যশোর রোড, হায় ‘১৮!

শেগুফতা শারমিন ১২:৩৪ , জানুয়ারি ১৪ , ২০১৮

শেগুফতা শারমিনসন্দেহ নেই, বাঙালি আবেগপ্রবণ জাতি। আবেগের কাছে যুক্তি অনেক সময়ই টেকে না। এতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সব কিছু ‘থোড়াই কেয়ার’ করে আমরা আবেগে ভেসে যাই। আবেগে আবার থাকে তারতম্য। আমার মতো অথবা তোমার মতো। সব কিছুই চাই আমার মতো হোক। এজন্য এদেশের ইতিহাসে ফ্যাক্ট গুরুত্ব হারায়। তার জায়গায় স্থান পায় আবেগ। ঘুরে ফিরে ইতিহাস পাল্টে যায় পারিবারিক অগ্রাধিকারের কাছে। সদা ইতিহাস পাল্টানোর এই দেশে কিছু কিছু স্থান, নিদর্শন রয়ে যায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে কেউ হারিয়ে যায়। যেমন হারাতে বসেছে যশোর রোড।
যশোর রোড শব্দটা শুধু একটা রাস্তাকে নির্দেশ করে না। যশোর রোড শব্দটার সমার্থক হয়ে আসে ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধ। আর চোখে ভাসে একটা সড়ক, শুধু সড়ক নয়। কয়েক শতবর্ষী মহীরুহ। যারা আমাদের ইতিহাসের সাক্ষী। প্রথম যেবার এই পথে পাড়ি দেই। স্বভাবতই মুক্তিযুদ্ধের অনেক বছর পর। অথচ এ রাস্তায় ওঠা মাত্র মাথায় এসে ভর করে ৭১ এর স্মৃতি, এলেন গীন্সবার্গ,  মৌসুমী ভৌমিক। কানে ভেসে আসে ‘সময় চলেছে রাজপথ ধরে যশোর রোডেতে মানুষ মিছিল, সেপ্টেম্বর হায় একাত্তর, গরুর গাড়ি কাদা রাস্তা পিছিল।’ 

সেই স্মৃতিতে ভর দিয়ে আমি পেরিয়ে যাই বর্ডার, দেশের সীমারেখা। দেশের মাটি ছেড়ে যায়, কিন্তু মাথায় থেকে যায় ভালোবাসা। ফিরে আসার পথেও একই রকম। বনগাঁ থেকে যখনই গাছে ছাওয়া পথে গাড়ি গড়ায়, মনে হয় দেশ আর দূরে নয়। মনে করিয়ে দেয় অসংখ্য রেইনট্রি গাছ। নির্ভাবনায় রাস্তা পাহারা দেয়। যাদের কেটে ফেলার আশঙ্কা নেই। কারণ, ওরা গাছ কাটে না। ওদের সংস্কৃতি গাছ রক্ষার সংস্কৃতি।

গাছ কাটা এদেশের প্রায় জাতীয় নেশাতে পরিণত। যেখানেই গাছ, সেখানেই কাটাও অভিযান। সে সরকারে যেই থাকুক, গাছ এদেশে সব সময় সব সরকারের শত্রুপক্ষ। ভাওয়াল মধুপুরের বন উজাড় হয়ে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বনানী নিরাপত্তার নামে হয়ে যায় ক্লিন সেভড। আইলা আর সিডর থেকে উপকূল আর উপকূলের  মানুষ বাঁচাতে বুক পেতে দেওয়া সুন্দরবন ধুঁকে ধুঁকে মরে পণ্য পরিবহনের রুট হয়ে। দিনের পর দিন আশঙ্কায় থাকে রামপালের উন্নয়ন যজ্ঞে নিঃশেষ হওয়ার আয়োজনে। কংক্রিটের জঙ্গল ঢাকাতে কষ্টে সৃষ্টে উঁকিঝুঁকি দিয়ে মাথা তোলা গাছেরাও প্রতিনিয়ত চাপা পড়ে করাতের দাঁতে। গাছ কাটা এখানে উৎসব, গাছ কাটা এখানে আনন্দের!

বেশ অনেক বছর আগে। স্কুলের নিচের ক্লাসে পড়ি তখন। পত্রিকায় শিরোনাম হয়েছিল, ওসমানী উদ্যানে গাছ কাটা বন্ধে বিশিষ্ট নাগরিকদের অবস্থান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যাররা ছিলেন সে সময় সে আন্দোলনের নেতৃত্বে। তাতে কী? সেসময় গাছ কাটা পড়েছিল। কোনও যুক্তি ছাড়াই। এখনও ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত গাছ কাটা পড়ে। কেউ আর কিছু বলতেও আসে না। হয়তো বলতে বলতে সয়ে গেছে । জিতে গেছে নেশা। টিকে গেছে ‘বৃক্ষ-কর্তন’ উৎসবের সংস্কৃতি।

এবার সেই উৎসব এবং উন্নয়নের বলি যশোর রোডের বৃক্ষরাজি। শুরুতে যেটা বলছিলাম। এদেশে ইতিহাস পাল্টে দেওয়া হয় নিজের সুবিধা অনুযায়ী। ইতিহাসের স্মৃতি ধরে রাখা হয় তাও নিজস্ব পারিবারিক গুরুত্ব অনুযায়ী। ইউরোপের নানা শহরে এখনও যত্রতত্র  চোখে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারক। এই বাড়িতে এ্যানা ফ্রাঙ্ক থাকতেন। এই হাসপাতালে আহত সৈনিকেরা চিকিৎসা নিয়েছিলেন। এরকম কত শত স্মৃতিস্মারক নিয়ে টিকে আছে সেই সব বাড়ি, ভবন। টিকে থাকবে অনেক অনেক কাল, নিশ্চিত।

যেমন টিকে ছিল যশোর রোড আর তার শতবর্ষী বৃক্ষরাজী।  যে বৃক্ষরা একটা সাদামাটা পিচঢালা রাস্তাকে একেবারে অদ্বিতীয় একটা চেহারা দেয়। যে বৃক্ষরা মনে পড়িয়ে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। যে বৃক্ষদের শাখায় শাখায় জড়িয়ে আছে ইতিহাস। আমি এক ছাপোষা মানুষ। চেতনার দোকান নেই আমার। নেই তাই দোকানদারীর ধান্দাও। তারপরও মুক্তিযুদ্ধকে নিজস্ব গৌরব হিসেবে জানি বলেই, যশোর রোডের বৃক্ষ নিধনের ঘোষণা শুনে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয়, শুধু বৃক্ষ নয়, কাটা পড়তে চলেছে আমার ইতিহাস, আমার শেকড়। এরই সঙ্গে দেখি কারো কারো চেতনার দোকানে উন্নয়নের ভিউকার্ড! গাছের চেয়ে রাস্তা উত্তম! চারলেনের রাস্তা লাগবে। প্রতিবেশিদের পণ্য আসবে সহজে, প্রতিবেশির এক ঘরের পণ্যবাহী ট্রাক আসবে দ্রুতগতিতে। এদেশের বুকের ওপর দিয়ে পৌঁছে যাবে প্রতিবেশির আরেক ঘরে। চেতনার কাছে পরাজিত হয়ে যায় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস!

মহীরুহ কেটে চারাগাছ লাগানো উন্নয়নের গল্প শুনতে শুনতে ঘুম এসে যায়। সেই ঘুম ঘোরে স্বপ্ন দেখি না, দেখি দুঃস্বপ্ন। তিনপাশের প্রতিবেশি সেবা করতে করতে নিঃশেষিত মানুষ পালিয়ে যাচ্ছে, নির্বিচারে। ছুটছে এখান থেকে ওখানে। সারা বাংলাদেশজুড়ে নেমে এসেছে ‘৭১ এর যশোর রোড। ঢল নামা ক্লান্ত মানুষদের মিছিলে কোথাও কোনও ছায়া নেই।

উন্নয়ন ভালো, উন্নয়ন জরুরি। কিন্তু ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। একহাতে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থের পুরস্কার। অন্যহাতে গাছকাটার করাত। বড্ড বেমানান।

জানি বাঁচাতে হবে গাছ। কিন্তু কাকে বলি? কে বাঁচাবে? এদেশের মানুষের ‘আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বলো কাকে।’

লেখক: উন্নয়নকর্মী

 

/এসএএস/

x