। মশার কামড়ে কালাজ্বর হয়ে হাজার হাজার অভিবাসী কৃষক মরেছে। সময়ে সময়ে কালাজ্বল মহামারি হিসেবে দেখা দিতো।

যা হোক, শেষ পর্যন্ত অভিবাসী কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমে আসাম শষ্যভাণ্ডারে পরিণত হয়। প্রথম প্রথম বাঙালি অভিবাসী কৃষকদের আসাম সরকার স্বাগত জানাতো। গোয়ালপাড়া জেলা, নওগাঁ জেলা, দরংগ জেলা, কামরূপ জেলা তেজপুর জেলা মূলত আবাদ হয়েছে মুসলমান অভিবাসী কৃষকদের দ্বারা। সাধারণত আসামিরা সোজা প্রকৃতির লোক, তারা অলস প্রকৃতির মানুষও। কখনও অভিবাসী কৃষকদের সঙ্গে কোনও বিরোধে জড়িত হতো না।

মূলত আসামীয়রা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে এমন এক আজগুবি অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথম আসামীয় ‘শয়তান বুদ্ধিজীবীরা’ই ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন গড়ে তুলে। বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনের ফলে সরকার লাইন প্রথা চালু করেছিল। এই প্রথামতে নবাগত কৃষকদের অধিকারযোগ্য ভূমির সীমারেখার লাইন টেনে দেওয়া হলো। ফলে লাইনের বাইরে অ-আসামীয় কোনও কৃষক জমির বন্দোবস্ত পেতো না। আর এটাই ছিল কুখ্যাত লাইন প্রথা। এ লাইন প্রথার বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত আন্দোলন করেছিলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলন করেছিল আসামের ছাত্র সমাজ। আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন-এর এই আন্দোলনের পেছনে বিজেপির সমর্থন ছিল। ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার ছাত্রদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট লোক গণনার নির্দেশ দেয় এবং নাগরিক লিস্ট তৈরির কথাও বলেন। তখন এও স্থির হয়েছিল যে, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত যারা আসামে ছিল, তারা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবে। সিদ্ধান্তটা ছিল সুবিবেচনাপ্রসূত কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যারা গিয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের সেখানে থাকা তো অন্যায়। তবে মুসলমানেরা শতাংশে ফিরে এসেছিল। হয়ত বা কিছু হিন্দু থেকে যাওয়া বিচিত্র নয়।

ভারতের কেন্দ্রীয় মোদি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, যেকোনও হিন্দুধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ভারতে এসে নাগরিকত্ব চাইলে তারা নাগরিকত্ব পাবে। সুতরাং যে সব হিন্দু রয়ে গেছে, তাদেরও কোনও অসুবিধা হবে না। টার্গেট সেখানকার বাঙালি মুসলমান।

আসামে এখন বিজেপির সরকার। সবাই ভয় করছে লিস্ট তৈরিতে তারা কোনও হেরফের করবে কিনা! মুসলমানদের বাদ দেওয়ার দুরভিসন্ধি করা তো বিচিত্র নয়। আরএসএস তো ঘর ওয়াপসি আন্দোলন করছে। গরু নিয়ে এ যাবৎ ৭৪ জন মুসলমান হত্যা করেছে। সুতরাং লিস্ট তৈরির ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। কারণ ‘বাঙাল খেদাও’ আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন আসামের বুদ্ধিজীবীরা আর আসামীয়া ছাত্ররা। আসামের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজও বিশৃঙ্খল চিন্তায় মোটামুটি অভ্যস্ত।

প্রাথমিকভাবে একটা লিস্ট প্রকাশিত হয়েছে। লিস্টে বহু এমপি এমএলএ-ও বাদ পড়েছেন। মনে হয় লিস্টটি যত্নসহকারে তৈরি করা হয়নি। এমনকি অল-আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের নামও বাদ পড়েছে। অথচ তারাই হচ্ছেন এ লিস্টের হোতা। আবার লোকসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, লিস্ট তৈরিতে কোনও ত্রুটিবিচ্যুতি করার অবকাশ থাকবে না।

জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ-এর প্রেসিডেন্ট মাওলানা সৈয়দ আরশাদ মাদানী ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। এখন তার উচিত হবে আসাম সফর করা, কারণ আসামের অধিকাংশ ধার্মিক মুসলমান তার মুরিদ। সঠিক লিস্ট তৈরির তাগিদ দিয়ে এলাকায় এলাকায় মিটিং মিছিল করা খুবই জরুরি। নেতৃত্ব দেওয়ার লোকের অভাব হলে অন্যায় করতে কেউ দ্বিধা করবে না। লাইন প্রথা আন্দোলনের সময় মওলানা ভাসানী ছিলেন ওয়াচ ডগের মতো ব্যক্তিত্ব। তিনি বলতেন গুলি করে ঝাঁজরা করে ফেললেও তোমরা ভিটা ছাড়বে না।

আসামের মুসলমান নিয়ে কোনও নয়-ছয় করলে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হবে। বিষয়টা পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বুঝেছেন তাই তিনি আগুন নিয়ে না খেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ১৯৮৩ সালে আসামে ‘বাঙাল খেদাও’র দাঙ্গায় দুই হাজার মুসলমান মরেছে। গুজরাটের দাঙ্গাও দুই হাজার মুসলমান মরেছিল। বিজেপি শাসিত রাজ্যে মুসলমান হচ্ছে ঘরে রাখা মুরগীর মতো, যখন ইচ্ছে তখন জবেহ করা যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমএনএইচ/

x