পদ্মা সেতু এবং আমাদের সুশীল সমাজ

আনিস আলমগীর ১৩:৫৯ , ফেব্রুয়ারি ১৩ , ২০১৮

আনিস আলমগীরপদ্মা সেতু কি আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে হবে? সেতুটি ২০১৮ সালে শেষ হোক সেটা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা। সেতুটা শেষ হলে বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, সাতক্ষীরা, যশোর জেলা যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে। যোগাযোগ সহজ হলে উন্নয়নের ধারাও গতিলাভ করবে।
পায়রা বন্দরের কাজও আরম্ভ হয়েছে। পদ্মা সেতু আর পায়রা বন্দর প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব পরিকল্পিত প্রজেক্ট। পায়রা বন্দরের স্থান নির্ধারণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নদীপথে ঘুরেছেন এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ করে নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পায়রাতেই বন্দর নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করেছেন।
বৃহত্তম বরিশালের মানুষদের বন্দরের কাজে সুনিপুণতা রয়েছে। কলকাতা বন্দরের পত্তনের সময় থেকে তারা ওই বন্দরে কাজ করেছে। বরিশাল কলকাতা এত লোক আসা যাওয়া করতো যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিটিশদের অনুরোধে ‘ঠাকুর নেভিগেশন’ নামে স্টিমার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাতে লোকজন যাতায়াতের সুবিধা ভোগ করে।

ব্রিটিশরা যখন প্রথম ভারতে রেল ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন তখন দুজন ভারতীয় ব্রিটিশকে সহায়তা দিয়েছিলেন। একজন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর আর দ্বিতীয়জন ময়ূরভঞ্জের মহারাজ। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিটিশকে টাকা ঋণ দিয়ে সাহায্য করেছেন আর ময়ূরভঞ্জের মহারাজ প্রথম স্থাপিত ৩৫০ মাইল রেললাইনের স্লিপার সরবরাহ করেছিলেন, যার কোনও মূল্য তিনি গ্রহণ করেননি।

উড়িষ্যাতে ময়ূরভঞ্জের মহারাজের জমিদারি ছিল ব্যাপক। সেখানে সারা বছর দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করার জন্য মহারাজ সাহায্য করেছিলেন। যোগাযোগের কারণে যে দুর্ভিক্ষ হয় সে কথা ড. অমর্ত্য সেনও তার বইতে লিখেছেন। উন্নয়নের পর্যায়ে বহু মানুষকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হয়।

লিখছি পদ্মা সেতু সম্পর্কে। কিন্তু পদ্মার কথা লিখতে গিয়ে অনেক কথা লিখতে হচ্ছে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জানা প্রয়োজন। ভারতীয় দণ্ডবিধি তৈরির সময় লর্ড মেকলে ভারতের জাতি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সার্ভে করে বাঙালি জাতি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শিং না থাকলে যেমন ষাঁড় হয় না, হুল না থাকলে যেমন মৌমাছি হয় না, তেমনি শঠতা ও তঞ্চকতা না থাকলে বাঙালি হয় না।’ বাঙালি জাতির একজন হিসেবে এ কথাটা লিখতে আমার লজ্জা হচ্ছে, হৃদয়েও ব্যথা অনুভব করছি। তবু লিখেছি।

পদ্মা সেতু নিয়ে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিলো তাতে সাহায্যের জন্য যে কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছিলো, তা তো শেষ পর্যন্ত বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিলো। প্রধানমন্ত্রী সাহস করে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়াতে সেতুটি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সেতুর ১২০ কোটি ডলার ঋণ বন্ধ করে দিয়েছিলো। অথচ এ অভিযোগ যখন বিশ্বব্যাংক উত্থাপন করেছিলো তখনও পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক সেতুর জন্য কোনও টাকা দেয়নি এবং কনসোর্টিয়ামের অন্য সদস্যরাও এক পয়সা দেয়নি।

টাকা পয়সা কিছু নেই অথচ দুর্নীতি হয়েছে– এ এক আজগুবি অভিযোগ, দেশের মান ইজ্জত নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছিল। সারা দেশের কিছু চিহ্নিত মিডিয়া আর সুশীল সমাজ মিলে সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। ড. ইউনূস সাহেবের সঙ্গে সরকারের গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছিলো। কারণ, নির্দিষ্ট বয়স শেষ হওয়ার পরও ড. ইউনূস এমডি থাকার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন, কিন্তু ব্যাংকবিধিতে তা সম্ভব ছিল না।

গ্রামীণ ব্যাংক পরিপূর্ণভাবে এনজিও নয়। এক সময়ে গ্রামীণ ব্যাংক অর্থের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। ১৯৯৬ সালে ইউনূস সাহেবের অনুরোধে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে গ্রামীণ ব্যাংককে সচল রেখেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিমালার আওতায়।

ড. ইউনূস এমডি পদের জন্য হাইকোর্টে মামলাও করেছিলেন। কিন্তু মামলায় তিনি হেরে যান এবং এমডির পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। হিলারি ক্লিনটন তখন আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ক্লিনটন পরিবার ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত বন্ধু। ড. ইউনূস হিলারিকে দিয়ে বিশ্বব্যাংককে প্রভাবিত করেন এবং কাল্পনিক অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতুর ১২০ কোটি ডলার ঋণ বন্ধ করে দিতে সফল হন। ড. ইউনূস বাঙালির গর্বের ধন কিন্তু এমডি পদের জন্য জাতির গায়ে মৌমাছির হুল ঢুকিয়ে তিনি বিতর্কিত হয়েছেন। যদিও ইউনূস সেন্টার এই অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছে।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া ক’দিন আগে বলেছেন পদ্মা সেতু জোড়াতালি দিয়ে তৈরি হচ্ছে। কেউ যেন এ সেতুটি ব্যবহার না করেন। এত বড় বড় মাপের লোকরা যদি সেতুটির বিরোধিতা করে তবে সেতু হতে তো বিলম্ব হবেই। ড. ইউনূস যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে তা দেশপ্রেমহীন কাণ্ড আর খালেদা জিয়া যা বলেছেন তাতেও দেশনেত্রীর নাম-গন্ধ নেই।

১৯৪৭ সালে ভারত যখন বিভক্ত হয় তখন বাংলার শেষ ব্রিটিশ গভর্নর ছিলেন ফ্রেডেরিক বারোজ। তিনি বলেছিলেন পূর্ব বাংলা হবে দরিদ্র কৃষকের বস্তি। অনাহার সঙ্গী হবে এ বস্তিবাসীর। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে তার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী মন্ত্রী ও হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি বলেছিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব বাংলার হিন্দু-বিনিময় চুক্তি কার জন্য। মানে পূর্ব বাংলার সব হিন্দু ভারতে চলে যাবে আর সমপরিমাণ মুসলমান ভারত থেকে পূর্ব বাংলায় আসবে।

নেহরু তার এ প্রস্তাব মানেনি। তিনি লোকসভায় বলেছিলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পূর্ব বাংলা ১৫ বছরের ওপরে পাকিস্তানের সঙ্গে থাকবে না। নেহরুর কথা মিথ্যা হয়নি। ১৫ বছর নয়, ২৩ বছরে পাকিস্তান ভেঙে গেছে। তবে নেহরুর আরেকটি ভবিষ্যৎ বাণীকে মিথ্যে প্রমাণ করে স্বাধীন বাংলা স্ব-ইচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যোগদান করেনি।

ভারতের মানুষের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন মান এখন কোনও অংশে খারাপ না। ১৬ কোটি মানুষের কেউ অনাহারেও নেই। বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল ছিল পাট। পাট তার জৌলুস হারিয়েছে। বাংলাদেশ অন্যখাতে উন্নয়ন করেছে আর তার বৈদেশিক মুদ্রার আয় এখন পাটের চেয়েও বেশি হচ্ছে। এক কোটি লোক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। অর্থকড়িও কম উপার্জন করছে না।

আমার মনে হয় ১৬ কোটি মানুষ যদি ইচ্ছে করে তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন আরও অনেক বেশি হবে। অনেকে অর্ধশিক্ষিত হাতুড়ে পণ্ডিতের মতো বাঙালি জাতিকে নিয়ে অনেক পণ্ডিতি ফলিয়েছে, তার কিছুই হয়নি, বাংলাদেশ এগিয়েছে, আরও এগুবে। তবে এগুনোর পরিকল্পনায় ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সুশীল সমাজ তা উদ্ধার করে সরকারকে বলবে। ড. অমর্ত্য সেন এ কাজে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভুলত্রুটির কথাও নিঃসঙ্কোচে বলছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, যে সুশীলেরা সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে ভূমিকা পালন করেন, সেটি কোনও প্রকৃত ভূমিকা নয়।

এডওয়ার্ড সাইদ বা উমবের্তো একোর মতো বুদ্ধিজীবীরা তাদের সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেন, আর আমাদের বুদ্ধিজীবীরা অনেকটা সরকারকে হেয় করার জন্য সমালোচনা করেন। এতে কারও উপকার হয় না। বরং সম্পর্ক খারাপ হয়। এ পন্থা পরিহার করা উচিত সুশীল সমাজের।

যাক, প্রধানমন্ত্রী সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করে পদ্মা সেতুর কাজ আরম্ভ করেছিলেন। এখন সেতুর প্রায় ৫০% কাজ শেষ হয়েছে। পদ্মা কীর্তিনাশা নদী। সেতুটি করতে কিছু দুর্যোগ পোহাতে হবেই। পাইলের সলিড লেয়ার পেলে পাইল ছেড়ে দেওয়া হয়। সলিড লেয়ার না পেলে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়। চীনারা ব্রিজের ব্যাপারে প্রচুর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কারিগর। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্রিজ নির্মাণ থেকে সাগরে ব্রিজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।

কোরিয়ান উপসাগরের পাশে চীনের মূল ভূখণ্ডের ভেতরে বোহাই উপসাগর রয়েছে। আর এ উপসাগরের কারণে আনসান থেকে ইয়ানটাই পর্যন্ত যেতে প্রায় ৫০০০ মাইল ঘুরে যেতে হয়। অথচ কোরিয়ান উপসাগর ও বোহাই উপসাগর যেখানে মিলিত হয়েছে সেখানে প্রস্থ কম। চীনারা দুই উপসাগরের সংযোগস্থলে ইয়ানটাই থেকে ডালিয়ান পর্যন্ত টানেল নির্মাণ করছেন।

পিলার ছাড়াও ব্রিজ হয়। কলকাতার হুগলি ব্রিজে কোনও পিলার নেই। দ্বিতীয় হুগলি ব্রিজও হয়েছে টানা ব্রিজ। কোনও পিলার নেই। অবশ্য পদ্মা সেতুর যে কাঠামো দেখা যাচ্ছে তাতে পিলার রয়েছে।

ভোটের আগে পদ্মা সেতু হবে কিনা জানি না। চেষ্টা তো কম দেখছি না। আগে পরে তো হবেই। সুতরাং দক্ষিণবঙ্গের বন্ধু যারা লেখালেখি করছেন, যথাসময়ে ব্রিজ নির্মাণ শেষ হবে না বলে হা-হুতাশ করছেন, তাদের ধৈর্য ধারণের অনুরোধ করব। পদ্মা সেতু তো বাঁশের সাঁকো নয় যে রাতারাতি হয়ে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক

anisalamgir@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

x