ট্রাম্প-কিমের সিঙ্গাপুর বৈঠক কতটা সফল?

আনিস আলমগীর ১৭:৩৪ , জুন ১২ , ২০১৮

আনিস আলমগীরতারা পরস্পরকে গালি দিয়েছেন ক’দিন আগেও। পারমাণবিক বোমার বোতাম টিপে একে অন্যের দেশ ধ্বংস করার হুমকিও দিয়েছেন। কিন্তু আজ মঙ্গলবার (১২ জুন) হাসি হাসি মুখে সিঙ্গাপুরের সেন্টোসা দ্বীপের পাঁচতারা হোটেল ‘ক্যাপেলায়’ উভয়ে ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন। একসঙ্গে খেয়েছেন। আর ট্রাম্প বলেছেন, ‘চেয়ারম্যান কিমের সঙ্গে আমার বৈঠক আন্তরিক, গঠনমূলক আর খোলামেলা ছিল।’
দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের এই বৈঠক ছিল উষ্ণ। যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিন আগে কানাডায় জি সেভেন বৈঠকে অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের সঙ্গে করমর্দন করেননি ও জাস্টিন ট্রুডোকে ‘দুর্বল’, অসৎ বলেছেন; সেই ট্রাম্প এমন একজনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যিনি নিজ পরিবারের মানুষ হত্যা করেন, পুরো কোরিয়ান উপদ্বীপ এলাকার খলনায়ক। ফলে এটি উত্তর কোরিয়ার দিক থেকে বড় ধরনের কূটনৈতিক বিজয়। আর ট্রাম্পের দিক থেকে ইতিহাস- গত ৭০ বছরের মাঝে এই প্রথম কোনও উত্তর কোরিয়ান প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীন কোনও আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎ হলো।

বৈঠক কি ফলপ্রসূ হয়েছে? কঠিন প্রশ্ন। যা দেখলাম, কিম উনকে পুরো বৈঠক নিয়ে অতটা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে বাধ্য ছেলের মতো হাঁটছেন ট্রাম্পের সঙ্গে। তবে ট্রাম্প ছিলেন খুব সুনিশ্চিত মনোভাবে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ট্রাম্প ও কিমের একান্ত বৈঠকের স্থায়ীত্বকাল ছিল ৩৮ মিনিট।

মিডিয়ার খবরে এরইমধ্যে জানা গেছে, ট্রাম্প-কিম বৈঠকের প্রধান চারটি পয়েন্ট রয়েছে। ১.যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া নতুনভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে, যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হবে।

২.কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে যৌথভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া।

৩. ২৭ এপ্রিল ২০১৮'র পানমুনজাম বিবৃতিতে কোরীয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার রক্ষা করবে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া।

৪.যুক্তরাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া যুদ্ধবন্দিদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে এবং এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দি চিহ্নিত হয়েছেন তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অতিসত্বর শুরু করবে।

সোজা এবং মোদ্দাকথা হচ্ছে এটা একটা সূচনা মাত্র। তবে এর আগে এপ্রিল মাসে দুই কোরিয়া যে চুক্তি করেছিল কিম উন, তার থেকে বেশি কিছু দেননি ট্রাম্পকে। কিমকে সাংবাদিকরা যে প্রশ্ন করেছেন তাতেও বুঝা যায় বিষয়টি। দুই নেতার আলোচনার পর দ্বিতীয়বার যখন তারা হেঁটে যাচ্ছিলেন তখন দুইবার সাংবাদিকরা কিমকে প্রশ্ন করেন, ‘মি. কিম, আপনি কি পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ করবেন?’ কিম কোনোবারই উত্তর দেননি। এরপর কিমকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘আপনি কি আপনার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবেন?’ এই প্রশ্নেরও উত্তর পাননি সাংবাদিকরা। শুধু ট্রাম্পই সাংবাদিকদের জানান যে আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হচ্ছে। ট্রাম্প বৈঠকের আগেও যেমন বলেছেন, এটা তাদের প্রাথমিক বৈঠক। পরেও বলেছেন তারা আরও বসবেন।

১৯৫৩ সালে উভয় কোরিয়ার মাঝে যুদ্ধ বন্ধ হলেও কোনও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। বরং উত্তর কোরিয়ান সীমান্তে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আমেরিকার ক্ষণে ক্ষণে যৌথ সামরিক মহড়া উত্তর কোরিয়াকে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আতঙ্কের মাঝে রেখেছে গত ৭০ বছর। অনুরূপ আতঙ্ক থেকেই গরিব দেশ হওয়ার পরও উত্তর কোরিয়া ব্যয়বহুল পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। এই পদক্ষেপের শুরু উনের পিতা কিম জং ইল থেকে। উন তার পরিপূর্ণতা দান করেছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেছিলেন, নিজের অস্তিত্বের প্রয়োজনে উত্তর কোরিয়াকে ঘাস খেয়ে হলেও তার পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে।

উত্তর কোরিয়া ২০০৬ সালে আনবিক বোমা বানাতে সফল হয়। গভীর মাটির নিচে তারা তার সফল পরীক্ষাও চালিয়েছিলো। ১৯৯৮ সাল থেকে তারা ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টা আরম্ভ করে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র ওই সালেই তারা জাপানের ওপর দিয়ে নিক্ষেপ করেছিলো। প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলের দেশ ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দ্বীপদেশ জাপান ও তাইওয়ান আমেরিকার মিত্রদেশ। এবং আমেরিকার ঘাঁটি রয়েছে এ চার দেশে।

উত্তর কোরিয়ার তরুণ নেতা কিম জং উন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন এবং সফলকামও হন। আবার কিম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে আণবিক বোমা সংযোজন করারও সিদ্ধান্ত নেন। খুব দ্রুততার সঙ্গে তিনি হাইড্রোজন বোমাও তৈরি করেন।

মূলত আমেরিকা উনকে নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা চালানোর জন্য চীন এবং রাশিয়াকে অনুরোধ করে। চীনের বিরাট বাণিজ্য রয়েছে আমেরিকার সঙ্গে। সুতরাং চীন তার বাণিজ্যের স্বার্থে উনকে চীনে ডেকে নিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছিল। উত্তর কোরিয়া চীনের সীমান্তবর্তী দেশ এবং আর্থিক বিষয়ে চীনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ধীরে ধীরে আজকের এ বৈঠকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এই বৈঠকের ব্যাপারে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। মুন জায়ে ইনের লক্ষ্য হচ্ছে দুই কোরিয়াকে এক করা।

কোরিয়ান উপদ্বীপে এখন এক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ হয়েছে। উভয় কোরিয়ার সাধারণ মানুষ এক হয়ে যেতে উৎগ্রীব। দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ এ জন্য রাস্তায় বসে গণপ্রার্থনা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট সঠিকভাবেই বুঝেছেন যে একত্রিত হতে চাইলেই একত্রিত হওয়া যাবে না, যতক্ষণ পিয়ং ইয়ং এবং ওয়াশিংটনের বিরোধ না মিটে। লক্ষ্যপূরণের জন্য মুন জয়ে ইন ট্রাম্পের তোষামোদিও করছেন। ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উচিত এমন কথাও তিনি বলেছেন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ বৈঠকের ব্যাপারে উৎসাহী ছিল। চীন বৃহৎ রাষ্ট্র। কোরিয়া তার প্রতিবেশী ছোট দেশ। বৈঠকের পর তারা যে বিবৃতি দিয়েছে সেটা সন্তোষজনক। তারা বলেছে, এই বৈঠক ‘কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুর একটি রাজনৈতিক সমাধানের’ আশা তৈরি করবে। তবে তারা আরও বলেছেন, ‘অর্ধদিবসের এই বৈঠক যে দুই দেশের বহুদিনের বৈরিতা ও অবিশ্বাসের মানসিকতা মুছে ফেলে সৌহার্দের পথে নিয়ে যাবে তেমনটা কেউ আশা করছেন না। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত উপদ্বীপ গঠন ও আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে উন্নয়নের পথে যাত্রার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও ধৈর্য। এরকম ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন।’

রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখিনি এখনও। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরব উত্তর কোরিয়া সফর করে গেছেন। কিমকে কি পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন তা প্রকাশ হয়নি।

আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব কিমের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকাকে কখনও নিরাপদ মনে করছে না। তাই আমেরিকার অভিপ্রায় হচ্ছে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। ট্রাম্প চান উত্তর কোরিয়ার নিরীক্ষাযোগ্য, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ। আর কিম উনের প্রত্যাশা ছিল যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বন্ধ করবে এবং দেশটিকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেবে।

কিন্তু বৈঠক শেষে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার কোনও প্রত্যাশাই পূরণ করেননি একমাত্র কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক মহড়া বন্ধ করার কথা ছাড়া। ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে। ‘আমরা যখন পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারবো তখনই উত্তর কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে।’ ঘাঁটিও সরিয়ে নিবে না। ট্রাম্প জানিয়েছেন যে স্বাক্ষরিত বিবৃতির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র এখনই সেনাবাহিনী সরিয়ে নেবে না। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা যৌথ সামরিক মহড়া দেওয়া বন্ধ করবে তারা। নিয়মিত এসব সামরিক মহড়ার কারণে ক্ষুব্ধ ছিল উত্তর কোরিয়া।

বিপরীতে আমেরিকার প্রত্যাশা কি পূরণ করবেন কিম উন? এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, ট্রাম্প যেভাবে চান সেটা পূরণ হওয়ার নয়। গত সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ট্রাম্প চাচ্ছে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ যা যাচাইযোগ্য। অর্থাৎ নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে আমেরিকার বা আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার কোরিয়ার অভ্যন্তরে প্রয়োজনে তত্ত্ব-তালাশও করতে পারবে। এ নিরস্ত্রীকরণের অর্থ হবে কোরিয়া থেকে ইউরোনিয়াম ও প্লটোনিয়ামের মজুত সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ করে দেওয়া এবং উত্তর কোরিয়ার বিশাল পার্বত্য এলাকা কঠোর মনিটরিংয়ের মাঝে নিয়ে আসা। আবার একতরফাভাবে এ ধ্বংস প্রক্রিয়া চলবে এবং ধ্বংস প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া কোনও কিছুই পাবে না।

উত্তর কোরিয়া অনুরূপ কোনও একতরফা প্রস্তাব মেনে নেওয়ার নয়। নেবেও কেন! তাদের পরমাণু প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে লিবিয়া বা ইরাকের মতো কোনও পরিণতির শিকার যেন উত্তর কোরিয়া না হয়। চুক্তি বাস্তবায়নে আমেরিকা বিশ্বস্ত নয়। ওবামার আমলের ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি ট্রাম্প বাতিল করেছেন। সরকার পরিবর্তন হলে ট্রাম্পের চুক্তি বাতিল হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়!

আবারও প্রশ্ন আসছে তাহলে আজকের বৈঠক সফল না ব্যর্থ? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সফল। ইতিহাসে এটি সূচনা হিসেবে, সফল বৈঠক হিসেবে স্থান নিলেও চূড়ান্ত ফলাফলের দিক থেকে ব্যর্থ বৈঠক হিসেবে চিহ্নিত হতে সময় লাগবে না। ট্রাম্প থেকে শান্তির বার্তা অপ্রত্যাশিত। কোরিয়ান উপদ্বীপে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ এবং উভয় কোরিয়ার সাধারণ মানুষের একত্রিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও আমেরিকা ভালো চোখে দেখছে না। দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫০ হাজার সৈন্যসহ আমেরিকার ঘাঁটি রয়েছে।  এটা বন্ধ হোক তা কখনও আমেরিকা চাইবে না। সুতরাং ফলপ্রসূ না হলে আমেরিকার জন্যই ভালো। বোমা যতদিন আছে উত্তর কোরিয়ারও আমেরিকাকে ভয়ের কিছু নেই।

লেখক: সাংবাদিক

anisalamgir@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

x