বাংলাদেশের এশা’রা নিরাপদে থাকুক

আফরিন নুসরাত ২৩:০৭ , এপ্রিল ১৩ , ২০১৮

আফরিন নুসরাতগ্রামের ফতোয়া নামের মধ্যযুগীয় প্রথার সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। মানবাধিকারে সচেতন মানুষেরা এই প্রথার বিরুদ্ধে লড়ে এসেছেন অনেক আগে থেকেই। যার ফলে বর্তমান সময়ে কমে এসেছে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বিলুপ্তির পথে এই বর্বর প্রথা হঠাৎ করেই বিভৎস আকার ধারণ করে আবারো সামনে এলো আমাদের। একটি জাতি এবং স্বাধীন দেশ গড়ার প্রত্যয়ের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত যে বিদ্যাপীঠ এবং সেখানে যারা নিজেদের মেধাবী বলে দাবি করেন, সেই শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই শুরু হয়ে গেলো বিলুপ্তপ্রায় অসভ্যতা। তাও আবার নারীশিক্ষার্থীরাই তাদের সতীর্থকে হেনস্তা করে জামাকাপড় ছিড়ে, জুতারমালা পরিয়ে ভিডিও করলো।  তারা একবারও ভাবলো না এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেখানে গণধর্ষণ করেও ধর্ষক ঘুরে বেড়ায় স্বাধীনভাবে, মেয়েরা রাস্তায় হয়রানি হয় প্রতিনিয়ত, সেখানে নিজেরাই নিজেদের তুলে দিলো ধর্ষকদের হাতে অস্ত্র হিসেবে।

পুরো জাতি আজ স্তম্ভিত; বাকরুদ্ধ।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেদিনের ঘটনার যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং আমরা যারা পরে বিস্তারিত জেনেছি, ঘটনার ভয়াবহতা শুনে আমরা সবাই কেঁদেছি। নারীর শত্রু  যে নারী, তা শুধু এতদিন প্রবাদবাক্য সম ভেবেছি, লিখে এসেছি নানান কায়দায়। কিন্তু সেদিনের ঘটনা সবকিছুকেই হার মানিয়েছে।

এবার আসুন জেনে নেই সেদিন আসলে কী হয়েছিলো?

কোটা সংস্কারের আন্দোলনের প্রথম থেকেই আমরা দেখেছি একটি মহল নানান কায়দায় গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কিভাবে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে চেয়েছে এবং এর সঙ্গে যে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিদের প্রত্যক্ষ সাহায্য ছিল তা আজ অনেকটাই স্বচ্ছ। অহিংস আন্দোলনকে জেনে-বুঝেই সহিংস আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং তাদের মূল টার্গেট হয়ে গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রলীগ।  একইসঙ্গে সরকারকে বিতর্কের মুখে ফেলা। প্রথম দিন মৃত্যু গুজব ছড়িয়ে সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভিসির বাড়িতে  একটি মহল যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিলো, তা দেখে সবার বিবেকে নাড়া দিয়েছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে হামলা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

পরের দিন সুপরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে ছেলেদের হলে হলে হামলার ঘটনা ঘটছে বলে একটি সুচিন্তিত মহল গুজব ছড়িয়েছিল। তারা আগের কিছু সহিংসতার ছবি এবং ভিডিও ক্লিপ অনলাইনের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করলেও তা কার্যকর হয়নি। পরের দিন তারা একই ধারাবাহিকতায় এবং অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মেয়েদের হলগুলোকে টার্গেট করে। বেছে নেয় সুফিয়া কামাল হলটিকে। মূলত দু’টো কারণে তারা এই হলটি বেছে নিয়েছিলো।  তা হলো হল শাখা ছাত্রলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং হল শাখার নেত্রীদের সাংগঠনিক দুর্বলতা।

সেদিন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এশা ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যোগদান না করে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে যাওয়া তার নিজের কমিটির কিছু মেয়ের কাছে জবাবদিহিতা চায়।  এই নিয়ে তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় একই কমিটির হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মোর্শেদার। পরে একই ফ্লোরের একটি মেয়ের হঠাৎ চিৎকার দেওয়ায় মোর্শেদা ভাবে কাউকে আক্রমণ করা হয়েছে। সে আগপাছ না ভেবে এবং পূর্বরাগের জের হিসেবে তার রুম থেকে দৌড়ে গিয়ে এশার রুমের জানালার কাচে লাথি মারে। তাতে তার পা কেটে রক্তাক্ত হয় এবং তাকে হাসপাতালে নিয়ে ড্রেসিং করিয়ে আনা হয়, যা সে পরে নিজের জবানিতেই স্বীকার করেছে। সেই ভিডিওটি কে বা কারা পরে অনলাইনে ছড়িয়ে দেয় এবং সেই থেকে নড়া শুরু হয় ষড়যন্ত্রের কলকাঠি। মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তের ছবি প্রথমে ভাইরাল হয়। কী হচ্ছিলো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তবে শুনছিলাম, ছাত্রলীগের মেয়েরা নাকি অত্যাচার শুরু করেছে, কয়েকজন আপুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আপনারা সবাই আমাদের উদ্ধার করুন; হলে আসুন– বলে আহ্বান জানানো হয় বিভিন্ন গ্রুপ থেকে। আন্দোলনকারী ছাত্রলীগের এক নারী নেত্রীর পায়ের রগ কাঁটার কথা বলে পা কাটার ছবিটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল করা হয়। ঘটনা এমনভাবে সাজানো হয় এবং ফেসবুকে এশার নামে ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখান থেকে উষ্কানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি এমনভাবে ঘোলাটে করা হয়, যাতে সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হয় যে, এশার সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও নানান রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে সবাইকে আরও বেশি বিভ্রান্ত করে দিয়েছিল সেদিন। ওইদিকে এই ঘটনাকে পুঁজি করে হলের সাধারণ ছাত্রীদের ভেতর ক্ষোভের সৃষ্টি করে সেই একই চক্রটি। বুঝে না বুঝে সবাই এশার রুমে হামলা করে। তার সঙ্গে থাকা এশার সহকর্মীদের মেরে এশাকে চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে, টানতে টানতে নিচে নিয়ে আসে। কিল-ঘুষি-লাথি এমন কোনও পন্থাই বাদ রাখেনি তারা সেদিন এশাকে হেনস্তা করতে। পরিতাপের বিষয়, সেদিন এগিয়ে আসেনি কোনও হাউজ টিউটরও, যাদের মূল দায়িত্বই হচ্ছে ছাত্রীদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং হলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। এদিকে এশাকে তখন জিম্মি করে প্রতিটি হলে, বিশেষ করে মেয়েদের হলে এই ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিতে তারা সক্ষম হয়েছে এবং ছাত্রলীগের অন্যান্য মেয়েরাও হুমকির মুখে পড়েছিল।

সুফিয়া কামাল হলের সামনে প্রায় ১০ হাজার ছেলে স্লোগান দিতে থাকে এশার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এশাকে বহিষ্কার করার তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় ছাত্রলীগ এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের ভূমিকা নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। তিনি যখন হলে যান তখন পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়নি। এশাকে হ্যান্ড মাইকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। এশা বলে আমি কোনও অপরাধ করিনি। তারপরও সে বলে, আপুরা আমি যদি কোনও অন্যায় করে থাকি আমাকে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন।  স্যারকে সে অনুরোধ করে তার কথার শোনার জন্য, কিন্তু স্যার তার কোনও কথা না শুনে ওই পরিস্থিতিতে তাকে একা ফেলে চলে আসেন ওখান থেকে।  আমার দেখা কোনও অশুভ পরিস্থিতিতে এভাবে অনিরাপদভাবে কোনও ছাত্রকে ফেলে আসতে কোনও শিক্ষক পারে কিনা জানা নেই।

তারপর থেকেই শুরু হয় সেই বিভীষিকাময় নির্যাতন। একটি মেয়ের জামা কাপড় ছিড়ে তাকে জুতারমালা পরিয়ে যে উল্লাস শুরু করে ছাত্রী সমাজ, তাতে নিজের প্রতি ধিক্কারই জন্মে। এই কি সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যার আলো বাতাসে আমিও বেড়ে উঠেছিলাম। এই অশিক্ষার ধারা কিভাবে এখানে প্রবাহিত হলো, আমার জানা নেই। সব অঘটন ঘটে যাওয়ার পরে দুইজন সহকারী প্রক্টর এবং একজন হাউজ টিউটর এশাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন এবং সক্ষম হন। এশাকে বাঁচাতে গেলে সহকারী প্রক্টরদেরও জুতা দিয়ে আঘাত করতে দ্বিধা করেনি সেই মেয়েরা। যেই হাউজ টিউটর এশাকে উদ্ধার করেন, তিনি তার শরীরের উড়না দিয়ে পেঁচিয়ে আনেন জামাবিহীন এশাকে। শুধুমাত্র একজন শিক্ষিকাই এগিয়ে এসেছিলেন। বাকি দুইজন সেখানে উপস্থিত থাকলেও এগিয়ে আসেননি।

জানা যায়, এই অমানবিক, জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল মাত্র গুটিকয়েক মেয়ে।  বাকি সবাই ছিল দর্শক হয়ে। আশ্চর্য লাগে, কেউই এই বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলো না। পরে কথা প্রসঙ্গে জানা গেলো, আসলে তারা নিজেরাও বুঝে উঠতে পারে নাই যে, ঘটনাটি এত খারাপের দিকে যাবে। তারা পরে দুঃখ প্রকাশ করেছিল।

আমরা এশার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাকে দেখতে যাই; শরীরে চাকা চাকা রক্ত জমাট বাঁধার দাগ। জায়গায় জায়গায় মাথার চুল উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হয়েছে, মেয়েটা মেন্টাল ট্রমার ভেতরে আছে। একটু পর পরেই বলছে ‘আমার জামা; আমার জামা’। আমাদের দেখতে হয়েছে তার মায়েরও আর্তনাদ এবং বাবার চোখের পানি। ‘কিভাবে পারলো আমার মেয়েকে এভাবে মারতে; কুকুরের মতো মেরেছে ওরা’– মা বলছেন আর বার বার কেঁদে যাচ্ছেন। জেনেছি,  মেয়েটা সুইসাইড করতে চেয়েছিলো এরমধ্যেই তিনবার। আমার প্রশ্ন হলো, হতে পারে এশার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছে। সেকারণে কেন আপনারা একটি মেয়েকে গুজব ছড়িয়ে এভাবে মধ্যযুগীয় কায়দায় হেনস্তা করবেন। কোনও অন্যায় যদি সে করেও থাকে, তার বিচার প্রশাসন করবে। কিন্তু আপনি বা আপনারা যখন নিজের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে নিলেন, তখন কি নিজের মনে একবারও প্রশ্ন জাগলো না- কেন আপনি একই দোষে দুষ্ট হচ্ছেন। আমার সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গাটি হচ্ছে, কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীকে এভাবে গলায় জুতারমালা পরতে হলো। আপনার কি মনে হলো না সেই মালা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে, একজন নারী হিসেবে আপনার নিজের গলায়ও পরানো হলো। আপনাদের এই জঘন্য কাজ সমাজে কালো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বহুদিন। এই জুতার মালাই এখন ঘুরে ফিরে আমাদের সবার গলাই আসবে। এখন শুধু অপেক্ষার প্রহর…

দেশের নারীবাদের সংজ্ঞা যেন বদলে গিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মুখেও তালা লেগেছে। তাদের প্রতিবাদ ও চিৎকারও ফিল্টার হয়ে গেছে। ভুলে গেলে চলবে না যে, আফগানিস্তানও আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে অনেক প্রগতিশীল একটা রাষ্ট্র ছিল, যেখানে মেয়েরা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতো। কালের পরিক্রমায় আজ তারা অন্ধকারে।  

আপনারাই আমার প্রাণের স্বদেশকে সেই অন্ধকারের পথ দেখালেন আজ। এখন শুধু সময় গড়াবার পালা। এশার প্রতি যে অবিচার আজ হলো, তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এভাবে অশিক্ষার ছোঁয়ায় যেন আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠের মাটি আর কখনও কলঙ্কিত না হয়। বাংলাদেশের সকল এশারাই নিরাপদে থাকুক।   

 

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা

/এসএএস/

x