‘ডে আফটার টুমরো’

আমীন আল রশীদ ১৩:৩১ , জানুয়ারি ১৩ , ২০১৮

আমীন আল রশীদসম্প্রতি যখন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, তখন ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া হলিউডের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডে আফটার টুমরো’ সিনেমাটির কথা আমাদের মনে পড়ে।
বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত কারণে জলবায়ুর রুঢ় আচরণ অর্থাৎ যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন, এই শব্দটি এখনও একটি বড় বিতর্কের জায়গা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যেসব ঝুঁকির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো কতটা কাল্পনিক, কতটা আসন্ন আর কতটা বাণিজ্যিক স্বার্থে প্রচার করা হচ্ছে এবং এখানে বিভিন্ন এনজিওর ‘ধান্দা’ কতটুকু আছে, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। একটি পক্ষ এখনও জলবায়ু পরিবর্তন বলে কিছু স্বীকার করেন না। আবার একটি পক্ষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত যে ভয়াবহ দুর্যোগের ভয় আমাদের দেখান, তা অবিশ্বাস্য মনে হলেও যখন বাংলাদেশের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশের তাপমাত্রাও ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায় এবং যখন একটার পরে একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন বিজ্ঞানীদের ওই ভীতি ও সতর্কতাকে অস্বীকার করাও কঠিন।

এটিই ‘ডে আফটার টুমরো’ সিনেমার উপজীব্য। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা আজ যে দুর্যোগ নিয়ে আমাদের সতর্ক করছেন সেই ভয়াল দৃশ্য দেখতে আমাদের খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না, বরং সেই দিনটি অতি সন্নিকটে। ডে আফটার টুমরো, অর্থাৎ প্রকৃতিতে পরিবর্তনগুলো এত দ্রুতই ঘটছে যে, বিপদ আমাদের নাকের ডগায়।

২০০৭ সালে জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান আমাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কথা বলা শুরু করি, তখন লোকজন আমাদের পাগল বলত। কিন্তু এখন এটিই বাস্তবতা। শিল্পায়ন, নগরায়ন আর মানুষের ভোগবিলাসের মাত্রা অসম্ভব-রকম বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি গ্রিন হাউজ গ্যাসের অধিকতর নির্গমন, অতিরিক্ত তাপে মেরু অঞ্চলের বরফ অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে দ্রুত গতিতে গলতে থাকা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি।

বলা হচ্ছে সমুদ্র তীরবর্তী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং আর্থিকভাবে ‍দুর্বল অর্থনীতির দেশের একটি বড় এলাকা একসময় পানির নিচে তলিয়ে যাবে বলে যে আশঙ্কার কথা বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। নদীভাঙনসহ নানা কারণেই এরইমধ্যে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যাদেরকে বলা হচ্ছে ক্লাইমেট রিফিউজি বা জলবায়ু উদ্বাস্তু/শরণার্থী। ফলে ডে আফটার টুমরোর বাস্তব চিত্রায়ন আমরা হয়তো এখনই দেখছি। বিশেষ করে যখন তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায় তখন আমাদের মনে এই শঙ্কাও উঁকি দেয় যে, আগামী ৫/১০ বছর পরে কি তাহলে আমরা মাইনাস টেম্পারেচারের যুগে প্রবেশ করবো? আমাদের দেশেও কি তুষারপাত শুরু হবে এবং ইউরোপ-আমেরিকার মতো বরফের পাহাড়ে ঢেকে যাবে আমাদের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, কল-কারখানা?
বাংলাদেশে যখন তীব্র শীত আর উত্তরের অনেক জায়গার তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির নিচে, তখন ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ বিপর্যস্ত তুষার ঝড়ে। শত বছরের মধ্যে শীতলতম আবহাওয়ার কবলে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি রাজ্য। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ২৩ ডিগ্রিতে। ভারতের উত্তরপ্রদেশেও প্রাণ গেছে অন্তত ৭০ জনের। অথচ একই সময়ে এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ায়। সেখানে ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাবদাহে অতীষ্ঠ জনজীবন।

যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জন্য নতুন বছরটি শুরুই হয়েছে তীব্র শীতের কাঁপুনিতে। গত বছরের শেষদিকে, ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চল তীব্র শীতকালীন ঝড়ে কাহিল হয়ে যায়। তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে যাওয়ায় আংশিক জমে যায় দু দেশের সীমান্তের জলপ্রপাত নায়াগ্রা ফলস। একই অবস্থা হয় নিউ জার্সির পিটারসন গ্রেট ফলসেও। ডে আফটার টুমরো সিনেমার শুরুটাও এরকম যে, যেন পৃথিবীর একটি বড় অংশই ঢেকে আছে বরফে।  

আর্কটিক বায়ুপ্রবাহের কারণে বার্লিংটন, ভারমন্ট, পোর্টল্যান্ড, মেইন রাজ্যে তাপমাত্রা নামতে নামতে শত বছরের রেকর্ড ভেঙে ফেলে। বার্লিংটনে তাপমাত্রা নেমে যায় ২৮ ডিগ্রির নিচে। সেখানের মানুষের কিভাবে বেঁচে আছেন, তা ওই এলাকায় যারা বসবাস করেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন। বাংলাদেশে কখনও এরকম পরিস্থিতি হলে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষেরা কী করে এই দুযোগে টিকে থাকবে, তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।

কোথাও কোথাও ১৪/১৫ ইঞ্চি তুষারের স্তূপ জমে যায়। সেইসঙ্গে দমকা বাতাস যেন এক মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে এই দুর্ভোগ ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও। স্পেনে তীব্র তুষারপাতের কবলে পড়ে যাতে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে না যায়, সেজন্য মোতায়েন করা হয় আড়াইশো সেনা সদস্য। শীতকালীন ঝড়ের কবলে পড়ে বাংলাদেশের অদূরে চীনের শিয়াংশি প্রদেশও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন এভাবে ঠাণ্ডায় থরথর, তখন অস্ট্রেলিয়ায় তাপমাত্রা ৫০ ছুঁইছুঁই। 

বিশ্বব্যাপী আবহায়ার এমন খামখেয়ালি কি তবে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীরা যেসব আভাষ ও ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন তারই প্রতিফলন? ডে আফটার টুমরো কি তাহলে আসন্ন? এমন প্রশ্নে অ্যাকাডেমিশিয়ানদের মধ্যেই মতবিরোধের অন্ত নেই। একপক্ষ মনেই করেন, জলবায়ু পরিবর্তন হাজার বছর ধরেই হচ্ছে; এটা নতুন কিছু নয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর আবহাওয়া এমন ‘এক্সট্রিম’ আচরণ করতেই পারে। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে একসময় হয়তো মেরু অঞ্চলের অধিকাংশ বরফরই গলে যাবে। আবার পৃথিবীর অন্য প্রান্তে তৈরি হবে তুষারের পাহাড়। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই তাই জলবায়ু পরিবর্তনের তত্ত্বের সঙ্গে একমত নন।

তবে আবহাওয়া এবং জলবায়ুর এই বিরূপ আচরণের কারণ যাই হোক, এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে যত তর্কই থাকুক না কেন, এ কথা অস্বীকার করার ‍উপায় নেই যে, বিশ্বের সামগ্রিক তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে এবং তার জন্য প্রধানত দায়ী মানুষের অতিমাত্রায় ভোগবাদিতা। শিল্পায়ন আর নগরায়ণের নামে আমরা এই ধরিত্রীমাতাকে যেভাবে উষ্ণ করে তুলছি, যেভবে জীবাষ্ম জ্বালানি পুড়ছি, যেভাবে কল-কারখানার ধোঁয়া নির্গত করছি, তাতে জলবায়ু পরিবর্তন যে ত্বরান্বিত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিতর্ক কম। 

সুতরাং বিপদ যে আসন্ন এবং যে বিপদের মোকাবিলা করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া কিংবা আমাদের পঞ্চগড় ও নীলফামারীর মানুষ––সেখান থেকে মুক্তির কি কোনও পথ আছে? বলা হয়, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। কিন্তু মানুষ সেই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটায়। মানুষ অবলীলায় নদীকে হত্যা করে, মানুষ কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ায়। ফলে সেই ‘পাপের’ মাশুল মানুষকে দিতেই হয়।

২০০৮ সালে উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে একটি প্রতিবেদন করার জন্য আমি গিয়েছিলাম বরগুনায়। বিষখালী নদীর তীরে এক ষাটোর্ধ জেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আকাশের চেহারা দেখলে কি আপনি বলতে পারেন আগামীকাল কী হবে? তিনি বলেছিলেন, একসময় পারতাম। এখন আর আগের মতো বলতে পারি না। এখন অনেক কিছুই ঘটে যার কোনও ব্যাখ্যা পাই না। এর কারণ কী হতে পারে––এমন প্রশ্নের জবাবে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শব্দটির সঙ্গে অপরিচিত ওই জেলে আমাকে বলেছিলেন, এটা মানুষের ‘পাপ’।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/

x