র‍্যাগিং ও গ্যাং সংস্কৃতি

ইকরাম কবীর ১৮:১২ , মার্চ ১১ , ২০১৮

ইকরাম কবীরসবচেয়ে বেশি র‍্যাগিং কোথায় কোথায় হতে পারে? ধরে নিচ্ছি তা হয় ক্যাডেট কলেজগুলোতে অথবা সামরিক বাহিনীর ক্যাডেট একাডেমিতে। আমি নিজে ক্যাডেট কলেজে পড়েছি ছ’বছর। সেখানকার চিত্রটি আমার জানা। ক্যাডেট হিসেবে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রথম সেখানে গেলে তাদের কলেজের নিয়ম-কানুন শেখানোর দায়িত্ব পড়ে অষ্টম শ্রেণির। মাঝে-মাঝে প্রথম দিনই নতুন ক্যাডেটদের শাস্তি দেওয়ার কথা আমি শুনেছি,কিন্তু আমি যেদিন প্রথম দিন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে বাবা-মাকে নিয়ে গেলাম,আমার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।
বরণ করে নেওয়ার জন্য আমাদের শিক্ষকগণ এবং লকার পার্টনাররা  স্বাগত জানিয়েছেন। সেদিন কলেজে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ডিসপ্লে হয়েছে। তারপর বাবা-মাকে বিদায় দিয়ে নিজ-নিজ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তখন থেকেই নিয়ম-কানুন শেখানো শুরু হয়েছে। রাতে ডাইনিং হলে কাঁটা-চামচ দিয়ে খাওয়া শেখানো হয়েছে। পরদিন আমাদের কোনও ক্লাস ছিল না। অষ্টম শ্রেণির বড় ভাইদেরও ক্লাসে যেতে হয়নি। তারা সারাদিন আমাদের কলেজের নিয়ম-কানুন শিখিয়েছেন। তার পরদিন ক্লাসে গেলে কলেজের অ্যাডজুট্যান্ট (সেনাবাহিনীর একজন মেজর) এসে আমাদের মধ্যে ছাপানো ‘ডুজ  অ্যান্ড ডোন্টস’ বিলি করে দিয়ে বলেছিলেন সেগুলো সেদিনই মুখস্থ করে ফেলতে এবং তার পরদিন থেকে নিয়ম-কানুন ভাঙলে আমাদের শাস্তি দেওয়া হবে।

হয়েও ছিল তাই। পরদিন ভোর থেকে আমাদের প্যারেড, ক্লাস, খেলাধুলা,শাস্তি–সবই শুরু হয়েছিল। তবে র‍্যাগিং বলতে আমরা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে যা দেখি তা কোনাদিনই ছিল না। যেসব শাস্তি আমাদের বড় ভাই এবং হাবিলদাররা দিতেন তা ছিল আমাদের ট্রেনিংয়ের অংশ,সে আমরা সবসময় বুঝেছি।

আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম,তাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন আমাদের শিক্ষকরা। ক্লাসেই। তেমন কোনও আড়ম্বর বা অনুষ্ঠান হয়নি। মাসখানেক পর বিভাগ থেকে আমাদের জন্য নবীণবরণ অনুষ্ঠান হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুন বা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সামাজিকীকরণের জন্য বড়রা কিছু শেখাতে আসেননি। বরং আমরা পড়াশোনায় কী করে শুরু করবো তা নিয়েই তারা বেশি কথা বলতেন আমাদের সঙ্গে। বইপত্র কোথায় পাওয়া যাবে,কোথায় ফটোকপি করতে পারবো,নীলক্ষেতের দোকানিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া– এ দায়িত্বগুলো তারা পালন করেছেন।

ইদানীং পত্রপত্রিকায় পড়ছি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের বরণ করে নিতে র‌্যাগিং নামে একটি সংস্কৃতি প্রচলিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন ছেলেমেয়েদের প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। র‍্যাগিং বাংলাদেশে প্রথম কে বা কারা চালু করেছিল তা আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানি এটি এসেছে পশ্চিমা দেশগুলোর সংস্কৃতি থেকে। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোও নির্লজ্জভাবে পশ্চিমাদের অনুকরণে র‌্যাগিং প্রচলন করেছে তা আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি।

প্রথম প্রথম র‍্যাগিং-দিনে যা হতো তা নতুন ছেলেমেয়েরা আনন্দের সাথেই গ্রহণ করতো। নানা ধরনের মজা করা হতো তাদের সঙ্গে। তাদের বরণ করে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিও আয়োজন করা হতো। এখন তা বদলে গেছে। র‍্যাগিংয়ের নামে এখন যা হচ্ছে তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। র‍্যাগিং এখন এক ধরনের অনাচারে পরিণত হয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি। র‍্যাগিংয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, অনেক ছেলেমেয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেছে,মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন হয়েছে,আনন্দ করতে গিয়ে অযথা কুরুচিপূর্ণ কিছু কাজ করা হয়েছে, যা সাধারণত মানুষ করে না। এসব ঘটনা অস্বীকার করার উপায় নেই,এগুলো সবই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে।

আমরা যারা ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ওই ঘটনাগুলো দেখছি তারা সামাজিকভাবে অসহায় বোধ করছি। আমাদের ছেলেমেয়েদের ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠাবো কিনা তা নিয়ে ভাবছি। গায়ে পানি কিংবা রং ঢেলে দেওয়া পর্যন্ত মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু সবার সামনে এমন অস্বস্তিকর কাজ করতে বাধ্য করা হয়, যা মেনে নেওয়া কষ্টকর। এগুলো নিকৃষ্ট রকমের অপরাধ বলেই আমরা মনে করি। যারা র‍্যাগিংয়ের নামে এসব অত্যাচার শিক্ষার্থীদের ওপর করছে,আমরা তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দাবি করছি।

এসব জঘন্য কর্মকাণ্ড যখন ঘটে তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা কোথায় থাকেন? তারা কী করেন? তারা বছরের পর বছর এসব অনাচার সেখানে ঘটতে দিচ্ছেন কেন? আমাদের জাতীয় জীবনে ছাত্রছাত্রীদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। পুরো জাতি সে কারণেই ছাত্রছাত্রীদের সম্মান করে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেরা তাদের এই লজ্জাজনক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্মান যদি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়,তা ইতিহাসে কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। আমরা প্রথমে তাদের অনুরোধ করছি এই অসুস্থ সংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি এ ব্যাপারে কঠোর হতে,বিষয়টিকে আর তুচ্ছজ্ঞান না করতে।

যারা ছাত্রাবস্থায় এমন অত্যাচার করে তারা আরও বড় হয়ে পেশা-জীবনে তাদের এই মানসিকতার প্রতিফলন সমাজে ছড়িয়ে দেবে তা আমরা নিশ্চিত ভেবে নিতে পারি। এদের মানস দেশের ভালো কাজে লাগবে না সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। এ অত্যাচারগুলো না থামাতে পারলে ভবিষ্যতে বিপদ হতে পারে। যাদের ওপর অনাচার করা হচ্ছে তারা যখন রুখে দাঁড়িয়ে মারমুখী হবে তখন সামলানো কষ্টসাধ্য হতে পারে।

জাতিগতভাবেই বোধহয় আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহেলা করে চলেছি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো যে আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি তা আমরা সবসময় ভুলেই থাকি। একজন ছেলে বা একজন মেয়েকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েই আমরা হাত ঝেড়ে ফেলি। প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আমরা মনে করি সব করে ফেলেছি। আর কোনও খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করি না, আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে কী করছে,কাদের সাথে মিশছে। কয়েক বছর ধরে খবরে প্রকাশ হচ্ছে  ঢাকা,চট্টগ্রাম,সাভার ইত্যাদি শহরের স্কুল ও কলেজগুলোতে গ্যাং সংস্কৃতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমরা এখনও জানি না সারাদেশে এসব গ্যাং আছে কিনা,আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা বলতে পারবেন। তবে স্কুল-কলেজের ছেলেরা এলাকায় দলে-দলে ভাগ হচ্ছে,দলের বিভিন্ন ধরনের ইংরেজি নাম দিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মাস্তানি করছে এবং অঞ্চলের আধিপত্য নিয়ে কোন্দলে এক দল আরেক দলের সদস্যদের মেরে ফেলছে। এই ছেলেদের সবার বয়স ১৩ থেকে ১৮।  

বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এদের প্রধান কাজ মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা,ছিনতাই,চাঁদাবাজি,মাদক সেবন,মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ করা। প্রথম প্রথম সবাই গ্যাংয়ে যোগ দিতে আকৃষ্ট হয় পাড়ার বা নিজে প্রতিষ্ঠানের নায়ক হওয়ার জন্য। তারপর রাজনৈতিক বড় ভাইদের সাহায্যে নানা প্রলোভনে হয়ে উঠছে অপরাধী। সমাজে নানা ধরনের অপরাধ তারা করে বেড়াচ্ছে আর মতের মিল না হলে একে অপরকে মেরে ফেলছে। চিন্তা করুন তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলেরা একে অন্যের হাতে খুন হচ্ছে এবং এসব খুনের কোনও কিনারা করা যাচ্ছে না। বছর দুয়েক আগে পুলিশ ঢাকার উত্তরায় একটি ১৩ বছরের ছেলে খুন হওয়ার পর বেশ কিছু ব্যবস্থা নিয়েছিল,তারপর আবার তা ঝিমিয়ে পড়েছে। অন্তত আমরা তা-ই দেখতে পাচ্ছি। এসব গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তার খবর গণমাধ্যমে পাওয়া যেত। হয়তো আরও একজন মারা গেলে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

এসব গ্যাং যে আগে কখনও ছিল না তা নয়। আমরা যখন কিশোর হলাম তখনও ছিল। সেই ’৭০-এর দশকের শেষ এবং ‘৮০ র দশকের শুরু। পাড়ায়-পাড়ায় মারামারি,খেলার মাঠে মারামারি,চা পান করতে করতে মারামারি– এমন অনেক কারণে অকারণে কিশোর ও যুবাদের মধ্যে সংঘর্ষ হতো। সংঘর্ষগুলো সবই ঘটতো নিজেকে নায়ক প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে। অনেকেই আহত হতো,বিচার হতো,তবে হিরো হওয়ার জন্য কেউ কাউকে খুন করেছে এমন ঘটনা কখনও শুনিনি। প্রেম নিয়ে সংঘর্ষ আগেও ছিল,তবে প্রেমের কারণে কিশোর বয়সের কেউ মারা পড়েছে তা শুনিনি। পাড়ার বড় ভাই এবং মুরুব্বিরা খেয়াল রাখতেন সংঘর্ষগুলো যেন না ঘটে এবং ঘটলেও সেসব যেন আয়ত্তের বাইরে চলে না যায়।

এখন বোধহয় সমাজ বদলে গেছে। পাড়ার বড় ভাইরা আর আগের মতো নেই। তারাও নানা স্বার্থে জড়িয়ে গিয়ে ছোটদের ব্যবহার করছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর ভেতর আবার রাজনৈতিক স্বার্থও ঢুকে পড়েছে। সে কারণেই হানাহানিগুলো হচ্ছে। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থ ও প্রাচুর্যনির্ভর সমাজব্যবস্থায় মানুষ-মানুষে অন্তরঙ্গ যোগাযোগ কমে গেছে;এখন যোগাযোগ হয় শুধু স্বার্থের কারণে। ছোট বাচ্চা থেকে বয়স্ক – সবাই অর্থের পেছনে দৌড়াচ্ছেন,বেঁচে থাকাতে হলে এখন অন্যের ঘাড় ভেঙে বাঁচতে হয়। আমি নিজে চেষ্টা করেছি ঢাকা শহরে আমাদের নিজেদের পাড়ার সব ছেলেমেয়েকে নিয়ে পাড়ার উন্নতি হয় এমন কিছু কাজ করতে,পাড়ার রাস্তাগুলো পরিষ্কার করতে,কেমন করে টেকসইভাবে বসবাস করলে সমাজের উন্নতি হয় তা সবাইকে জানাতে। সাড়া পাইনি। এখন কারও সময় নেই।

তাহলে কী আমাদের এই খুদে গ্যাংস্টাররা তাদের ‘নায়কগিরি’ চালিয়েই যাবে? এবং আধিপত্য বিস্তার ও প্রেমকে কেন্দ্র করে নিজেরা নিজেদের হাতে খুন হতেই থাকবে? আমি জানি না শুধু আইনের প্রয়োগ দিয়ে এসব থামানো যাবে কিনা। পুলিশ কিছুদিন তাদের পেছনে ছুটবে,তারপর অন্য কাজ হাতে এলে তারাও স্তিমিত হয়ে যাবে। আমাদের বোধহয় অন্যভাবে ভাবা উচিত,অন্য কিছু করা উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের পেশা বেছে নেন আমি জানি না। তাদের মধ্য থেকে মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে কিনা আমরা তাও জানি না।

মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো র‍্যাগিং এবং গ্যাংস্টারিজমের পেছনের কারণগুলো ধরতে পারবেন এবং তার সমাধানগুলো বের করে আমাদের পথ দেখাতে পারবেন। অন্তত এই অকাল এবং বিনা কারণে মৃত্যুর হাত থেকে আমাদের ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে পারবেন।

লেখক: গল্পকার ও কলাম লেখক

 

/এসএএস/এমওএফ/

x