‘গোল্ডেন এ প্লাস’ প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী!

আহসান কবির ১৩:২৪ , ফেব্রুয়ারি ১১ , ২০১৮

আহসান কবিরমানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত (কার্যকর) সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর চেয়ে খালেদা জিয়া ভাগ্যবান। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়ের কিছু অংশ নাকি আগেভাগেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল! ভাগ্যিস খালেদা জিয়ারটা হয়নি। টান টান উত্তেজনা আর সারা দেশের মানুষের কৌতূহল মেটাতে ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পর্যন্তই সবাইকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে এবং তিনি পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র বাসিন্দা (এক ভুবনের এক বাসিন্দা!) এটা এখন পুরনো খবর। তবে ফেব্রুয়ারির (২০১৮) প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন কিংবা দৈনিক পত্রিকায় খবর হয়ে আসছে। যেদিনই কোনও না কোনও পরীক্ষা থাকছে সেদিন সকালে বা তার আগের দিন প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর মনে হয় পুরনো হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তাই একটি কৌতুক ছড়িয়ে পড়েছে। কৌতুকটা এমন–একজন প্রশ্ন ফাঁসকারী ধরা পড়েছে। অনেকের মতো শিক্ষামন্ত্রীও তাকে দেখতে এসেছেন। তাদের কথোপকথন-

মন্ত্রী: তোমার লজ্জা করে না তুমি প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছ?
প্রশ্ন ফাঁসকারী: আমি না হয় ছোট মানুষ। একদিন ভুল করেছি। এখন তো ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে ভার্সিটির প্রশ্নপত্র পর্যন্ত ফাঁস হয়। কই কারও লজ্জা আছে বলে তো মনে হয় না!

গত দশ বছর ধরে এ দেশবাসীর অনেকেরই ধারণা ছিল যে এই দেশের সবচেয়ে সহজ কাজ দুটি। একটি গুম করা বা হওয়া আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস! শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অনেকের এই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। বলেছেন–তিনি ১৯৬১ সালে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করেছিলেন। তখনও নাকি প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো! (ভাবখানা এমন-আহ্ কী আনন্দ। যেহেতু প্রশ্নপত্র অর্ধশতাব্দী ধরে ফাঁস হয়েই আসছে সুতরাং এখন হওয়াতে কোনও অপরাধ নেই!)। তবে মন্ত্রীর মতে, আগে এই ফাঁস নিয়ে নাকি তেমন কোনও প্রচার প্রচারণা ছিল না। এখন এটা নিয়ে ফেসবুক এবং মিডিয়ার কল্যাণে ঝড় বয়ে যায়।

তবে এই ঝড়ের কল্যাণে মন্ত্রীর মেট্রিক পরীক্ষার মতো আমরা অনেক কিছু জানতে পারি। জানতে পারি উনি দেশের সবচেয়ে বেশি বছর ধরে (নয় বছর!) শিক্ষামন্ত্রী আছেন। তার আমলে সবচেয়ে বেশিবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। তার আমলে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের স্কুলের ব্যাগ ভারি হয়েছে এবং উনিই নতুন দুইটি জাতীয় পরীক্ষার জন্ম দিয়ে শিশুদের ওপর একরকম টেনশন ও মানসিক বৈকল্যের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। পরীক্ষার এত বড় বোঝা সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনও দেশে নেই। মন্ত্রী সাহেবের কথার ভেতরেও দ্বৈততা আছে। যেমন, মন্ত্রী একবার বললেন–প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। সব গুজব। আবার বললেন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ফাঁস হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে আসা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের প্রমাণ সহকারে উপস্থিত করা হলে মন্ত্রী মহোদয় কথা বলা বা মোবাইল রিসিভ করা থেকে বিরত থাকেন। প্রশ্নপত্র ফাঁস যখন সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে তখন মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, ‘তিনি বরং প্রশ্নপত্র ফাঁস কমিয়েছেন!’ আবার তিনিই বলেছেন–‘একশ্রেণির শিক্ষকই প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য দায়ী। এদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই কেউ কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটাচ্ছে।’ উল্লেখ্য, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন! তাহলে ছাত্রলীগের কেউ কেউ কি সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছেন? প্রশ্নপত্র ফাঁসের রেকর্ডে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নির্ঘাত গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছেন, যদিও তিনি ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন!

ওসামা বিন লাদেনকে ধরার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতেও পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁসে বাংলাদেশ বিশ্বরেকর্ড করেছে। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও এমন ফাঁসের নজির আছে কিনা সন্দেহ। ক্লাস ওয়ানের প্রশ্নপত্র যেমন ফাঁস হয়েছে তেমনি এসএসসি কিংবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। ধর্ম পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যেমন ফাঁস হয়েছে তেমনি হয়েছে ব্যাংকের চাকরির পরীক্ষার কিংবা মেডিক্যালের প্রশ্নপত্র ফাঁস। শুধু তাই না, উল্টো ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকজন অভিভাবক ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের উত্তর লিখে (ঘটনাটা ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের) সেটা তাদের সন্তানদের সরবরাহ করেছিলেন। পরীক্ষা শেষে অভিভাবকরা দেখলেন ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার হলে সরবরাহ করা প্রশ্নপত্রের মিল নেই। তখন ওই অভিভাবকরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের রুম ঘেরাও করেন! প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সম্ভবত গর্বের এবং ফাঁস না হলেও শিক্ষকের রুম ঘেরাও সম্ভবত বৈধ! ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়াই মনে হয় ইদানীংকার শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য। পরীক্ষা ও রেজাল্টই আসল , সঠিক ও নৈতিক শিক্ষা বা জ্ঞানার্জন কোনও ব্যাপার না!

তবে লেখাপড়া কোনও ব্যাপার না বলে যারা থোড়াই কেয়ার করতেন, মিথিলেশ কুমার শ্রীবাস্তব নামের এক ভদ্রলোক তাদের একজন , যাকে ভারতের মানুষ নটবর লাল হিসেবেই চেনেন। চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যারা বলেন তারা এই নটবর লালকে গুরু মানতে পারেন। নটবর লালকে নিয়ে ভারতে ছবিও হয়েছে। এমপি, মন্ত্রীদের বাসভবন কিংবা ভারতের সংসদ ভবন থেকেও চুরি করেছিলেন নটবর লাল। পাঁচতারা হোটেল থেকেও চুরি করে আলোচনায় এসেছিলেন। শত বছরের বেশি কারাদণ্ড হলেও নটবর লাল যখন জেল থেকে পালাতে সক্ষম হন তখন তার বয়স চুরাশি! নটবর লালের মতো আরেক প্রতিভার নাম হচ্ছে বার্টি স্মল। তার শারীরিক উচ্চতা কম ছিল বলেই তাকে এই নাম দেয়া হয়েছিল! (বাংলাদেশের সন্ত্রাসীদের এমন নাম আছে। কালা জাহাঙ্গীর, মুরগি মিলন, চুই বাবু! উচ্চতায় ছোট বলে নাম হয়ে যায় চুই কিংবা পিচ্চি। বার্টি ঘোষণা দিয়ে চুরি বা প্রতারণা করতেন, আড়াই লাখ ডলার গায়েব করে দিয়েছিলেন চোখের পলকে। বার্টি আর নটবরকে পজিটিভ কাজে ব্যবহারের ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন অনেকে। এই দুজন রাজি হননি। ফ্রান্সের আলবার্ট স্পাগগিয়ারি ব্যাংকের একটি শাখা থেকে প্রায় সব টাকা গায়েব করে দেন। ৬০ মিলিয়ন ফরাসি মুদ্রা গায়েব করার পর দেয়ালে লিখে আসেন- কোনোরকম সংঘর্ষ এবং রক্তপাত ছাড়াই ঘটনাটি ঘটনা হলো। এরপর আলবার্ট প্লাস্টিক সার্জারি করে আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যান। বাকি জীবন সুখেই কাটে তার!

নটবর, বার্টি কিংবা আলবার্ট স্পাগগিয়ারির মতো আরেকজনের নাম ফ্রাংক উইলিয়াম জুনিয়র। ব্যাংকের চেক জালিয়াতিতে তিনি গোল্ডেন এ প্লাস পান। ফ্রান্সের একটা ব্যাংক থেকে মিলিয়ন ডলার তুলে নেন তিনি। শাস্তি আসন্ন দেখে সুইডেনে পালান। সেখানেও জালিয়াতি করে লাখ ডলার কামান। সুইডেন থেকে চলে আসেন আমেরিকায়। এরপর উইলিয়ামের মেধাকে দেশের কাজে লাগানোর প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হয়ে যান এবং আমেরিকার নিরাপত্তা বিষয়ক কনসালটেন্ট হয়ে যান।

লাদেনের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাদের ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এই বিরল প্রতিভাদের খুঁজে বের করে দেশের কাজে লাগানো যায় না? এই বিরল প্রতিভাদের ‘গোল্ডেন এ প্লাস ফাঁসকারী’ নাম দেওয়া যেতে পারে। এরা এমন ব্যবস্থা করবে যাতে কেউ আর প্রশ্ন ফাঁস না করতে পারে। কিংবা এত বেশি প্রশ্ন করে ছড়িয়ে দেবে যে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সাথে হুবহু মিলবে না! সারা বছর না পড়ে শুধু ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের উত্তর দিয়ে কেউ গোল্ডেন এ প্লাস পাক এটা যেমন কেউ চান না, তেমনি কোটি কোটি সেট বই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিলানোর পর জ্ঞানার্জন ও প্রকৃত শিক্ষার কাজে এই বই ব্যবহৃত হবে না সেটাও নিশ্চয় কেউ চাইবেন না।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে, দোস্ত ব্যবসা নিয়ে এখন খুব ভালো আছি। আগে ছিলাম পায়ের নিচে এখন মাথার ওপরে উঠেছি। অন্য বন্ধু বললো, সে কী রে? বুঝিয়ে বল। ওই বন্ধু উত্তর দিল, আগে পায়ের মোজার ব্যবসা করতাম। এখন মাথার টুপির ব্যবসা করি!

আমরা কয়েকজন গোল্ডেন এ প্লাস প্রশ্নফাঁসকারীর অপেক্ষায় আছি। আশা করি সরকার এদের খুঁজে বের করে পা থেকে মাথায় তুলবেন! প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা বিষয়ক কনসালটেন্ট নিয়োগ দেবেন এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হবে!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/ওএফ/

x