গোয়েবলস এ যুগে অচল

গোলাম মোর্তোজা ১৩:১৭ , মে ১৪ , ২০১৮

গোলাম মোর্তোজাহিটলারের গোয়েবলস অসত্যকে সত্যে পরিণত করার তত্ত্বে সফল হয়েছিলেন। হয়তো পৃথিবীতে তার আগেও এই তত্ত্ব ছিল। তবে তা প্রতিষ্ঠিত করে ইতিহাসে টিকে আছেন গোয়েবলস। ক্ষমতাবানদের কাছে এই তত্ত্বটি সবসময় জনপ্রিয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে আপনার গ্রামের মাতুব্বর, যার যার মতো করে গোয়েবলসীয় তত্ত্ব চর্চা করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই তত্ত্ব ক্রমেই তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। মানুষের তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হচ্ছে, গোয়েবলসীয় তত্ত্বের কার্যকারিতা ততই কমছে। বর্তমান পৃথিবীতে গোয়েবলসীয় তত্ত্বের কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। অনেকেই দ্বিমত পোষণ করবেন। বলবেন, মানুষ যেসব উৎস থেকে তথ্য পায়, সেই সব উৎসেও গোয়েবলসীয় তত্ত্বের ব্যবহার হতে দেখা যায়। অর্থাৎ অসত্য, সত্যের মতো করে মানুষের সামনে আনা হয়। অজান্তেই মানুষ অসত্যকে সত্য মনে করে বা দ্বিধা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়। এই যুক্তিতে যুক্তি আছে, সত্যতা আছে। তার চেয়ে বেশি যুক্তি আছে, সত্যতা আছে- সত্য-অসত্য দুটোই যখন সামনে আসে, তখন মানুষ কোনটা সত্য, তা বুঝতে পারে। বিভ্রান্ত হয় সাময়িকভাবে। খুব অল্প সময়ে সত্যের কাছে অসত্য পরাজিত হয়। অর্থাৎ অসত্যকে সত্য হিসেবে বর্তমান যুগে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আলোচনা করা যায়।

১. ‘জীবাণু অস্ত্র আছে’–এই যুক্তিতে ইরাক ধ্বংস করে দিলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ। গোয়েবলসীয় তত্ত্বের প্রয়োগ করে বারবার এই তথ্য পৃথিবীর মানুষকে জানানো হয়েছিল। সাজানো-গোছানো দেশ ইরাক আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেওয়া গেলেও, গোয়েবলসীয় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি। অর্থাৎ মানুষের এই তথ্য জানতে খুব বেশি সময় লাগেনি, জীবাণু অস্ত্রের বিষয়টি ছিল অসত্য প্রচারণা-প্রপাগান্ডা। একথাও সত্যি যে পৃথিবীর বড় বড় গণমাধ্যম এই প্রপাগান্ডায় অংশ নিয়েছিল।

কিন্তু প্রকৃত সত্য মানুষ নানা উৎস থেকে জেনে গিয়েছিল।

গোয়েবলস যখন তত্ত্ব প্রচার শুরু করেছিলেন, তখন এত সহজে সত্য জানার সুযোগ ছিল না। ফলে তখন অসত্যকে সত্যে পরিণত করা যেত।

২. সিরিয়ায় আক্রমণের সময়ও গোয়েবলসীয় তত্ত্বের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যে জানা গেছে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনে সিরিয়ায় আক্রমণ করা হয়েছে, তা সত্য নয়। বিদ্রোহী তৈরি হয়নি, বিদ্রোহী বানানো হয়েছে। আইএসের ক্ষেত্রেও গোয়েবলসীয় তত্ত্ব কাজ করেনি। আইএসও তৈরি করা হয়েছে। যেভাবে মার্কিনিরা তালেবান, আলকায়েদা, লাদেনদের তৈরি করেছিল। সব সত্যই মানুষ জেনেছে। অসত্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।

৩. সাম্প্রতিক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে বলা হলো জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন। সরকার তার সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে তা প্রমাণের চেষ্টা করলো। গণমাধ্যমের একটা অংশ এ কাজে ব্যবহৃত হলো। কিন্তু প্রমাণিত হলো না যে কোটা সংস্কার আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন।

কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে মাঝরাতে তিনজন শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হলো। যখন মেয়েদের বের করে দেওয়া হচ্ছিল, তখন উপাচার্য গণমাধ্যমকে বলছিলেন এসব ‘গুজব’। সত্যকে অসত্য বা অসত্যকে সত্য– কোনোটাই করা যায়নি। সত্যটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাতে ‘গুজব’ বললেও সকালে উপাচার্য বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীকে তাদের অভিভাবকের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে’। ‘বের করে’ দেওয়ার তথ্য একটু ঘুরিয়ে ‘অভিভাবকের কাছে’ দেওয়ার কথা বললেও ‘গুজব’ বলে সত্য আড়াল করা যায়নি। এটা গোয়েবলসের যুগে সম্ভব ছিল, বর্তমান যুগে সম্ভব নয়।

যেভাবে একজন মারা যাওয়ার ‘গুজব’ প্রতিষ্ঠা পায়নি, ‘রগ কাটা’র গল্পও সত্যে পরিণত হয়নি। এত কিছুর মধ্য দিয়েও সত্য ঠিকই প্রকাশিত হয়েছে। মেয়েদেরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে নিপীড়িত-নির্যাতিত, তা আরও একবার বেরিয়ে এসেছে।

৪. বর্তমান যুগে গোয়েবলসীয় তত্ত্বের আরও একটি তাৎপর্য লক্ষণীয়। এই তত্ত্ব এখন শুধু ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাবানরাই প্রয়োগ করেন না, সাধারণ বা নিপীড়িতরাও প্রয়োগ করেন, যা ক্ষমতাবানদের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। যেমন ক্ষমতাবানরা বললেন, ‘জামায়াত-শিবির’ কিন্তু ‘মারা যাওয়া’, ‘রগ কাটা’ গুজবে তা ঢাকা পড়ে গেলো। ক্ষমতাসীনদের গোয়েবলসীয় তত্ত্ব জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হলো, তাদের বিরুদ্ধের তত্ত্ব বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হলো। প্রমাণিত হলো পরিকল্পিতভাবে অসত্য প্রপাগান্ডা দিয়ে সত্য আড়াল করতে গেলে, অসত্য প্রপাগান্ডার ফাঁদে নিজেদেরই পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। হিটলারের সময়ে সে সম্ভাবনা ছিল না। ফলে অসত্য প্রপাগান্ডা বা গোয়েবলসীয় তত্ত্বের আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের অপকর্ম করা এখন প্রায় অসম্ভব। দিন দিন যা আরও অসম্ভব হয়ে উঠবে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

 

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

x