বাংলাদেশের রাজনীতির শেষ খেলা

জাফর সোবহান ১৮:২৭ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৮

জাফর সোবহানযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার দিন ফুরিয়েছে বিএনপির
দুর্নীতির দায়ে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই রাজনৈতিক ধারায় বিভক্ত। এই প্রথমবারের মতো বিএনপির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগ তাদের রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ময়দানের বাইরে ছুড়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। এতে রাজনীতি উপনীত হয়েছে নতুন এক মেরুকরণের দ্বারপ্রান্তে।

পেছনের কথা

১৯৯১ সাল থেকে পালাক্রমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসেছে বিএনপি আর আওয়ামী লীগ। ৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে প্রায় এক দশক ধরে চলা সামরিক শাসনের অবসানের পর। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে ১৯৯৬ সালে। তারপর ২০০১ সালে আবার বিএনপির শাসন শুরু হয়।

কেউ বলতেই পারেন, আজকের অবস্থানের জন্য বিএনপির ২০০১-২০০৬ মেয়াদের দুঃশাসনই দায়ী। তখন বিএনপি সরকার দুর্নীতির নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছিল। সেই সময়ের দুর্নীতির কারণেই বাংলাদেশকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে টানা পাঁচ বছর সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, নজিরবিহীন সহিংসতারও জন্ম দিয়েছিল দলটি। বহু সংখ্যালঘু সে সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। দমন-পীড়নের শিকার হয়েছেন বিরোধীদলীয় বহু রাজনীতিক।

আওয়ামী লীগের দুজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বিএনপির ওই শাসনামলে হত্যার শিকার হন। আওয়ামী লীগের জনসভায় করা গ্রেনেড হামলায় ২৪ জনের মৃত্যু ও ৩০০ জনের আহত হওয়ার ঘটনাও বিএনপির ওই সরকারের মেয়াদেই ঘটেছিল। গ্রেনেড হামলার ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সন্ত্রাসী আক্রমণের দায়ে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার বিচার চলছে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিলে অবসান হয় বিএনপি-যুগের। সেই থেকে প্রায় ১১ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। রাজনীতিতে ক্ষমতাহীন অবস্থায় ১১ বছর কাটানোটা সময় হিসেবে খুবই দীর্ঘ। ক্ষমতায় এসে বিএনপি-আওয়ামী লীগ দুই দলকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল সেনা-সমর্থিত সরকার। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাহাড়সম বিজয় অর্জন করার পর থেকেই মূলত বিএনপির শনির দশা শুরু হয়। বাংলাদেশে চলমান থাকা বিরোধী দমনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বলি হতে হয়েছিল বিএনপিকেও। কিন্তু ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে জনমত জরিপ ও অন্যান্য নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী তখনকার বিএনপি শক্তিশালী অবস্থায় ছিল। ক্ষমতায় যাওয়ারও সম্ভাবনা ছিল তাদের।

কিন্তু বিধি বাম। আওয়ামী লীগ সরকার আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলে ২০০৭ সালের মতো আবারও তাদের ব্যবহার করে সেনা শাসন জারি হতে পারে; এমন আশঙ্কাও জানিয়েছিল তারা। আওয়ামী লীগের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে আসার সুযোগটা নেয়নি বিএনপি। নিলে তারা জিতলেও জিততে পারত। তবে তা না করে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করল। দেশের বড় একটি অংশের ভোটার বিএনপির ওই বর্জনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাস্তা দখলে রেখে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করতে পারেনি বিএনপি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জ্বালাও পোড়াও করেও কোনও লাভ হয়নি তাদের। উল্টো এতে নাটকীয়ভাবে তাদের জনসমর্থন কমেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আদতেও তারা ক্ষমতায় যাওয়ার যোগ্য কিনা।

ঘটনাপ্রবাহে নতুন মোড়

বিএনপির বর্জন করা ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পাহাড়সম বিজয় অর্জিত হয়। আর এতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নতুন মোড় সৃষ্টি হয়। শাসন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। অন্যদিকে সরকারদলীয় তীব্র দমন-পীড়ন আর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্রমশ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে উঠতে শুরু করে বিএনপি। দলটির বর্ষীয়ান নেতাদের মাসের পর মাস জেলে থাকতে হয়েছে, যা দলটিকে সাংগঠনিক দিকে থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের কর্মীরা পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হওয়ায় দলটির জনসমাগম করার ক্ষমতা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

বিরোধী দলের যে দায়িত্ব তার কিছুই বিএনপি করতে পারছে না। এতে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কায় পড়েছে তারা। অতীত ইতিহাসকে বিবেচনায় নিলে, সরকারি দমন-পীড়ন সহ্য করে বিএনপি আবার ভালো অবস্থায় ফিরতে পারবে বলে মনে হয় না।  

আওয়ামী লীগের এই মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। এর আগেই সরকারকে পরবর্তী নির্বাচনের ঘোষণা দিতে হবে। সরকার চাইবে আবারও বিএনপিকে নির্বাচন বয়কট করার উসকানি দিতে। যাতে তারা আবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতায় আসতে পারে। তাতে করে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী বিএনপির নিবন্ধন বাতিল করা দেওয়ারও সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রধান মিত্র ও বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারত মনে করে, বিএনপিকে ছাড়া আবারও নির্বাচন হলে একে বৈধতা দেওয়া কঠিন হবে।

সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কৌশল হলো, অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। কেননা, সাংগঠনিকভাবে খারাপ অবস্থায় থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি আওয়ামী লীগের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে পারে।

যদি খালেদা জিয়াকে জামিন দেওয়া না হয়, অথবা আপিলের রায় যদি তার বিপক্ষে যায় তাহলে সামনের নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে বিএনপির পুরোপুরিই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে খালেদা জিয়া যদি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে জামিনে বেরিয়ে আসতে পারেন, তাহলে এখনও তার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ রয়েছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ চায় খালেদা জিয়ার জেল হোক। এতে বিএনপির নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়াকে ত্যাগ করে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হবে বলে মনে করছে সরকারপক্ষ। স্বাভাবিকভাবেই তাতে বিএনপি দুর্বল হয়ে পড়বে। তারা মনে করে, খালেদা জিয়াকে অল্প দিনের জন্য জেলে রাখতে পারলেও, বিএনপির নেতাকর্মীদের বুঝিয়ে দেওয়া যাবে যে ক্ষমতার পাল্লা কোন দিকে ভারি। আওয়ামী লীগ মনে করে, খালেদাকে কারাগারে রাখতে পারলে বিএনপি সরকারবিরোধী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবে। এতে বিরোধী দল হিসেবে তারা ধ্বংসের পথে অগ্রসর হতে বাধ্য হবে। তাই সবকিছু মিলে মনে হয়, যে দিক দিয়েই দেখা হোক না কেন, সামনের নির্বাচনে বিএনপি আশাব্যঞ্জক কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারবে না। যদিও এখনই বিএনপির রাজনৈতিক মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে দেওয়ার সময় আসেনি, তবে এটাও ঠিক যে তার ফিরে আসার সম্ভাবনাও খুব কম।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চলা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হয়েছে। বিএনপি যদিও এই বছরের শেষ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারবে, তবে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আর উঠে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের জনগণের মনে এখন প্রশ্ন, বিএনপি যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তার জায়গা কে দখল করবে? যদি আদৌ কেউ সেই জায়গা নিতে পারে, সেক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক গন্তব্য কী হবে?

এর উত্তর জানা নেই কারও...

 

লেখক: সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন

[দ্য হিন্দু পত্রিকা থেকে নেওয়া]

 

/এএমএ/বিএ/এসএএস

x