অন্যরকম সময়

রুমীন ফারহানা ১৩:৪২ , মার্চ ১৪ , ২০১৮

রুমীন ফারহানা২০১৮ সাল, নির্বাচনি বছর আমাদের। পাঁচ বছর পর পর এই সময়টিতে যা একটু ক্ষমতা হাতে পায় জনগণ। ক্ষমতা জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের, ক্ষমতা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই নির্বাচনের এই বছরটি হতে পারত আনন্দের, হতে পারত উত্তেজনার, হতে পারত সব দলের প্রার্থীদের পদচারণায় মুখর, জনগণের বছর। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, সময় অন্যরকম।
ভালো লাগুক আর না লাগুক–বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য এখনও নির্ধারণ করে মূলত দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। একটি দল গত দশ বছর যাবৎ রাষ্ট্রক্ষমতায় আর অন্যটি নানাবিধ বিপর্যয়ে পর্যুদস্ত। বাতাসে নানান ফিসফাস, জনমনে হাজার প্রশ্ন। যদিও জাতীয়/আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল থেকে বারবারই বলা হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু,গ্রহণযোগ্য এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা। তারপরও শঙ্কাকুল চারপাশে কান পাতলেই শোনা যায় নানা প্রশ্ন।
ক. নির্বাচন কি হবে?

খ. নির্বাচন কি অংশগ্রহণমূলক হবে অর্থাৎ বিএনপি কি অংশ নেবে নির্বাচনে?
গ. বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কি পারবেন নির্বাচনে অংশ নিতে?
ঘ. তিনি যদি কোনও কারণে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন,বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে?

ঙ. বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে কি নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হবে?
চ. নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে তার পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন হবে?
ছ. আবারও কি ২০১৪ সালের মতো একটি একদলীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে?
জ. যদি একদলীয় নির্বাচন আবারও হয় বাংলাদেশ কি পারবে তার ভার বহন করতে?

ঝ. বিএনপি চেয়ারপারসন কি পারবেন মুক্ত হতে, নাকি একের পর এক রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় কারাগারেই থাকতে হবে তাকে?
ঞ. নির্বাচন হতে না পারলে এর পরবর্তী অবস্থায়ই বা কি দাঁড়াবে?
ট. বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে সরকার কি আগাম নির্বাচন ঘোষণা করবে?

কী ভীষণ অনিশ্চয়তা আমাদের চারপাশ ঘিরে।
বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকারের মাত্রাছাড়া নিপীড়ন, নির্যাতনের খবর এখন প্রাত্যহিক বিষয়। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী যখন ‘রাষ্ট্রীয় খরচে’ নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যস্ত, বিএনপি চেয়ারপারসন সেখানে একটি রাজনৈতিক মামলায় নির্জন কারাবাসে। মামলাটি রাজনৈতিক বলার যুক্তি আছে। মামলাটি করাই হয়েছিল ১/১১ সরকারের সময়, যখন তাদের লক্ষ্য ছিল মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করা অর্থাৎ বৃহৎ দুই দলের নেত্রীর রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানা। সে সময় আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির ১৫টি মামলা দায়ের করা হয়, যার আর্থিক মূল্য ছিল ১৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলো অবশ্য খারিজ হয়ে যায় উচ্চ আদালত থেকে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া যেটিকে বলেছেন ‘জাদুর কাঠির ছোঁয়া’। অন্যদিকে বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে করা ৪টি মামলা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা ৭ হাজার ৫০০টি মামলা ক্ষমতায় এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমিটি করে নির্বাহী আদেশ বলে প্রত্যাহার করা হয় এই বিবেচনায় যে মামলাগুলো দায়ের হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে। আর গত দু’দশকে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৭৮ হাজারের বেশি, যেখানে আসামি করা হয়েছে ১৮ লক্ষ নেতাকর্মীকে। বিএনপি চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে তৃণমূলের একেকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ঝুলছে শতাধিক মামলা। প্রতিদিন মামলা হচ্ছে নতুন নতুন।
জিয়া এতিমখানা মামলাটি দায়ের হয় ঘটনা ঘটার ১৮ বছর পর। এরমধ্যে ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ সরকারও ক্ষমতায় ছিল। কথিত ঘটনার এত বছর পর মামলা দায়ের স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানান প্রশ্নের জন্ম দেয়। ৩২ জন সাক্ষীর কেউ বলেনি বেগম জিয়া কোনোভাবে এই ট্রাস্টের সঙ্গে জড়িত। প্রথমে দুদকের যিনি তদন্ত করেছিলেন তিনিও কোথাও বেগম জিয়ার কোনও সম্পৃক্ততা পাননি। পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়, যিনি হুবহু পূর্ববর্তী কর্মকর্তার রিপোর্টটাই জমা দেন কেবল বেগম খালেদা জিয়ার নাম যুক্ত করে। তাছাড়া মামলাটির ভাগ্য তখনই নির্ধারিত হয়ে গেছে যখন নির্বাহী প্রধান বেগম জিয়াকে উদ্দেশ করে বারবার বলেছেন, ‘এতিমের টাকা মেরে খেয়েছে’ কিংবা ‘পালিয়ে বেড়ান ব্যাপারটা কী?’। অথবা সরকারে থাকা বিরোধী দল বলেছে, ‘১৫ দিনের মধ্যে জেল হবে’। আইনমন্ত্রী স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন, আইনের কারণে কেউ নির্বাচনের বাইরে থাকলে কিছু করার নেই।
বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়া হয়েছে ৫ বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানা। এ ধরনের মামলায় আপিল এডমিশনের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ আদালত জামিন দিয়ে থাকেন। এছাড়াও অন্য যেকোনও বিবেচনায় তিনি তৎক্ষণাৎ জামিন লাভের যোগ্য। এখানেও দেখলাম ব্যতিক্রম। নিম্ন আদালত থেকে নথি চাওয়া হলো আর সময় দেওয়া হলো ১৫ দিন। নথি আসার পর যখন অবশেষে জামিন দেওয়া হলো তখন অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হলো ওনাকে। এখানেই সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন স্পষ্ট হয়ে যায়। জামিনের বিপক্ষে একদিনের মধ্যে আপিল করতে ছুটছে দুদক।
এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট বলেছে কোনও দলকে নির্বাচনে আনতে সমঝোতা করার দায়িত্ব তার নয়। এমন কি আইন মোতাবেক তফসিল ঘোষণার আগে সমতল ক্রীড়াভূমি তৈরির কোনও দায়ও কমিশনের নেই। অবস্থাদৃষ্টে তাই কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়:
১. সরকার জানে কারামুক্ত বিএনপি চেয়ারপারসন অনেক অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই বেগম জিয়াকে মুক্ত করার ঝুঁকি সরকার নিতে চায় না।

২. সরকার মুখে যাই বলুক, সরকারের জন্য অনেক বেশি স্বস্তির হবে বিএনপিমুক্ত নির্বাচন।

৩. সরকারের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে যেকোনও মূল্যে বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা। তবে বিএনপির একটি অংশকে (a fraction of BNP) নির্বাচনে আনতে পারলে সেটি হবে সরকারের বড় বিজয়।

৪. সরকার জানে একজন বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার শক্তি পুরো বিএনপির শক্তির চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে তার আসন অন্য উচ্চতায়। তাই যেকোনও উপায়ে তাকে নির্বাচনে অযোগ্য করা এবং নির্বাচনি প্রচারণা থেকে দূরে রাখা হবে সরকারের লক্ষ্য।

৫. খাদ্যমন্ত্রী কামরুল একবার বলেছিলেন বিএনপির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী। বিএনপি ভাঙতে চেষ্টার কোনও ত্রুটি সরকারের তরফে ছিল না। যদিও তা এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।
সকল ক্ষেত্রেই ভারসাম্য খুব গুরুত্বপূর্ণ, রাজনীতিতে তো বটেই। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় রাজনীতিরই আর ভুগতে হয় রাজনীতিবিদদের। রাজনীতি চলে যায় তৃতীয় শক্তির হাতে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা নাকি মানুষ ইতিহাস থেকে কোনও শিক্ষা নেয় না। না হলে ১/১১-তে রাজনীতি এবং রাজনীতিবিদদের ওপর যা হয়েছে তাতে তাদের অনেক বেশি সাবধান হওয়ার কথা ছিল। অবশ্য যতদিন পর্যন্ত রাজনীতিতে ‘winner takes all’-এর সংস্কৃতি থাকবে, যতদিন পর্যন্ত আমরা ক্ষমতা থেকে ‘safe exit’ নিশ্চিত করতে না পারবো, ততদিন পর্যন্ত এই ভোগান্তি থেকে আমাদের মুক্তি নেই।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 

/এসএএস/এমওএফ/

x