‘দেখামাত্র গুলি’

ইকরাম কবীর ১৬:১২ , জানুয়ারি ১০ , ২০১৮

ইকরাম কবীরআমরা মাঝে মাঝে এমন সব কথা একে-অপরকে বলে বসি যা অন্যের কষ্টের কারণ হতে পারে, কখনও কখনও অন্যের ক্ষতির কারণও হতে পারে। আমাদের কোনও কথায় যে অন্যের ক্ষতি হতে পারে সেটা অবশ্য কেউ চিন্তা করি না। মনে রাখি না–  কথা একটি ঢিলের মতো, একবার ছুঁড়ে দিলে আর ফেরানো যায় না।
অনাকাঙ্ক্ষিত কোনও বক্তব্য যদি রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত কেউ বলেন তাহলে তা সামাজিক ক্ষতিরও কারণ হয়ে যায়। অনেকদিন ধরেই আমাদের দেশের উচ্চ-পদে কর্মরত নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিরা অদ্ভুত কিছু কথা বলেছেন বা বলে আসছেন যা জনমনে প্রচুর হাসি-ঠাট্টার জন্ম দিয়েছে।
অনেক বছর আগে একটি শিশুর মৃত্যুর পর আমাদের একজন মন্ত্রীকে বলতে শুনেছিলাম, ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছেন’। রানা প্লাজা পড়ে যাওয়ার পর আরেকজন বলেছিলেন, ‘কারা যেন এসে পিলারগুলো ঝাঁকিয়ে দিয়েছে তাই ভবনটি ভেঙে পড়েছে’। আমাদের আরেকজন মন্ত্রী বাজেটের সময় ‘স্পিড-মানি’ নিয়ে বেসামাল কথা বলেছিলেন।

তবে এমন ব্যক্তিদের আমি কোনও দোষ দেখি না। দায়িত্ব নেওয়ার কথা তাদের দফতরের। জনসম্মুখে কী বলবেন সে দায়িত্ব যদি তাদের দফতর না নেয়, তবে এদের অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য বন্ধ হবে বলে আমার মনে হয় না। এদের সবার দফতরগুলোতে পিআর সহকারীরা কাজ করেন। এই পিআর সহকারীরা তাদের বক্তৃতা বা গণ-বক্তব্য কী হবে তা কতখানি নির্ণয় করে দেন তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। উচ্চপদে যারা কাজ করেন তাদের পক্ষে সব সময় সবকিছু মনে রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব এই পিআর সহকারীদেরই। সহকারী তাদের গাইড হিসেবে কাজ করবে। কোনও একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সহকারীরাই এদের পরামর্শ দেবেন যে তারা কী বলবেন, কিভাবে বলবেন। এমনটিই সারা দুনিয়ায় হয়ে আসছে– যাকে ‘করপোরেট কমিউনিকেশন’ বলা হয়।

আমাদের একজন মন্ত্রী একটি বেসামাল কথা সম্প্রতি বলে ফেলেছেন। অন্তত আমাদের মতো সাধারণ জনমানুষের কাছে তা ভালো লাগেনি। তার আরও চিন্তা করে এ কথা বলা উচিত ছিল।   

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আমাদের একজন মন্ত্রী বলেছেন, মাদক এক সর্বনাশের খেলা। এ খেলা বন্ধে জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে সিদ্ধান্তে মাদকের সেবক ও ব্যবসায়ীর সন্ধান পাওয়া মাত্রই কোনও পরিচয় না দেখেই গুলি করার ক্ষমতা থাকবে।

তিনি আরো বলেছেন, ‘মাদকের ছোবল আমাদের অনেক বড় জাতীয় সমস্যা। তাই এটার জন্য জাতীয় সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে দলমত নির্বিশেষে এটাকে দেশের এক নম্বর সমস্যা নির্ধারণ করে তা প্রতিরোধে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেক্ষেত্রে কোনও পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। জড়িতদের দেখা মাত্রই ‘শুট’ করতে হবে। তবেই এটা বন্ধ হবে।’

মন্ত্রী হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে তিনি মাদক নিয়ে অনেকগুলো মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি মাদক সেবনকে জাতীয়ভাবে এক নম্বর সমস্যা নির্ধারণ করার কথা বলেছেন, জাতীয় সংলাপের কথা বলেছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, নির্মূল করতে হবে– সে কথা বলেছেন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু মাদক-সেবীদের দেখামাত্র গুলি করার কথা বলেই তার সব উদ্দেশ্য ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।

মানুষ কেন মাদক-সেবনে আগ্রহী হয় সে কথা কিন্তু তিনি বলেননি। শুধু বাংলাদেশে নয়, সব দেশেই অনেক সাধারণ মানুষের মধ্যে মাদকের প্রতি আগ্রহ আছে। বহু মানুষ তা সেবনও করেন। এটি স্বাভাবিক। মাদক সব সময় মানুষকে আকর্ষণ করেছে। কিন্তু মাদক-সেবনের খারাপ দিকগুলো আমরা সরকারি পর্যায়ে এই সমস্যাটি আমলে এনে জনগণের আচরণ বদলে দেওয়ার জন্য আমরা কী করেছি, কতটুকু করেছি? মানুষের আচরণ বদলানোর জন্য আমরা কিছু করেছি বলে আমার মনে হয় না।

সেই অনুষ্ঠানে আমাদের কারা মহাপরিদর্শকও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘দেশের বর্তমানে ৭০ হাজার কারাবন্দির মধ্যে ২৩ হাজার বন্দিই মাদকাসক্ত। এটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।’

তাহলেই ভাবুন! বন্দিশালার মতো এমন একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত পরিবেশেও মাদক প্রবেশ করেছে এবং বন্দিরা তা সেবনও করছেন। কেউ না কেউ তো সেখানে মাদক বিক্রি করছেন। সেগুলো আটকানো যাচ্ছে না কেন? তাহলে কি ওই ২৩ হাজার বন্দিকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে? অবশ্যই না। প্রথমেই আমরা জেলখানায় যেন মাদক না যায় সে ব্যবস্থা করবো। তারপর মাদকসেবীর সংখ্যা কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে–  তা নিয়ে গবেষণা করবো এবং তারপর উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবো। এতটাই তো হওয়ার কথা! নাকি?

ধরুণ খবর পাওয়া গেলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ ভাগ শিক্ষার্থী ইয়াবা সেবন করছে। কী করতে পারি আমরা? সেখানে গিয়ে তাদের গুলি করে মেরে ফেলবো।  আমার কান যদি চিলে নিয়ে যায়, তাহলে চিলের পেছনে ছোটা ছাড়া আর কি করার আছে? আমার মাথাব্যথা করছে, তাই মাথাটিই কেটে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কী করতে পারি?   

মন্ত্রীরা আমাদের নেতা। আমরা তাদের দিকে চেয়ে থাকি আশা নিয়ে; তাদের কথাই যদি আমাদের নিরাশার রাজ্যে ঠেলে দেয়, তাহলে জাতি কোন দিকে যাচ্ছে তা ভাবার সময় এসেছে। নেতারা আমাদের সাহস দেবেন, আমাদের সুন্দর করে বেঁচে থাকার পথ দেখাবেন, আমাদের মেরে ফেলার বুদ্ধি তাদের কাছ থেকে চাই না। তারা যে কথাটি বলছেন, যেমন জীবন-যাপন করছেন, যেমন পোশাক পরছেন – এ সবই কিন্তু সমাজে অনুকরণীয়। কেউ না কেউ তাদের অনুকরণ করছেন। নেতাদের অবস্থান সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতার জীবন একাকী জীবন। সেই একাকী জীবন-যাপন করতে হলে অনেক সাবধানে চিন্তা-ভাবনা করে চলতে হয়। এবং সে কারণেই তাদের ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে নিতে হয় যেন তাদের একাকী পথচলা মসৃণ হয়, সহজ হয়।

আমাদের নেতারা কি তাই করছেন? সেভাবে ভাবছেন? আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কি তেমন করে ভাবছে। আমাদের সমাজে হাজারো বিষয় আছে যেখানে পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা শুধু আদেশ দিয়ে দেশবাসীর মধ্যে সেই পরিবর্তন আনতে পারবো কি? জনগণের আচরণগত পরিবর্তনের জন্য আসলেই করপোরেট কমিউনিকেশনের কৌশলের ভিত্তিতে সমাজে সঠিক বার্তাগুলো ছড়িয়ে দিতে হবে।

আমার সহকর্মী নিয়াজ সিদ্দিকী আমায় প্রশ্ন করছিল, ‘আমাদের সরকারের মন্ত্রীরা শুরু থেকেই কে কোন বিষয়ে সরকারের বা তাদের দলের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য কী বলবেন, সরকারের কাছে তেমন কোনও পরিকল্পনা আছে কি?’ আমি চিন্তা করে দেখলাম, ‘নেই’। সাধারণ কিছু কৌশলে এই মন্ত্রীরাই পারেন সরকারের অনেক পরিকল্পনা তাদের মুখের কথা– তথা করপোরেট কমিউনিকেশন দিয়েই বাস্তবায়ন করতে পারেন। একটি সরকারের বা দলের ভাবমূর্তি উন্নয়ন করে দিতে পারেন এই নেতারাই– শুধু যদি একটু পরিকল্পনা করে সারা বছরের বার্তাগুলো তৈরি করে রাখা যায় এবং সময় অনুযায়ী সেগুলো সমাজে ছড়িয়ে দেয়া যায়। তা যদি না করা যায়, শুধু অপরিকল্পিত কিছু বলবেন না – সেটুকুই যদি মেনে চলেন তাহলেও অনেক উপকার হবে।

মানুষের মন সব-সময়ই কিছু না কিছু বলতে চাইবে, প্রকাশ করতে চাইবে। তাই বলে নেতৃত্বে থাকা মানুষগুলো কি যা মনে আসবে তাই বলবেন? মনে রাখতে হবে তাদের মুখের কথার ওপর নির্ভর করছে সমাজ কোন দিকে মোড় নেবে, জন-মানুষ কিভাবে চিন্তা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ থাকবে তার মন্ত্রিসভার সব সদস্যদের জন্য সারা বছরের পরিকল্পনা তৈরি উদ্বুদ্ধ করতে। এই নেতারা যদি তার বার্তা ‘হোল্ডিং স্টেইটমেন্ট’ আকারে তৈরি করে রাখেন তাহলে তার সরকারের কাজ সহজ হয়ে যাবে। সঠিক বার্তাটি সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে পৌঁছে যাবে। এটি করতে পারলে সরকার কৌশলগতভাবে সার্থক হবে।

আমাদের সমাজকে, আপামর জনসাধারণকে তাদের কথার মাধ্যমে অনুপ্রেরণা দিতে পারেন– এমন ক’জন নেতা আমাদের সরকারি দলে আছেন? সবাই গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যই দিয়ে যাচ্ছেন যা শুনে মানুষকে চিন্তা করাতে পারছেন না। বরং অপরিকল্পিতভাবে এমন সব কথা বলছেন যা সমাজে সরকার এবং দল নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই পরিস্থিতি থেকে সরে আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

আমাদের এই নেতার যদি প্রস্তুতি থাকতো তাহলে ‘দেখামাত্র গুলি’ করার কথা তিনি বলতেন না। আমাদের সবারই আসলে বলার প্রস্তুতি প্রয়োজন।

লেখক: গল্পকার

 

/এসএএস/

x