জয়তু বাংলা ট্রিবিউন!

রেজানুর রহমান ১২:৫৯ , মে ১৫ , ২০১৮

রেজানুর রহমানচিলমারী থেকে একজন ফোন করেছেন। আমি তাকে চিনি না। সম্ভবত তিনিও আমাকে চেনেন না। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আপনি কি রেজানুর রহমান? ভদ্রলোকের প্রশ্ন করার ধরন মোটেও সুবিধার নয়। তার কথায় শাসানো ভঙ্গি। ভাবলাম এই লোকের সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবে না। পরক্ষণেই মনে হলো ভদ্রলোক কী বলতে চান, শুনেই দেখি। এমনও হতে পারে, তার বলার ভঙ্গিটাই এমন।
ভদ্রলোক আবার প্রশ্ন করলেন, ভাই শুনতে পাচ্ছেন?
হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি বলেন...
আপনি কি রেজানুর রহমান?
জি, কেন বলেন তো?
ভদ্রলোক হঠাৎ কণ্ঠ নরম করে সালাম দিয়ে বললেন, ভাই বাংলা ট্রিবিউনে আপনার একটা লেখা পড়লাম। খুব ভালো লাগলো। অনেক কষ্টে আপনার ফোন নম্বর জোগাড় করেছি। ফোনে বিরক্ত করলাম না তো?
আমি যারপরনাই অবাক। কারণ, বাংলা ট্রিবিউনে আমার লেখালেখির বয়স খুবই কম। একদিন এক অনুষ্ঠানে বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেলের সঙ্গে দেখা। জুলফিকার আমার সাংবাদিকতা জীবনের অনেক কাছের মানুষ। বোধকরি সে কারণে সেদিন জুলফিকারের কাছে কথাটা তুলেছিলাম- ‘তোমাদের বাংলা ট্রিবিউনে লিখতে চাই’।
জুলফিকারের সহজ-সরল উত্তর- অবশ্যই লিখবেন। কালই লেখা পাঠিয়ে দিন। কাল মানে তো পরের দিন। কিন্তু পরের দিন লেখা দিতে পারলাম না। কয়েকদিন পর লেখা পাঠালাম বাংলা ট্রিবিউনে। লেখা প্রকাশ হলো। কিন্তু ফেসবুকে share দিতে ভুলে গেছি। ঠিক ভুলে গেছি বলাটা ঠিক নয়। কারণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অর্থাৎ অনলাইন প্রচার মাধ্যমে ওই প্রথম আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। সে কারণে নিজের ফেসবুক ওয়ালে লেখা share করার অভ্যাস রপ্ত হয়নি। ওই দিনই প্রিয় সম্পাদক জুলফিকার রাসেলের ফোন পেলাম, ভাই আপনার লেখাটা ফেসবুকে share দেন...।
ফেসবুকে লেখাটি share দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ময়কর এক ঘটনা লক্ষ করলাম। আমার ফেসবুক ওয়ালে সমানে লাইক আর কমেন্টস আসতে থাকলো। কাউকেই আমি চিনি না। অথচ আমার লেখা নিয়ে মন্তব্য করছেন। ব্যাপারটা আমার কাছে এক ধরনের জাদুর মতোই মনে হলো। একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে অনলাইন প্রচার মাধ্যমে, তাই দেখে যেন একের পর এক হাততালি দিয়েই চলেছেন দর্শক। ব্যাপারটা দারুণ তো। সেই থেকে বাংলা ট্রিবিউনে নিয়মিত লেখার একটা তাড়না অনুভব করলাম। এমনও হতে থাকলো, লেখার বিষয়বস্তু খুঁজে খুঁজে হয়রান হচ্ছি। পুরো লেখা লিখেও তা বাংলা ট্রিবিউনে পাঠাইনি। কারণ, ততদিনে বাংলা ট্রিবিউনে আমার লেখার পাঠকদের আমি শনাক্ত করতে পেরেছি। পাঠক কী পছন্দ করেন। কী পছন্দ করেন না, তা মোটামুটি বুঝে ফেলেছি। বাংলা ট্রিবিউনে লেখা প্রকাশের পর সমানে যখন লাইক আর কমেন্টস আসতে থাকে, তখন বিস্ময়কর এক ভালোলাগা পেয়ে বসে। প্রযুক্তি কোথায় নিয়ে গেছে পৃথিবীকে। একটি লেখা প্রকাশের পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমানে লাইক আর কমেন্টস আসছে। এ তো সত্যি জাদুরে ভাই!
তার মানে কী দাঁড়ালো? যুগটাই কি তাহলে বদলে গেলো? হ্যাঁ, যুগটাই তো বদলে গেছে। কেউ কি কোনও দিন ভেবেছিল পত্রিকাও বদলে যাবে? কাগজের পত্রিকার বদলে আসবে নতুন ধরনের পত্রিকা। যখন খুশি, তখন তা পড়া যাবে? কাগজের পত্রিকা তো বের হয় সাধারণত ২৪ ঘণ্টায় একবার। আর তথ্য প্রযুক্তির এই পত্রিকা দিনের ২৪ ঘণ্টাই উন্মুক্ত থাকে। অনেকটা টেলিভিশনের মতো। বিশ্বের কোথাও কিছু ঘটেছে, কাগজের পত্রিকায় তা নির্দিষ্ট সময়ের আগে পাওয়া মুশকিল। আর তথ্য প্রযুক্তির পত্রিকায় যখন ঘটনা, তখনই সংবাদ। সে কারণে একটা প্রশ্ন জটিল হয়ে পড়েছে, তা হলো, কাগজের পত্রিকার দিন কি তাহলে শেষ হতে চললো?
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করি। কাগজের পত্রিকায়ও আমার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। কিন্তু সবক্ষেত্রে ফিডব্যাক একই রকম নয়। অবশ্য, বর্তমানে প্রায় সব পত্রিকারই অনলাইন সংস্করণ আছে। প্রায়শই দেখি কাগজের পত্রিকায় একটি লেখা প্রকাশের পর যতটা না সাড়া পাই, তারচেয়ে বেশি সাড়া পাই যখন তা অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়। অবশ্যই বর্তমানে অধিকাংশ দৈনিক পত্রিকার কাগজ সংস্করণ প্রকাশের আগেই তার অনেক বিষয়বস্তু অনলাইন সংস্করণে ছাপা হয়ে যায়। এ থেকেও যে ঝুঁকির কথাটাই উঠে আসে- তাহলে কাগজের পত্রিকার ভবিষ্যৎ কী? এই বিতর্কের গভীরে যাওয়া দরকার। কিন্তু এই লেখায় সেটা সম্ভব নয়। সময় প্রমাণ করবে কাগজের পত্রিকা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির পত্রিকা নিয়েও।
বাংলা ট্রিবিউনসহ বেশ কয়েকটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল পাঠকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলা ট্রিবিউনে লেখার সুবাদে বুঝতে পারি, এটি পাঠকের কাছে কতটা জনপ্রিয়। কয়েকদিন আগে পেশাগত কাজে উত্তরবঙ্গের একটি শহরে গিয়েছিলাম। দুপুরে একটি পরিবার থেকে খাবারের আমন্ত্রণ এলো। খাবার খেতে গিয়ে স্মরণীয় ঘটনার মুখোমুখি হলাম। ওই পরিবারের তিনজন তরুণ সদস্যই বাংলা ট্রিবিউনের নিয়মিত পাঠক। তারা আমার লেখাও পড়ে। আমি তাদের বাসায় দুপুরে খেতে যাবো শুনে বন্ধুদের আসতে বলেছে। দেখলাম জনাদশেক তরুণ-তরুণী একজোট হয়েছে আমার সঙ্গে কথা বলতে। বলা বাহুল্য ওরা কেউই কাগজের পত্রিকার নিয়মিত পাঠক নয়। সবাই অনলাইন পত্রিকার পাঠক। ওরাই একটা সমস্যার কথা তুলে ধরলো।
সমস্যাটা হলো অনলাইন পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। বাংলা ট্রিবিউনের ব্যাপারে ওরা বেশ পজিটিভ। আরও কয়েকটি অনলাইন পোর্টালের প্রশংসা করলো। কিন্তু সমালোচনা উঠলো কিছু অনলাইন মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে। তাদের ভাষায়- ‘ওই পত্রিকাগুলোয় এমন সব খবর প্রকাশিত হয়, যার কোনও ভিত্তি নেই।’ উদাহরণ দিতে গিয়ে ভারতের আইপিএলের প্রসঙ্গ তুলে একজন বললো, ‘একটি অনলাইন মিডিয়ায় খবর বের হলো ‘এক ওভারে সাকিবের তিন উইকেট লাভ। খবরটি পড়ে তো আমরা আনন্দে হৈ চৈ শুরু করে দিলাম। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি খবরটি ভুয়া’। বিশিষ্ট খল অভিনেতা ডিপজলের প্রসঙ্গ তুলে একজন বললো, ‘একটি মিডিয়ায় ডিপজলের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হলো। অথচ ডিপজল এখনও বেঁচে আছেন।’ এ ধরনের আরও অনেক অভিযোগ ছিল তাদের। প্রশ্ন করেছিলাম, তোমরা কাগজের পত্রিকা পড়ো না কেন? তারা অভিন্ন উত্তর দিলো- কাগজের পত্রিকায় অনেক বাসি খবর প্রকাশিত হয়। তাই কাগজের পত্রিকা আমাদের তেমন টানে না।
আমি অবশ্য ওই তরুণদের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। কারণ, আমার ধারণা কাগজের পত্রিকার নতুন দিন আসন্ন। ভিসিআর যখন আবিষ্কার হলো, তখন বলা হয়েছিল চলচ্চিত্র বুঝি শেষ হতে চললো। কিন্তু ভিসিআরই নিজে নিঃশেষ হয়ে গেছে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির পত্রিকার সঙ্গে কাগজের পত্রিকার সেই তুলনা করা বোধকরি ঠিক হবে না। অন্তত আমাদের এই উপমহাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির পত্রিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাগজের পত্রিকাও সমান তালে এগিয়ে যাবে আমার বিশ্বাস। তবে হ্যাঁ, কাগজের অনেক পত্রিকার চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির পত্রিকা অনেকটাই এগিয়ে থাকবে। যেমন এগিয়ে আছে বাংলা ট্রিবিউন। এই লেখাটির প্রয়োজনে কিছু পাঠকের সঙ্গে কথা বলেছি আমি। প্রশ্ন ছিল- কেন বাংলা ট্রিবিউন পড়েন? সবার অভিন্ন উত্তর- বাংলা ট্রিবিউন অত্যন্ত রুচিশীল ও বস্তুনিষ্ঠ একটি সংবাদমাধ্যম। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে থাকলে বস্তুনিষ্ঠ খবর পাওয়া যায়, দেশের প্রতি ভক্তি বাড়ে, ভালো কাজে উৎসাহ সৃষ্টি হয়।
বাংলা ট্রিবিউনের জন্মদিনে পাঠকের এই বিশ্বাসের কথাগুলো দারুণ শক্তি জোগাচ্ছে। জয়তু বাংলা ট্রিবিউন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো   

/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

x