চুক্তি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে?

শেখ শাহরিয়ার জামান ১৬:৫৭ , জানুয়ারি ১৪ , ২০১৮

শেখ শাহরিয়ার জামান১৯৭৮ থেকে রোহিঙ্গারা অত্যাচারের শিকার হয়ে দফায় দফায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য তিন বার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। প্রথমবার ১৯৭৮, এরপর ১৯৯২; সব শেষে ২০১৭ সালে। কিন্তু এই তিন দফা চুক্তি করেও রোহিঙ্গা সমস্যার একটি টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কী আছে এই  চুক্তিগুলোয়, যা বার বার সম্পাদন করেও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না?
১৯৭৮ সালের চুক্তি
১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ-মিয়ানমার—উভয় দেশেই ছিল সামরিক সরকার। ওই বছর ঢাকায় ৭ থেকে ৯ জুলাই দুই পক্ষ আলোচনা করে ‘১৯৭৮ প্রত্যাবাসন চুক্তি’ চূড়ান্ত করে। বাংলাদেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব তবারক হোসেন, মিয়ানমারের পক্ষে উ টিন অহ্ন।
‘গোপনীয়’ এই তিন পাতার চুক্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি মাত্র তিন প্যারার মধ্যে উল্লেখ ছিল। এছাড়া নাফ নদী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নির্ধারণের বিষয়গুলোও এ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ‘আইনগত মিয়ানমারের অধিবাসী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ওই বছরের ৩১ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও প্রত্যাবাসনের ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি’ সই হয় ৭ অক্টোবর। এরপর এটি শুরু হওয়ার একবছরের মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যায়।

১৯৯২ সালে যৌথ বিবৃতি

১৯৯২ সালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার ও মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মধ্যে ঢাকায় ২৩ থেকে ২৮ এপ্রিল আলোচনার পর দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি যৌথবিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

এই বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস ও প্রতিবেশী আচরণের মধ্যে ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে। এখানে বলা হয়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের কোনও অভিপ্রায় বাংলাদেশের নেই।’ 

এই বিবৃতিতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা সমস্যাটিকে রাজনৈতিকভাবে দেখা হয়। একইসঙ্গে বলা হয়, দুই দেশ সমঝোতা, বিশ্বাস ও সদিচ্ছার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সমস্যাগুলোর সমাধান করবে।

এই বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের ‘মিয়ানমারের অধিবাসী’ অভিহিত করা হয়, অর্থাৎ ১৯৭৮ সালের চুক্তিতে উল্লিখিত ‘আইনগত’ শব্দটি এখানে বাদ দেওয়া হয়।

৭ মে দুই দেশ আলোচনা করে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চূড়ান্ত’ করে। এরপর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা রাখাইনে ফেরত যায়।

২০১৭ সালের প্রত্যাবাসন অ্যারেঞ্জমেন্ট

২০১৬ সালে অং সান সু চি’র দল ‘গণতান্ত্রিক’ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাখাইনে সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর বিছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার হামলার অজুহাতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। এরপর ২৫ আগস্ট আরসার অন্য একটি হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের সদলবলে রাখাইন থেকে বিতাড়ন করা হয়।

দুই দেশের গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে আলোচনার পরে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে ‘বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার অধিবাসীদের’ প্রত্যাবাসন অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

দুই দেশের রাজনৈতিক সরকার এই প্রথমবারের মতো একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে এই চুক্তির মাধ্যমে। বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিষয়টি এই চুক্তিতে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়, যা আগের দু’টি চুক্তিতে অনুপস্থিত ছিল।

এখানে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও জীবিকাকে আরও বেশি সহায়তা দেওয়া হবে। জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য তাদের যাচাই-বাছাই শুরু হবে।

কিন্তু এত চুক্তি করেও কেন রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান করা যাচ্ছে না? এর প্রধান কারণ মিয়ানমার সরকারের অনিচ্ছা ও তাদের অধিকারবঞ্চিত করে রাখার অভিপ্রায়।

দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে শুরু মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে। এছাড়া অনেকেরই সন্দেহ, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী আরসার মতো সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করে এবং রোহিঙ্গাদের স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার করে।

তাই যত চুক্তিই করা হোক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের কারণে মিয়ানমার যদি তার রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান পরিবর্তন না করে, তাহলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা হয়তো ফেরত যাবে। তবে সেটি হবে বাংলাদেশে আবারও পালিয়ে আসার জন্য।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/এমএনএইচ/

x