‘ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির পথ হইতে ভ্রষ্ট হইয়ো না’

এরশাদুল আলম প্রিন্স ১৯:৪৭ , জানুয়ারি ১০ , ২০১৮

এরশাদুল আলম প্রিন্স১৯৯০ সালের পরে প্রায় তিন দশক সোনিয়া গান্ধী ছিলেন কংগ্রেসের কর্ণধার। কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে সোনিয়া গান্ধীর সাফল্য যেমন আছে, তেমনি আছে সমালোচনাও। সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত হয়।
পৃথিবীর বড়-বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর ইতিহাস তার রাজনৈতিক দলের ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একইভাবে বলা যায়, রাজনৈতিক দলের ইতিহাস রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ইতিহাস থেকেও বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। ভারত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। ১৩০ বছরের পুরনো দল হিসেবে কংগ্রেস ভারতীয় গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য নাম। ১৮৮৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই দীর্ঘযাত্রায় কংগ্রেস ‘বহুত্ববাদী’ ভারত থেকে কখনও বিচ্যুত হয়নি। এবং বহুত্ববাদী ধারণাটিই ভারতের আদি শক্তি।
বর্তমানে কংগ্রেস সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক খরা পার করছে। লোকসভা ও রাজ্যগুলোর নির্বাচনে পরাজয় থলিতে জুটলেও দলটির কর্মী-সমর্থক-নেতারা এর নেতৃত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি।

সোনিয়ার সভাপতি হওয়া নিয়ে প্রথমে অনেকে বিতর্কের ঝড় তুললেও তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর কেউ তার নেতৃত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন তোলেননি। এটি সভাপতি হিসেবে সোনিয়ার সফলতার সবচেয়ে বড় পরিচায়ক। এ বিষয়টিকে শুধু একটি দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ বলে বিবেচনা করলে ভুল হবে। কারণ নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা নিয়ে রাজনীতির মাঠে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কংগ্রেসের জনসমর্থনের এ ভাটির টানকে শুধু দলটির ব্যর্থতা হিসেবে দেখা সঠিক হবে না। আবার একে বিজেপি মহাজোটের সফলতা হিসেবে দেখাও ভুল। বরং বিশ্বব্যাপী যে প্রতিক্রিয়াশীল জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছে ভারতও তার বাইরে নয়। আমেরিকা থেকে ভারত সেই একই জাতীয়তাবাদী চেতনা দৃশ্যমান।

তবে প্রগতিশীল ও উদারপন্থী জাতীয়তাবাদের এক ধরনের ব্যর্থতা বা আত্মতুষ্টি থেকে এ  চেতনাটি মূলত সাময়িক একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। ভারতে আরএসএস, হিন্দু-পরিষদ অথবা বাংলাদেশে জামায়াত-হেফাজত জোটের উত্থানের এটাই আসল সমীকরণ। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, কোনও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াই দীর্ঘকাল বিরাজ করে না, যদি না তা ওই জাতির জাতীয়তা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও মননজাত হয়।

বলাই বাহুল্য, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির রয়েছে অভিন্ন চরিত্র। ভারতও এর বাইরে নয়। মতিলাল, নেহেরুর পর ইন্দিরা কংগ্রসের হাল ধরেন। একই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বহন করলেও ইন্দিরা গান্ধী রাজনীতিতে নতুন কিছু মাত্রা যোগ করেছেন, যা স্বাধীন ভারতবর্ষে নতুন। তার আমলে বিরোধীদের ওপর নির্যাতন হয়েছে, জরুরি অবস্থা জারি হয়েছে, সংবাদপত্র ও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। ইন্দিরা কংগ্রেসের অন্যতম সফল সভাপতি হলেও কংগ্রেস তথা ভারত আজও ইন্দিরার এসব কর্মকাণ্ডের যৌক্তিক কোনও কারণ খুঁজে পায়নি। যদিও এজন্য কংগ্রেসকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ইন্দিরা গান্ধীর লোকসভা সদস্যপদ খারিজ করা হয়েছে, ছেলে সঞ্জয়কে মায়ের দায় শোধ করতে জেলের চৌকাঠ পর্যন্ত মাড়াতে হয়েছে। পরে রাজীব গান্ধী সে ক্ষত অনেকটাই পূরণ করেছেন।

নেহেরু পরিবারের ভারত-প্রেম বা কংগ্রেস-প্রেম নিয়ে কোনোদিনই প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু তারপরও সোনিয়াকে কংগ্রেস সভাপতির পদ গ্রহণে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। যদিও তিনি নিজেও ওই পদ গ্রহণে সম্মত ছিলেন না। দীর্ঘ দুই দশক গদির কাছাকাছি থেকেও গদির গরম তিনি অনুভব করেননি, করতেও চাননি। ক্ষমতা-নিষ্পৃহ এ নারী কংগ্রেসেরই থেকে গেছেন। দুই দশক পর সাদামাটা পর্দা নামলো কংগ্রেসের সোনিয়া অধ্যায়ের। 

হালের প্রশ্ন, কংগ্রেসে রাহুল যু্ক্ত হলো, কিন্তু কংগ্রেস কি রাহুমুক্ত হলো? এ প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে। তবে টানেলের শেষে আলোর দেখা মিললো এ কথা বলা যেতেই পারে।

রাহুল গান্ধী সভাপতি হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনে কংগ্রেস গুজরাটে পরাজিত হয়েছে সত্যি, তবে দলটির দাবি, গুজরাটে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের দাবি, বিজেপিই গুজরাটে বড় একটি ধাক্কা খেলো। কংগ্রেসের এ দাবি পুরোপুরির উড়িয়ে দিতে পারেনি বিজেপি। কারণ নরেন্দ্র মোদির মুখে হাসি থাকলেও আড়ালের অশ্রু তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। মোদিরাজ্যে এ রকম ফল তার ‘গুজরাট ডকট্রিন’র ওপর বড় আঘাতই বটে। কিন্তু গুজরাট কিভাবে গান্ধীর আশ্রম থেকে মোদির ঘাটি হলো ভারতবাসীকে সেটি ভেবে দেখতে হবে। এর ওপরই নির্ভর করছে আগামীর ভারত কোন দিকে যাবে।

তবে জয়-পরাজয় যারই হোক, রাহুল গান্ধী-পরিবারের রাজনীতি চর্চার মান ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবেন বলেই বিশ্লেষকদের মত। কারণ ধারাবাহিক পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়েও তিনি প্রচার মাঠে ছিলেন সহনশীল, শ্রদ্ধাবনত ও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন একজন গান্ধী। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী মোদিও ব্যক্তি আক্রমণ করে বক্তব্য দিলে রাহুল তা করেননি। ব্যক্তি আক্রমণ-ভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপরীতে রাহুল যে রাজনৈতিক ‘রেটরিক’ ব্যবহার করেছেন তাকে রাজনীতির নতুন ‘রাহুল স্টাইল’ বলা যেতেই পারে।

রাহুলের হিন্দুত্ব নিয়েও প্রশ্ন করেছে তার বিরোধীরা। জবাবে, তিনি যে শুধু হিন্দুই নন বরং পৈতাধারী ব্রাহ্মণ তাও প্রমাণ করেছেন। এতে দু’টি বিষয় পরিষ্কার-এক, রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি, দুই, পৈতাধারীও অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী গণতন্ত্র চর্চা করতে পারেন। এটি আমেরিকায় যেমন সত্য, বাংলাদেশেও সত্য। 

অতি সম্প্রতি এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক ও উগ্রজাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির যে উত্থান হচ্ছে তা আঞ্চলিক শান্তির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ। এর বিপরীতে উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চা জরুরি। রাষ্ট্রীয় সীমানায় এ উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসার হলে তা গণতন্ত্রের পথকে সুগম করবে।পাশাপাশি তা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় ও বৃদ্ধিতেও অবদান রাখবে। নিশ্চিতভাবে ভারতে ওই উদারপন্থী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি হালটি আজও কংগ্রেসের হাতেই। আর গান্ধী পরিবার সেই ঐতিহ্যেরই ধারক।

বিজেপি মহাবিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসায় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী অনেকটা আত্মতুষ্টিতে ভুগলেও আদতে ভারতবর্ষ তার অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র পরিচয় থেকে বের হতে পারবে না। এটি মহাভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। একথা সত্যি, বিজেপির আমলেই গঙ্গা চুক্তি হয়েছে, কিন্তু একথাও সত্যি আজ অবধি যৌথ নদী কমিশন কোনও কার্যকর বৈঠকও করতে পারেনি, তিস্তা চুক্তিতো পরের কথা। প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কন্নোয়নে বিজেপির তেমন কোনও কার্যকর পদক্ষেপ দৃষ্টিগোচর হয়নি।

কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক। সে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে আওয়ামী লীগ ও গান্ধী পরিবারের ঐতিহাসিক সম্পর্কটি দুই দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব রাখে। কারণ উভয়েই অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। বিএনপি হালে জামায়াত-হেফাজতের মন্ত্রে দীক্ষা নিলেও তারাও আদতে উদারপন্থী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতেই বিশ্বাসী।  

ক্ষমতার বাইরে থেকেও উদারপন্থী রাজনীতি ও গণতন্ত্রের চর্চা করা যায়। সোনিয়া গান্ধী তথা গান্ধী পরিবার তার নজির। রাহুলও ইতিমধ্যেই তার প্রমাণ রেখেছেন। ফলে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক বলয়ে তার অবশ্যই একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর ইতিবাচক রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতায়নের ফলে আঞ্চলিক রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে এতে আর সন্দেহ কী?  

বহুত্ববাদ’ই গণতন্ত্রের মূল কথা, রাষ্ট্রের মূল শক্তি ও সৌন্দর্য। সেটি জর্জ ওয়াশিংটনের দেশে যেমন সত্য, বঙ্গবন্ধুর দেশেও সত্য, গান্ধীর দেশেও তাই। গান্ধীর আশ্রমে মুসলমানদের ভীড় লেগে থাকতো। কারণ, শান্তিই মূল কথা, গণতন্ত্রই মূল সুর। এ কথা ও সুরে যা রচিত হয় তাই ‘রাষ্ট্র’। গান্ধীর দেশে রাহুল সেই সুরে গান গাইতে পারবেন কিনা সেটি সময়ের প্রশ্ন, কিন্তু ব্রাহ্মন থেকে শুরু করে শূদ্র ও দলিত তথা ভারতবাসীর মহাত্মাজির ওই কথাটি স্মরণ রাখাই উচিত, ‘ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির পথ হইতে ভ্রষ্ট হইয়ো না’। ।

লেখক: আইনজীবী ও কলামিস্ট

 

 

/এসএএস/

x