নিমজ্জনের যাত্রী

শেগুফতা শারমিন ১৪:৩৯ , জুন ১৪ , ২০১৮

শেগুফতা শারমিনঅদ্ভুত এক অপ্রগতিশীলতায় ডুবে যাচ্ছে সমাজ, ডুবে যাচ্ছে মানুষ। ক্রমশ নিমজ্জিত হতে চলেছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের দ্বিপেয়ে মনুষ্যসকল। কোথাও কোনও আশা দেখা যায় না, কোথাও আলো নেই। কোথাও মুখ নেই, ভরে গেছে মুখোশে। ঠিক নাক চোখ মুখ মানুষের মতোই দেখতে মুখোশগুলো ঘুরছে ফিরছে চতুর্দিকে, সর্বত্র। মুখোশের আড়ালেই আছে থাবা, আছে বিষদাঁত, আছে হিংস্রতা। সময়মতো, সুযোগ মতো বের হয়ে আসে, কারো বন্দুকের নলে, কারো উন্মুক্ত বক্তৃতায়, কারো কলমে বা কি বোর্ডে। বাতাসের গতি বুঝে শাঁ করে মুখোশের রং পাল্টে যায়।
মানুষের পর মানুষ মরে। লাশের মুখে মুখোশ থাকে না। তাই মরে গেলে মানুষই মরে, মুখোশ মরে না। মরা মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করে মুখোশেরা। বন্দুকযুদ্ধে মানুষ মরলে বাহবা দেয় মুখোশ। একরামুলের ফোনকল প্রকাশ হয়ে পড়লে, তড়িঘড়ি মুখোশের রং পাল্টে যায়। তবু মৃত্যু থামে না। প্রতিদিন লাশ পড়ে, কোথাও না কোথাও । আকণ্ঠ নিমজ্জিত মানুষেরা শান্তিতে ঘুমায়।

রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে ধর্ষিত হয় কেউ। কেউ কেউ সাফাই গেয়ে বলে ভাড়াটে ‘মেয়েমানুষ’! আর বাকি অংশ গণধোলাই দেয়। আইন আইনের পথে না চললে, মানুষ তা হাতে তুলে নেয়, বারবার প্রমাণিত সত্য। এবারও তাই হয়। বাহবা পায় গণধোলাই দেওয়া জনগণ। ধর্ষণের বিচার করার সুযোগ হাতে পেয়ে গণধোলাই দেওয়া জনগণ নিজেদের ‘ভালো’ প্রমাণ করতে নামে। ‘ভালো’ জনগণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কোথায় সীমা কোথাও পরিসীমা ভুলে যায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটা অন্যায় করে ফেলে। বস্তুত দেখা যায়, ন্যায় অন্যায়ের গণ্ডি ভুলে গেছে মানুষ। যে মানুষ ধর্ষক রনির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, সেই মানুষ ভার্চুয়ালি ধর্ষণ করে ফেলে রনির স্ত্রীকে, রনির মা কে। ‘ভালো’ জনগণ সীমা অতিক্রম করে যায়, বের হয়ে যায় আসল চেহারা। হিংস্র বিষদাঁত, নখর। যেন তুমি অধম তাই বলে আমি উত্তম হইবো কেন? অথবা, আমিও অধম শুধু মুখোশটা খুলে পড়ার অপেক্ষা যেন! এ গেলো সাধারণ জনমানুষের কথা।

এবার আসি, তথাকথিত অগ্রসর মানুষদের প্রসঙ্গে। বেঁচে থাকার অধিকার সবার আছে। সে দোষী হোক বা নির্দোষী। জীবনযাপনের অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার, চিকিৎসার অধিকার দোষী, নির্দোষ, ভালো, মন্দ নির্বিশেষে সবার আছে। তেমনভাবে তাদের এই অধিকারগুলো আদায়ে তাদের পাশে থাকার দায়িত্ব যদি কেউ পালন করতে চায়, করতে পারে। কিন্তু, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগকে পাশ কাটাতে পারে না বা মিথ্যা অভিযোগ বলে দাবি করতে পারে না। তাও এমন কিছু মানুষ, যারা  বেশিরভাগ সময়, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তারাই আবার নিজেদের ‘বন্ধু’র বিপদে পাশে দাঁড়ান। যেই বন্ধু কিনা যৌন হয়রানির অভিযোগে প্রমাণিত এবং শাস্তিপ্রাপ্ত। বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াবে, সেই বন্ধু খারাপ হোক বা ভালো। কিন্তু নিজেদের বন্ধু বলে তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগকে মিথ্যা বলে গণমাধ্যমে দাবি করলে, এসব মানুষের আসল মুখ নিয়ে দুর্ভাবনা শুরু হয়। আপাতদৃষ্টিতে আদর্শের ধ্বজাধারী নেতাদের কাছে কি তবে নিজস্ব বন্ধুমহলের সাত খুন মাফ?

এখন তো অদ্ভুত এক জিনিস আসছে, ফেসবুক ভাইরাল। যা কিছু উনিশ বিশ, হয়ে যায় ভাইরাল। এরকম এক ভাইরাল চোখে পড়লো কালকে। দুই তরুণী আর এক তরুণ বসে গল্প করছে, কীভাবে তরুণী দুজন কোনও এক পাবলিক প্লেসের জেন্টস টয়লেটে গিয়ে টয়লেট ব্যবহারকারী এক পুরুষের ভিডিও করেছে। এমন ভাব, যেন খুব বীরত্বের কাজ করে ফেলেছে তরুণী। ছিঃ। আফসোস! প্রজন্ম কোথায় নেমে গেছে। মানুষের মৌলিক গুণগতমান বলে কিছু একটা আছে, যেটা ক্রমেই এই দেশ থেকে এই সমাজ থেকে বিলীনমান। মানুষগুলো আর মানুষ নেই। ক্রমশ অন্য কিছু হয়ে যাচ্ছে।

শেষ করি, এক বন্ধুর ছোটবোনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটা সাম্প্রতিক ঘটনা দিয়ে। ধর্মপ্রাণ মুসলিম পরিবারের সবচেয়ে ছোট খুব মিষ্টি মেয়েটার মুখটা কিছুটা মঙ্গোলয়েড ধাঁচের। মিরপুর ১০ নম্বর দিয়ে যাওয়ার সময় সেদিন হঠাৎই শোনে দুজন লোক অকারণেই ওকে আদিবাসী ভেবে গালি দিচ্ছে। শুধু গালি দিয়েই তারা ক্ষান্ত নন, খুবই আপত্তিকরভাবে বলেও ফেলেছে,  এদের দেখলে রোজাও নষ্ট হয়!

কী অদ্ভুত! রোজা থাকা না থাকার সঙ্গে রাস্তা দিয়ে মঙ্গোলয়েড চেহারার একটা মেয়ের হেঁটে যাওয়ার কি সম্পর্ক? যতই প্রশ্ন করি না কেন, জানি উত্তর নেই। কারণ, দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে, এসব যুক্তিবিহীন, সুশিক্ষাবিহীন মানুষ নামের দ্বিপেয়ের সংখ্যা। তৃণমূলে বা মগডালে এরাই এখন সংখ্যাগুরু।

তারপরও কোথাও যদি খুব কম সংখ্যাতেও কোনও মানুষ থেকে থাকে তাদের উদ্দেশ্যে সেলিম আল দীনকে উদ্ধৃত করে খুব বলতে সাধ হয়–

‘চলো মানুষ। চলো নতুন ভাবনাভূমিতে নব্যকালের নিশ্চিত গ্রহভূমিতে। আলোহীন উল্কাপিণ্ডের গায়ে সংগীতের সুর লিখে দাও রাষ্ট্রহীন দেশহীন কালহীনতার আনন্দিত সর্বমানবের মিলিত উৎসবের ভাষায়। ধূমকেতুর জ্বলন্ত পুচ্ছে ঢেলে দাও সুগন্ধের নির্যাস। চাঁদ চাষ করো। কার্পাস তুলার চাষ। সেই কার্পাসের পোশাক হোক সকল মানুষের সৌরযাত্রার বসন। চলো মানুষ চলো।’

লেখক: উন্নয়নকর্মী

/এসএএস/এমওএফ/

x