প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তবে...

প্রভাষ আমিন ১৭:৪৩ , জানুয়ারি ০৯ , ২০১৮

প্রভাষ আমিনপ্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তার নির্দেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ ইউসুফের। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তবে এই ধন্যবাদের সঙ্গে কিছু প্রশ্নও আছে। চট্টগ্রামের একজন সাবেক সংসদ সদস্যের চিকিৎসার জন্যও কেন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগবে? এটা ঠিক সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীই সরকারের প্রধান নির্বাহী। আর বাংলাদেশে এখন রাজনীতি, প্রশাসন, সরকার সবকিছুই শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক। আর শেখ হাসিনাও দক্ষ, আন্তরিক, মানবিক। দেশের, মানুষের খুঁটিনাটি বিষয়ও তার নজর এড়িয়ে যায় না।
সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইউসুফ ২০০১ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই শয্যাশায়ী। তারপর নানা রোগব্যাধিতে কাবু। সম্প্রতি তার অবস্থার অবনতি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে। সেই ঝড় ছুঁয়ে গেছে মানবিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। তিনি খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। শেখ হাসিনা সব খুঁটিনাটি খোঁজ রাখেন, ব্যবস্থা নেন, তিনিই শেষ ভরসা; সবই মানলাম। কিন্তু শেখ হাসিনাকে সহায়তার জন্য তো বেশ বড়সড়ো একটা মন্ত্রিসভা আছে। সর্বশেষ অন্তর্ভুক্তির পর এই সংখ্যাটা ৫৪। উপদেষ্টা ও মন্ত্রীর পদমর্যাদা ধরলে এই সংখ্যাটা ৬০। আছে বিশাল আমলাতন্ত্র। তাহলে সব খুঁটিনাটিতে যদি প্রধানমন্ত্রীকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে বাকিদের কাজ কী? কেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য এতদিন মোহাম্মদ ইউসুফের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেননি? শেষ পর্যন্ত তো মোহাম্মদ ইউসুফ আওয়ামী লীগের নেতাই ছিলেন। আওয়ামী লীগ ৯ বছর ধরে ক্ষমতায়, আর তাদের একজন সাবেক সংসদ সদস্য ১৭ বছর ধরে শয্যাশায়ী; তাদের কোনও খোঁজ নেই। এটা কোনও কাজের কথা নয়।
প্রশাসন, আমলাতন্ত্রের কথা না হয় বাদই দিলাম। মোহাম্মদ ইউসুফ যে আসন থেকে ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন, সে আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদ। মন্ত্রিসভার সাবেক এই সদস্য কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও প্রভাবশালী। প্রায় নিয়মিত বিরোধী দলকে যা-তা ভাষায় আক্রমণ করে বক্তব্য রাখছেন। ড. হাছান মাহমুদের এখন যে অবস্থান, যে প্রভাব, যে অর্থনৈতিক অবস্থান; তার একটু ইশারায় অনেক আগেই মোহাম্মদ ইউসুফের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারতো। অন্য সব কথা বাদই দিলাম, মোহাম্মদ ইউসুফের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে নির্বাচনি প্রচারণায়ও তিনি তা কাজে লাগাতে পারতেন। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের অনেককে দেখলেই মনে হয় নির্বাচন, ভোট, জনগণের কাছে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে তাদের ভাবনা নেই। সব ভাবনা যেন প্রধানমন্ত্রীর একার। শেখ হাসিনাই যেন তাদের ক্ষমতায় এনে দেবেন। 

শুধু মোহাম্মদ ইউসুফের চিকিৎসা বলে নয়, বাংলাদেশে সবকিছুতেই এখন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগে। কদিন আগে এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা আমরণ অনশন করছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী নিজে গিয়ে তাদের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু অনশনে থাকা শিক্ষকরা আশ্বস্ত হননি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরই তারা অনশন ভেঙে বাড়ি ফিরে গেছেন। শেখ হাসিনাই শেষ ভরসা, এটা বলে অনেকে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। শুনতেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু এটা মোটেই সুশাসনের লক্ষণ নয়। আর এটা শেখ হাসিনার ওপর এক ধরনের অন্যায় চাপও বটে। শেখ হাসিনা অনেক সক্রিয়, চারপাশে তার তীক্ষ্ণ নজর; সবই ঠিক আছে। কিন্তু তিনিও তো একজন মানুষ। তিনি পারেন, তাই বলে কি আমরা সব চাপ, সব বোঝা তার ঘাড়েই চাপিয়ে দেবো? তাহলে এত মন্ত্রী-উপদেষ্টা-সচিব আছেন কেন? আর শেখ হাসিনা অনেক ব্যস্ত, দিনে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফাইল পড়েন। কিন্তু তার তো করার মতো আরও হাজারটা কাজ আছে। তার চারপাশের মানুষগুলো যদি দক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ কাজ করতে পারতেন, তাহলে শেখ হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারতেন। শেখ হাসিনার ঘাড়ে এখন ১০ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, পদ্মা সেতু, অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনীতি সচল রাখা, আগামী নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার ভাবার মতো, করার মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। তাই আমি সবকিছুতে শেখ হাসিনাকে টেনে আনার, তার হস্তক্ষেপ চাওয়ার এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি। শেখ হাসিনা যেন সত্যি সত্যি শেষ ভরসা হয়ে ওঠেন। যে সমস্যা সমাধানের আর কোনও উপায় নেই, সেখানেই শুধু শেখ হাসিনা হস্তক্ষেপ করবেন।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলে নেই। একজন সাবেক সংসদ সদস্যের এই অসহায় পরিণতি দেখে চমকে গেছে গোটা বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এখন সংসদ সদস্য হওয়া মানেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ পেয়ে যাওয়া যেন। তদ্বির, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যের কমিশন; ঘরে বসেই পেয়ে যান সাংসদরা। অন্যায়গুলো না হয় বাদই দিলাম, একজন সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি কিনতে পারেন, আবেদন করলেই প্লট পেয়ে যান। এই দু’টি বৈধ সুবিধা নিলেই একজন সংসদ সদস্য কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে যেতে পারেন। একবার সংসদ সদস্য হলেই তার সারা জীবন আর কিছু করতে হয় না। কিন্তু মোহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন ব্যতিক্রম। ছাত্র জীবন থেকে মেহনতি মানুষের জন্য রাজনীতি করে এসেছেন। একাত্তরে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন। বিত্ত-বৈভবের কথা ভাবেননি কখনও। ১৯৯১ সালে রাঙ্গুনিয়া থেকে সিপিবির হয়ে ‘নৌকা’ প্রতীকে অংশ নিয়ে ধস নামিয়েছিলেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাম্রাজ্যে, হারিয়ে দিয়েছিলেন তার ভাই গিয়াস কাদের চৌধুরীকে। সাংসদ হওয়ার পরও তিনি শুল্কমুক্ত গাড়ি বা প্লট নেননি। তাই তো আমরা মুখে মুখে একটা কথা বলি, ‘সুযোগের অভাবে সৎ’। কিন্তু এখনও যে আমাদের সমাজে সত্যিকারের সৎ মানুষ আছেন, মোহাম্মদ ইউসুফ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। শুধু একজন সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও মোহাম্মদ ইউসুফের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আর সৎ থাকলে শেষ জীবনে কী পরিণতি হতে পারে, মোহাম্মদ ইউসুফের অবস্থা দেখে তার একটা ভুল বার্তা যেতে পারে তরুণ প্রজন্মের কাছে। আখের গোছানোকেই রাজনীতিবিদরা নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ঠিক করে নেবেন। এখন বাংলাদেশে অনেক রাজনীতিবিদ আছেন, যাদেও দৃশ্যমান কোনও পেশা বা আয়ের উৎস নেই। কিন্তু যাপন করেন বিলাসবহুল জীবন। কিন্তু মোহাম্মদ ইউসুফরাই আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত। যারা রাজনীতি করবে মানুষের জন্য, নিজের জন্য নয়। সততা, নৈতিকতাই আমাদের অনুসরণীয় হওয়া উচিত।
বলছিলাম, সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কথা। অনুরোধ করেছি, কেউ যেন খুচরো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত না করেন। কিন্তু এই আমিও একটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছি। যশোর শহরের দড়াটানা মোড় থেকে বেনাপোল পর্যন্ত সড়কটির দুপাশে দুই হাজারেরও বেশি গাছ আছে। এর মধ্যে অনেক গাছ শতবর্ষীও। রাস্তার দুই পাশে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে এই বৃক্ষরাজি। সীমান্তের ওপারে এই সড়কটি পরিচিত যশোর রোড নামে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও এই সড়কটির রয়েছে ঐতিহাসিক অবস্থান। লাখ লাখ শরণার্থী এই সড়ক ধরে ভারতে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ যুদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। ফিরে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন তার ঐতিহাসিক কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। স্মৃতিবিজড়িত এই রাস্তাটি ৪ লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সময়ের দাবিতে এটাই বাস্তবতা। মানুষ বেড়েছে, গাড়ি বেড়েছে; রাস্তাও তাই বাড়াতে হবে। কিন্তু আমার শঙ্কা হলো চার লেন করার জন্য রাস্তার দুই পাশে থাকা ২ হাজার ৩১২টি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে শতবর্ষী এই গাছগুলো কেটে ফেলা হবে একটি আত্মধ্বংসী উদ্যোগ। আমি এই গাছগুলো না কেটে রাস্তা চওড়া করার দাবি জানাচ্ছি। এটা কি সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব এবং খুব সহজে। এক পাশের গাছগুলোকে মাঝখানে রেখে রাস্তা চওড়া করা যায়। তাহলে দুই পাশের গাছই বেঁচে যাবে। আর রাস্তার মাঝখানে শতবর্ষী গাছগুলো থাকলে সড়কটির যে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা রূপ তাও অক্ষুণ্ন থাকবে।

আমি চাই ছোটখাটো বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিরক্ত করা না হোক। কিন্তু যশোর রোডের গাছ কাটার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই গাছগুলো বাঁচানোর আর কোনও উপায় নেই। আর ২ হাজার ৩১২টি গাছের জীবন কোনও ছোট ব্যাপার নয়। তাই আমি নিজের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেও এই গাছগুলো বাঁচানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছি।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএনএইচ/

x