মহাকাশে দেশ, পদতলে জীবন

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ১৪:১১ , মে ১৬ , ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাবাংলার নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের আনন্দের রেশ এখনও আছে। একই সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ও মুখরিত। উন্নয়ন আমাদের হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির বিকশিত পথে হাঁটছি। এসবই সত্যি। কিন্তু এক অন্যরকম সত্য তখনই আমাদের হৃদয়ে আঘাত হেনেছে। সোমবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি ইস্পাত কারখানার পক্ষ থেকে ইফতারসামগ্রী বিতরণের সময় হুড়োহুড়ি শুরু হলে পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে নয়জন নিহত হয়েছেন। নিহত সবাই নারী ও শিশু।
সরকার হয়তো এরপর আদেশ দিয়ে এ ধরনের যাকাত দেওয়ার প্রথা বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু ভাগ্যাহত দরিদ্র মানুষ যেভাবে সামান্য কিছু সামগ্রীর জন্য একটি বাড়িতে গিয়ে জীবন দিল, তার গভীরে কি যাওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে? আমরাতো উন্নয়নকে আরও বড় করে দেখতে চাই, যেখানে উন্নয়ন মানে সার্বিকভাবে জীবনযাত্রার মানের উন্নতি। সেটা যে গড় মাথাপিছু আয় বা প্রবৃদ্ধি বাড়া শুধু নয়, চট্টগ্রামের ঘটনা কি কিছুটা হলেও সেই নির্দেশনা দেয়?

দেশের মানুষের চাহিদা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়ণের প্রচেষ্টাই রাজনীতি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তহীন বৈরিতার কারণে দলগুলো জনস্বার্থের প্রতি মনোযোগী নয়, দ্বন্দ্ব নিয়েই ব্যস্ত। এদিক থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক ব্যতিক্রম। তিনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর বিবাদের সংস্কৃতির মাঝেও উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন এবং দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্প হাতে নেন, বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। আর এ কারণেই দেশের মানুষ আগে যা ভাবেনি, তা আজ দেখছে। দেশের অভ্যন্তরে বড় বড় প্রকল্পতো আছেই, বাংলার নাম আজ মহাকাশেও।
কিন্তু ঠিক এমন সময়ে যদি সাহায্য নিতে গিয়ে এমন করে মানুষ পদতলে জীবন দেয়, তবে ভাবতেই হয় সমস্যা অনেক গভীরে।
কোন দৃষ্টিতে দেখছি সেটি এক বড় প্রশ্ন। শুধু আয় বৃদ্ধি আর বড় প্রকল্প দিয়ে দেখার ভঙ্গিটাই হয়তো গোলমেলে। এটা একটা পুরনো সংস্কৃতি। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থাটাই এমন। আমরা সংসদ সদস্যদের যতটা না আইন প্রণেতা হিসেবে দেখি, তার চেয়ে বেশি দেখতে চাই রাস্তা-ঘাটের নির্মাতা হিসেবে। আমরা কর্মসংস্থানের সযোগ তৈরি করতে পারছি কিনা, আমাদের মানুষের জীবনকুশলতার মান কী, সে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই কোনও আলোচনা নেই। কেবল আয়বৃদ্ধি বা প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও যে, জীবনযাত্রার সার্বিক উন্নতির জন্য বহু কাজ করা সম্ভব তা হয়তো ভাবছি না।
প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়ন কীসের জন্য? প্রবৃদ্ধি বাড়লো, মাথাপিছু আয় বাড়লো; অথচ কর্মসংস্থান হলো কম। কিংবা দুর্নীতি হচ্ছে অনেক বেশি। আর এসব সমস্যা সমাধানের কোনও উদ্যোগও দৃশ্যমান নয় সেভাবে। ঠিক এ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। এটি বড় ভাবনার জায়গা, চিন্তার বিষয়। বহু মানুষ অনেক বেশি অর্থবিত্তের মালিক বনে গেছে, কিন্তু বহু মানুষের আর্থিক সঙ্গতি কমছে। গড়ে গিয়ে হিসাব উপরের দিকে ঠিকই, তবে আমাদের মাঝে অসাম্য অনেক অনেক সম্প্রসারিত।
যখনই আয়ের দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে, তখনই বৈষম্য বেড়ে যায়। এই বৈষম্য বা অসাম্য নিয়ে বিভ্রান্তিও অনেক। অর্থনীতির বড় কাজ সম্পদ সৃষ্টি করা। কিন্তু সঙ্গে থাকে সম্পদ বণ্টনের প্রশ্ন। আমরা এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বা ইনক্লুসিভ গ্রোথ কথাটা বেশি করে শুনছি। কিন্তু এর ব্যাখ্যা কী? এক হতে পারে এমন যে, সমাজের প্রত্যেক মানুষ একটি ন্যূনতম জীবনধারণের মান অর্জন করবে, যেমন কেউ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে না, সেই সীমা যেভাবেই নির্ধারিত হোক না কেন।

সাম্য মানে সকলের আয়ের সমতা নয়। কিন্তু বৈষম্য দূর করতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিকাঠামো, আইনশৃঙ্খলা, আর্থিক সম্পদ, বিপণনের ব্যবস্থা, প্রযুক্তির জগতকে সবার নাগালে নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ সব মানুষের সুযোগের সাম্য থাকুক, আয়ের সাম্য না থাকলেও।
উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ অনেক গ্রাম বড় হয়েছে, অনেকে শহরের মধ্যে ঢুকে গেছে। রাস্তাঘাটের উন্নতির ফলে বড় গ্রামগুলো খুব দ্রুত শহরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেখানকার শ্রমজীবী মানুষ কৃষি ছেড়ে নির্মাণশিল্প, হোটেল, পরিবহন, হাটবাজারের মতো নানা ক্ষেত্রে কাজ পেয়েছেন। ছোট গ্রামগুলোতে এই সুযোগ অনেক কম। ফলে, বড় গ্রামের সঙ্গে ছোট গ্রামের বৈষম্য বেড়েছে। উন্নয়ন তার পরিধিতে ক্রমশই বৃহত্তর এলাকাকে ঢুকিয়ে নেয়, কিন্তু তার বাইরের এলাকাগুলো তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়ে। ফলে, সাময়িকভাবে বৈষম্য বাড়ছে।
মানুষের কাজ চাই। কাজের অনেক অভাব। কল্যাণ রাষ্ট্রে মানুষ বেকার থাকলেও এমন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে যে বেকারদেরও কিছু আয়ের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত না হয়েও উন্নয়নের সুফল কিছুটা হলেও ভোগ করতে পারেন। যে মানুষগুলো এই সামান্য ইফতার সামগ্রী আনতে গিয়ে এমনভাবে মারা গেলো, তারা উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হলেও, উন্নয়নের ফলাফলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
ক্ষমতার অলিন্দে যাদের বাস তারা এসব হয়তো ধরতে পারেন না। এ সমাজে কত যে ক্ষত রয়েছে, চট্টগ্রামের ঘটনা তার প্রমাণ। গত বছর এই শহরেই একজন প্রয়াত মেয়রের কুলখানিতেও খাবার নিতে গিয়ে বেশ ক’জন মানুষ পদতলে মরেছেন। আমরা উন্নতি করছি, উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু উন্নয়নকে বড় অর্থে দেখার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। মাথাপিছু আয়, প্রকল্প আর প্রবৃদ্ধির ছোট খাঁচা থেকে বেরিয়ে গিয়ে মানুষের প্রেক্ষাপট থেকে দেখার অভ্যাস গড়ে উঠুক।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলাডটনেট

/এসএএস/

x