মেরুদণ্ডের ক্ষয়রোগ

তুষার আবদুল্লাহ ১৬:২৭ , ফেব্রুয়ারি ১১ , ২০১৮

তুষার আবদুল্লাহপরীক্ষাকেন্দ্র উৎসব মুখর। পরীক্ষা শুরুর তখনও একঘণ্টা বাকি। কেন্দ্রের সামনের ফুটপাতে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিচ্ছিন্ন জটলা। উল্লাস ধ্বনিও আসছে কোনও কোনও জটলা থেকে। এই জটলার বাইরেও পরীক্ষার্থী আছে, অভিভাবক আছেন। তারা ওই জটলা লক্ষ করলেও, সেখানে গিয়ে ভিড়ে যাচ্ছেন না। অভিভাবকরা ব্যস্ত পরীক্ষার্থীদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে। পরীক্ষার্থীরা শেষবারের মতো পাঠ্যবই দেখে নিচ্ছে। পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের সময় হলে, জটলার পক্ষ হাসি ঠাট্টা করতে করতে ভেতরে চলে গেলো। অন্যদের চোখে খানিকটা উদ্বেগ। আধঘণ্টার পরীক্ষা কেমন যে হয়! পরীক্ষার্থীরা ভেতরে চলে গেলে জটলার অভিভাবকেরা চা-বিস্কুট খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আগের পরীক্ষাগুলো তাদের সন্তানরা খুব ভালো দিয়েছে। আজকের পরীক্ষাও ভালো দেবে বলে তারা নিশ্চিত। জটলায় যোগ দেন যারা, সেই অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ আছে–যা পড়েছে সেই প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক মতো আসবে তো, উত্তর ঠিকমতো দিয়ে আসতে পারবে তো ছেলে-মেয়েরা?

আধঘণ্টার পরীক্ষা ২০ মিনিটের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করে পরীক্ষার্থীদের একটি দল। যাদের ওই জটলাতে দেখা গিয়েছিল। তারা উল্লসিত। বাবা-মায়েরা যেন আরও বেশি। জটলার বাইরের পরীক্ষার্থীরা বের হয়ে এলো আধঘণ্টার পরীক্ষা শেষ করেই তাদের মধ্যে উল্লাস নেই। আছে তৃপ্তি। পরীক্ষা ভালো দেওয়ার তৃপ্তি। ওদের অভিভাবকদের মধ্যেও স্বস্তির প্রশান্তি দেখা গেলো। তবে এই পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকেই জানা গেলো– পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই ক্লাস রুমে বসে কেউ কেউ আবেগ ধরে না রাখতে পেরে উচ্চস্বরে বলেই বসেছে–আগের রাতে ফাঁস হওয়া দুই সেট থেকেই এসেছে প্রশ্ন।ওই চার সেট একরাতে মুখস্থ করা কোনও ব্যাপারই না। অতএব মুখস্থ করা নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের উত্তর দিতে আধঘণ্টা কেন খরচ হবে?

এই বাস্তবতা রবিবার এসএসসি'র আইসিটি পরীক্ষার। কোনও একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রের কথা কিভাবে বলি, যেখানে সারাদেশ থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আসছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াই এখন স্বাভাবিক বিষয়। এটি এখন বুঝি আর খবরের পর্যায়ে নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি—এটিই এখন খবর। এখন হয়তো এই তথ্যও খবর নয় যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে শিক্ষকরাও জড়িত। ছাত্র সংগঠনের কথাও শোনা যায়। যুক্ত আছেন অভিভাবকরাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে শিক্ষকরাই যখন প্রশ্ন বিক্রি করতে বসেন, তখন জাতির মেরুদণ্ডে যে ক্ষয়রোগ দেখা দিয়েছে, তা জানতে রঞ্জন রশ্মি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।

সারাদেশ থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে কয়েকজনকে। পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে জড়িতদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এই উদ্যোগগুলো দৃশ্যমান। অদৃশ্যে আছে শিক্ষা বিভাগের হাত গুটিয়ে বসে থাকা। তাদের অসহায়ত্ব। শিক্ষা বিভাগের ভেতরে যে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল, দুষ্টের দমন অনিবার্য ছিল, সেই কাজগুলো বকেয়া রয়ে গেছে। শুদ্ধি অভিযানে মনোযোগ না দেওয়াতে সুদে-আসলে শিক্ষা-ব্যবস্থাকে অসার করে দেওয়ার ‘উৎসবে’ মেতেছে একটি চক্র। এই চক্র অপরিচিত নয় বলে দাবি শিক্ষা বিভাগের ভেতরকার মানুষদেরই। সমস্যা হলো কারও কারও প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা এই পরগাছারাই এখন মহীরুহ রূপ ধারণ করেছে। পরগাছার জীবাণুতে দূরারোগ্য ব্যাধিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। আগামীতে যারা রাষ্ট্রের নানা পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবে, সেই প্রজন্ম প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া বির্তকিত পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করাও যে লজ্জার, অভিভাবক হিসেবে আমাদের অক্ষমতা। এই বোধটুকু কি অটুট আছে রাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের?

কথা হচ্ছিল ঢাকার একটি স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে। তিনি নিজের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করে বললেন, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তার মায়া হয়। কারণ তিনি দেখতে পাচ্ছেন যে পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে তার শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছে, সেই পাঠ্যক্রমকে তিনি শিক্ষা বলতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হচ্ছে সৃজনশীল ও জিপিএ ভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির নামে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়েই বললেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষক ও অভিভাবকরা যুক্ত বুঝতে পারছেন, কিন্তু কিছু বলা বা করার ক্ষমতা তার নেই। এই অধ্যক্ষ উল্টো আমার কাছেই প্রশ্ন করলেন,  একটি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে কী করে দেওলিয়া করা যায়, আমাদের চেয়ে আর কে এই দৃষ্টান্ত রাখতে পেরেছে বলেন? তিনি যোগ করেন, আমরা এর প্রায়শ্চিত্ত কী করে করবো বলতে পারেন?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

x