BPO Summit

১৪২৫: জাগরণের প্রহর

তুষার আবদুল্লাহ ১৪:১১ , এপ্রিল ১৪ , ২০১৮

 

তুষার আবদুল্লাহআমরা কি উৎসব পালন করতে শিখিনি? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সেই ইঙ্গিতই দেয়। আমরা যদি উদযাপন করতে জানতাম, তাহলে তো উৎসবে শাসনের প্রয়োজন হতো না। প্রমাণিত সত্য—উদযাপনে আমরা শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে পারছি না। রমনা বটমূলে ঘটে যাওয়া সতের বছর আগের নৃশংসতা আমাদের বর্ষবরণ উৎসবের বড় ক্ষত হয়ে আছে।  কিন্তু সেই ক্ষতকে জয় করে আমরা বর্ষবরণ উৎসবকে আরও সর্বজনীন করেছি। মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলেই ছড়িয়ে পড়েনি, পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। উদযাপনের বিবর্তনে নতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়েছে, হচ্ছে। বদল এসেছে আচার, পোশাক ও খাবারে।  বিবর্তনের উপসর্গগুলো যে রোগের ইঙ্গিত দিয়েছিল, এই পর্যায়ে এসে সেই রোগের লক্ষণ আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দুরারোগ্যও বলা হচ্ছে একে। রোগের মূল উৎস মাটি থেকে বিচ্যুতি। উৎসবের আঁতুড়ঘর ছিল যে কৃষকের উঠোন বাড়ি, সেখান থেকে পাঁচতারা হোটেল, বিলাসী বিতান হয়ে বর্ষবরণ প্রবেশ করেছে আয়েশী রিসোর্টে। গ্রামীণ মেলা প্রদর্শিত হচ্ছে তারকা খচিত হোটেলের হিমঘরে।  সংক্রান্তি ও বৈশাখের যে অভ্যাসগুলোর সঙ্গে কৃষকের পরিচয় ছিল না, এখন কৃষকের সেই অভ্যাসগুলো হজম করার প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়ার নাম বাজারজাতকরণ। তবে উদযাপনের সরলতা হারিয়ে যাওয়াটাই রোগ প্রকট হওয়ার মূল কারণ।

এক দশক আগেও বর্ষবরণে শহুরে মানুষ বাতাসা, খৈ, জিলাপি, মাটির পুতুল, ঢোল-ডুগডুগি টেনে নিয়ে যেত গ্রামের মেলায়। এখন বর্ষবরণের ছুটি তারা ঈদ বা পূজোর আমেজেই রিসোর্টে কাটাচ্ছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। সন্তানরাও অপরিচিত থেকে যাচ্ছে গ্রাম, মাটির সহজাত অভ্যাসের। বটতলার মেলা, শোলার পাখি তাদের চোখে ওড়ার স্বপ্ন জাগায় না। কারণ, তারা পাড়ি জমিয়েছেন বিত্তের উড়োজাহাজে।

সমাজের যে শ্রেণিটি ভালো ক্রেতা হতে পেরেছে, উদযাপনের রং এখন তারই মন ও শরীরে। এখানে যারা বিশেষ শ্রেণির ক্রেতা তারা আবার জনারণ্যে ভেসে বেড়াতে চান না। তাতে তাদের বিত্তের কল্যাণে ভাটা পড়তে পারে। তারা দূর থেকে অভিজাত আসন থেকেই উৎসবের ভোগে ডুবে থাকেন। তবে জনারণ্যে না এলেও, সেখানে কোনও হট্টগোল হোক, শুদ্ধ আনন্দের উচ্ছ্বাসে ভেঙে পড়ুক বনেদি কাচ, এটি তারা চান না। তাই জন-উৎসবকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চান, করেন। তাদের সেই চাওয়াতে আবার মুড়ি, মুড়কি, কদমা বাড়িয়ে দেয় কতিপয় মতলব গোষ্ঠী। তারা নষ্ট রাজনীতির পক্ষ, বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার প্রতিপক্ষ। তাদের মুড়ির প্রলেপে আছে ধর্ম। বর্ষবরণের উৎসব বাংলার ভূমিপুত্রদের নিজস্ব। মাটি তাকে যে অভ্যাসে গড়ে তুলেছে, সেই অভ্যাসেই ভূমিপুত্ররা বৈশাখকে বরণ করে, বন্দনা করে বর্ষা, অগ্রহায়ণকে। অভিবাদন জানায় বসন্তকে। রাজারা তাদের রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে বৈশাখের প্রথম দিন হালখাতা বা বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছিল। কিন্তু একথাও সত্য, বাঙালির কাছে ষড়ঋতুর প্রতিটি দিনই নতুন করে ধরা দেয়। বাংলা প্রতিটি নতুন ভোরকে স্বাগত জানায় তার মতো করেই। তারপরও আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে এবং সব মত ও মনের মানুষের ঐক্য  ও মিলনের জন্যই বৈশাখের দিনটি বর্ষবরণের দিন বলে উদযাপন করে আসছে বাঙালি হাজার বছর ধরে।

সময় যত গড়িয়েছে, বর্ষবরণ উৎসবের সর্বজনীন হয়ে ওঠা ততই অনিবার্য হয়ে পড়েছে। সমাজ, রাষ্ট্রে বেড়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি, ধর্মীয় দর্শন নিয়ে বিভ্রান্তি, ভুল ব্যাখ্যা প্রকট রূপ নিয়েছে। এতে মানুষের সুন্দর ও সৌন্দর্যের জনসমবেত হওয়ার উপলক্ষগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। এই শক্তিগুলো মানুষের পরিচ্ছন্ন ও শুদ্ধ সম্মিলনকে ভয় পায়। ভীত তারা সর্বজনীন ঐক্যে। তাই তাদের দিক থেকে নানা হুমকি থাকে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের প্রযোজনায় উৎসবকে রক্তাক্ত ও অপবিত্র করার উদ্যোগগুলো আমরা দেখেছি। ভীত হয়েছে। ভীত হওয়ার কারণ, মাটির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, যোগাযোগ আলগা হয়ে গেছে। এঁটেল, দোঁয়াশের পলি মাটির শক্তি ছেড়ে আমরা কংক্রিটে পা রেখেছে। কংক্রিট আমাদের শরীরকে আকঁড়ে ধরে রাখে না। পিছলে চলে যাই। কিন্তু মাটি আমাদের ছাড়ে না। আকঁড়ে ধরে রাখে। সেই মাটি থেকে চ্যুত হয়ে আমরা যেমন সংস্কৃতির শক্তি হারিয়ে বসে আছি, তেমনি ভুলে গেছি কী করে সবাই মিলে উৎসব উদযাপন করা যায়। ভুলে যাওয়ার কারণেই আমাদের ওপর শাসন বাড়ছে। সমাজের ওপর শ্রেণি অবকাশে বর্ষবরণে আয়েশ করছে ঠিকই, কিন্তু বাকি আমমানুষেরা কিন্তু গ্রীষ্মের প্রখর রোদে স্নান করতে চান, হতে চান শুদ্ধ। সেই শুদ্ধ উৎসবে যোগ দিতে আবার জেগে উঠতে হবে সর্বজনীন বাঙালিকে। বাংলার মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও আদিবাসীরা মিলে একযোগে গেয়ে উঠবে উৎসবের গান। আমাদের সেই জেগে ওঠার প্রথম প্রহর হোক ১৪২৫-এর পহেলা বৈশাখ।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এমএনএইচ/

x