‘কালো’ বৈশাখের শক্তি

জোবাইদা নাসরীন ১৪:৩৯ , এপ্রিল ১৪ , ২০১৮

 

 

জোবাইদা নাসরীনআজ বৈশাখের প্রথম দিন। বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখের আগের দিনের চিত্র প্রতি বছরই প্রায় কাছাকাছি থাকে। বর্ষবরণের নানা রকম আয়োজনে জড়ো হয় বাংলাদেশের ‘মধ্যবিত্ত’। দরিদ্ররা কীভাবে বর্ষবরণ করে কিংবা আদৌ এই বর্ষবরণের এই ঢংয়ের সঙ্গে তারা একাত্ম হতে পারে কিনা, সেটি নিয়ে আমাদের আগ্রহ বা ঝোঁক খুবই কম।

তাই এসব অনুষ্ঠান, আয়োজনের শ্রেণিচরিত্র একেবারেই স্পষ্ট। কারণ, মধ্যবিত্তের চাওয়া-পাওয়া বা আকাঙ্ক্ষাকেই ‘জাতি’ বা দেশের ইচ্ছা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবছরই এই বৈশাখের আগে ইলিশের দাম বাড়া নিয়ে হৈ চৈ করে মধ্যবিত্ত, লড়াকু দরিদ্রের প্রতিদিনকার খাবার পান্তার স্বাদ ধনী এবং মধ্যবিত্তরা আয়োজনের মধ্য দিয়ে গ্রহণ করে ‘খাঁটি বাঙালি’ বলে ঢেঁকুর তোলে। ফ্যাশন হাউসগুলোর মনদোলা বিজ্ঞাপন এবং আমাদের সব দিবসের  করপোরেট উদযাপন প্রবণতা সেই দিনটির প্রতি বাড়তি মনোযোগ তৈরি করে। তাই ইদানীং এই বৈশাখ এলেই ব্যাপক কেনাকাটার ধুম পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় এই বৈশাখকে ঘিরে মাসব্যাপী মেলা হয়, ঘুরে নাগরদোলা, আসে পুতুল নাচ। সাদা লাল পোশাকের পসরা মিলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের মোড়ে মোড়ে বসে নারী বিক্রেতারা লাল আর সাদা চুড়ি নিয়ে। আল্পনায় রাঙা হয় রাজপথ। বাংলা মাস সৌর ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে। তাই বাংলা দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। তাই তো সূর্যের আলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রমনা বটমূল থেকে সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসে–‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো...’। একটু পর সেখানে নামে মানুষের ঢল। নানা ধরনের মুখোশ আর ফেস্টুনে বের হয় নববর্ষের সবচেয়ে বড় র‌্যালি, যা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিতি পেয়েছে এবং যা ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। শুধু ঢাকা শহরেই না, সমতলের বাইরে পাহাড়েও নেমে বর্ষবরণ উৎসব। পাহাড়ের সবচেয়ে বড় উৎসব বৈসাবির পাজন রং মাখামাখি আর পানি খেলার আনন্দ নিয়ে পাহাড় মাতায়।

সবই হয়তো ঠিক আছে, আগের মতোই। রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডল থেকে খুব বেশি পরিবর্তন নেই, শুধু কয়েকটি নির্দেশনা ছাড়া। দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার অনুষ্ঠান সন্ধ্যার আগে শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ। মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখোশ দিয়ে মুখ ঢাকা ও ভুভুজেলার মতো তীব্র শব্দ তৈরির যন্ত্রের ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আয়োজকদের নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি সম্ভব হলে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর তাগাদাও দিয়েছে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী। বলা হয়েছে কোনও নারী যেন বর্ষবরণের আয়োজনে যৌন নিপীড়নের শিকার না হন, এটি নিশ্চিত করতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এই নির্দেশনার সঙ্গে এই তর্ক পাড়তে চাই যে সন্ধ্যার  আগে মানুষ ঘরে ঢুকানোর সঙ্গে নারী নিপীড়নের সম্পর্ক নেই। কারণ, বেশিরভাগ যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো ঘটেছে দিনের বেলাতেই। তাই দিন রাত আসলেই কোনও অর্থ বহন করে না, যতটা অর্থ বহন করে রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

এর বাইরে, এই বছরের বর্ষবরণ নানা কারণেই অন্যান্য বছর থেকে একটু ব্যতিক্রম। বৈশাখের আগের দিন পর্যন্ত বিপণি বিতানগুলোতে ভিড় ছিল না তেমন, কোলাহলও নেই। পহেলা বৈশাখের আগের দিন অনেকটাই ফাঁকা ঢাকার মূল কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথমত এইবারের পহেলা বৈশাখ পড়েছে ছুটির দিনে, আর একসঙ্গে তিন দিন বন্ধ পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেকেই চলে গেছে  বাড়িতে। তাদের বাড়িতে যাওয়ার কারণও ছিল হয়তো। গত সপ্তাহজুড়ে সারা দিন রাত আন্দোলনে থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা চিন্তিত ছিলেন, শিক্ষার্থীদেরও দরকার বিশ্রামের। এতদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউমার্কেট  ছিল স্লোগানে, আন্দোলনে নিমজ্জিত। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আপাত থেমে গেছে আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা ফিরে গেছে ঘরে, হলে।  কিন্তু তাদের মন থেকে কাটেনি ভয়, পুলিশি হামলার অভিজ্ঞতা। তারা ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। তাই পহেলা বৈশাখ নিয়ে তারা অন্যান্য বছরের মতো আপ্লুত নয়। অন্তত আমার বিভাগের ছেলেমেয়েরা তো নয়ই। তারা বৃহস্পতিবার বিভাগে এসে বলে গেছে এ বছর পহেলা বৈশাখ পালন করবে না। আমরা  তাদের অন্যান্য আবদার মানার মতোই মেনে নিয়েছি তাদের এই অনাগ্রহ এবং সুচিন্তিত বর্জন কর্মসূচিকে। আমাদের এক ধরনের স্বস্তি দিয়েছে তাদের এই চিন্তা। তারা বলেছে তারা এই বছর ‘কালো বৈশাখ’ করবে, যে বৈশাখ হবে না উদযাপনের, এই বৈশাখ বরণ হবে কষ্টের ক্ষত নিয়ে, সেটি অন্যান্যবারের মতো আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়ে নয়।

মেয়েদের হলের চিত্রও ব্যতিক্রম ছিল না। আমার হলে প্রথম দিন খাবারের কুপন দিতে এসে দেখি মেয়েরা বলেছে কুপন নেবে না। তারা বৈশাখের বিশেষ খাবার খাবে না। বলছে, তাদের খাবারে মন নেই। তারা বিশেষ খাবার গ্রহণের মতো মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে। তারা আন্দোলন পরিচালনায় এবং অংশগ্রহণে ভীষণ ক্লান্ত। এমন পহেলা বৈশাখ তাদের জীবনে আর আসেনি। আমার মনে আছে, আমরা সেই সময় ছোট। একবার পার্বত্য চট্টগ্রামেও বৈসাবি বর্জন করা হয়েছিল। ১৯৯২ সালের ১০ এপ্রিল খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাং-এ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্মরণকালের বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত হয়। সেই বছর ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বর্জন করা হয়েছিল বৈসাবি।

গত সোমবার থেকে সারা বাংলাদেশে কর্মসূচি দেওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দফায় দফায় পুলিশি হামলা, টিয়ারসেলের আক্রমণ, উপাচার্যের বাড়ি ভাঙচুর, ছাত্রলীগের হামলা, সরকারি ঘোষণা, আন্দোলনে বিভক্তি, দুই মন্ত্রীর বক্তব্য সবকিছুর পর কোটাহীনতায় থেমেছে। মনে খচখচ নিয়ে আন্দোলনকারীরা আন্দোলন থামিয়েছেন কিন্তু বৈশাখমুখী নিজেদের হয়তো করতে পারেননি। তারা তাদের মতো করে ‘কালো বৈশাখ’ করছে। 

মেঘ কালো, মন ভালো নেই। দু’ একবার ‘কাল বৈশাখী’ হাওয়া দিয়ে গেছে মাত্র। ভয়াল রূপ এখনও দেখায়নি। কালো মন নিয়ে বর্ষবরণের রূপ ভিন্ন হলেও রুদ্র বৈশাখ এদেশের সহজ সাদামাটা সংগ্রামী মানুষদের জীবনে নিয়ে আসবে নব জীবনের সম্ভাবনা। বৈশাখী ঝড় মন শান্ত করা, ভালো করা জীবন নিয়েই সামনে দাঁড়াবে, আর আমরা উচ্চস্বরে বলবো জীবনের সপক্ষে কিছু না কিছু ঘটবেই। শুভ নববর্ষ ২০২৫।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

/এমএনএইচ/চেক-এমওএফ/

x