‘দুই পাগলের হলো মেলা’

প্রভাষ আমিন ১৫:৩০ , জুন ১৪ , ২০১৮

প্রভাষ আমিনএক বছর আগেও যদি আমি বলতাম মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন মুখোমুখি দাঁড়াবেন, হাত মেলাবেন, পাশাপাশি বসে হেসে কথা বলবেন; সবাই আমাকে পাগল ভাবতেন নিশ্চয়ই। কারণ, এই দুই নেতার পাগলামোতে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল গোটা বিশ্বে। তাদের কথার যুদ্ধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, কেউ কেউ আশঙ্কা করছিলেন বিশ্ব বুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। এবার শঙ্কাটা অনেক বেশি ছিল। কারণ, এবার যুদ্ধ হলে তা হবে সাইবার যুদ্ধ আর পারমাণবিক যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ তছনছ করে দিতে পারতো গোটা বিশ্বকেই।
কাজী নজরুলের একটি গান আছে– ‘খেলিছ এ বিশ্বলয়ে, বিরাট শিশু আনমনে...। ট্রাম্প আর কিমকে আমার তেমন বিরাট শিশু মনে হয়। কিম ট্রাম্পকে সম্বোধন করেন ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত বুড়ো’ বলে আর ট্রাম্প কিমকে ডাকেন ‘বেটে ও মোটা রকেট মানব’ বলে। এই দুই ‘উন্মাদে’র বাগযুদ্ধ পাড়ার ছেলেমানুষের ঝগড়াকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। কে কাকে কত গালি দিতে পারেন তার যেন প্রতিযোগিতা চলছিল। একজন একটা গালি দেন তো সেটা মাটিতে পড়ার আগেই অপরজন দ্বিগুণ কড়া গালি খুঁজে বের করেন। তাদের এই ঝগড়াকে পাড়ার ছেলেমানুষের ঝগড়া বা বাগাড়ম্বর হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কারণ, দুজনের হাতেই আছে পারমাণবিক অস্ত্র। এমনকি কিম ট্রাম্পকে পুড়িয়ে শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের ভয় ছিল, কিমের হাতে এমন দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্র আছে, যেটা উত্তর কোরিয়া থেকে সরাসরি উড়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিতে আঘাত হানতে পারে। কিম পারমাণবিক অস্ত্রের বোতামের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্পকে হুমকি দিয়েছিলেন। জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার বোতাম আরো বড়। দুই নেতার এই বোতামের মাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ট্রল হয়েছে। কিন্তু ট্রল দিয়ে তো আর শান্তি আসবে না। শান্তির জন্য চাই আলোচনা।

নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই ট্রাম্পকে আমার অপছন্দ। নির্বাচিত হওয়ার পর এতসব কাণ্ডকারখানা করেছেন, ইতিহাসে ট্রাম্প পরিচিত হবেন সবচেয়ে অস্থির মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তিনি দেশ চালান টুইটারে। যখন তখন, যাকে তাকে ছাঁটাই করেন। নারী কেলেঙ্কারি তো ডাল-ভাত। আর কিমের ‘পাগলামি’ তো ট্রাম্পকেও ছাড়িয়ে যায়। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন বলে কিমের সব পাগলামোর খবর আসে না। তবে টুকটাক যা আসে; তাতেই সবার চক্ষু চড়কগাছ। এ দু’জনের ‘পাগলামো’র ইতিহাস লিখলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে ট্রাম্পের কাহিনি নিয়ে বই লেখা হয়ে গেছে। কিমেরটা আপাতত লেখা যাচ্ছে না, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ লিখবে। তবে মানতেই হবে এই দুজন প্রচলিত ঘরানার নেতা নন বলেই অসম্ভবকে সম্ভব করে আলোচনায় বসতে পেরেছেন। শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প গোঁ-ধরলেও কিমের আন্তরিকতায় সম্ভব হয়েছে ঐতিহাসিক এই বৈঠক।

সিঙ্গাপুরের স্যান্তোসা দ্বীপটি একসময় জলদস্যুদের আখড়া ছিল। সিঙ্গাপুর সেটিকে পর্যটন স্পটে বদলে দিয়েছে। নাম রাখে স্যান্তোসা, মানে শান্তি। সেই শান্তির দ্বীপ থেকেই তৃতীয় মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে থাকা বিশ্বে এখন বইছে শান্তির বাতাস। অনেকেই এই বৈঠকের জন্য ট্রাম্পকে কৃতিত্ব দিয়ে তার গুণকীর্তনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। তবে এককভাবে কৃতিত্ব কাউকেই দেওয়া যাবে না। এই দুজনের বাইরে এই বৈঠকের জন্য কিছুটা কৃতিত্ব পাবেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইনও। তার উদ্যোগেই উত্তর কোরিয়ার ক্রীড়া দল অংশ নিয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে। তার পথ ধরে গত এপ্রিলে প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন উত্তর কোরিয়ার কোনও শীর্ষ নেতা। সীমান্ত গ্রাম পানমুনজমে কিম আর মুনের বৈঠকেই বরফ গলা শুরু হয়। জন্মের পর থেকেই প্রায় জগৎবিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ায় যেন পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। সেই পানমুনজম ঘোষণার ভিত্তি ধরেই রচিত হয়েছে সিঙ্গাপুর ঘোষণা।

স্যান্তোসা দ্বীপের কেরেপাল্লা হোটেলে এই ঐতিহাসিক বৈঠক নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি হওয়ায় হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন সবাই। তবে হতাশাবাদী মানুষের কমতি নেই বিশ্বে। অনেকে বলছেন, এ নিছক নাটক। কোনও ফলই আসবে না বৈঠক থেকে। কোনও ফল আসুক আর না আসুক, যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ দুই নেতা মুখোমুখি বসেছেন, বিশ্বশান্তির জন্য এটাও অনেক বড় অগ্রগতি। আর এক বৈঠকেই ছয় দশকের সমস্যা মিটে যাবে এমন আশা করা বোকামি। তবে আগে হোক আর পরে হোক, শুরু যখন হয়েছে; বরফ একসময় গলবেই। ৫০ সালে শুরু হওয়া উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যকার যুদ্ধ ৫৩ সালে বিরতিতে গেছে। তারপর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর আছে, কিন্তু শেষ হয়নি যুদ্ধ। উত্তর কোরিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পারমাণবিক অস্ত্রের হুঙ্কারে সন্ত্রস্ত গোটা  বিশ্ব। এটা ঠিক, উত্তর কোরিয়ার সত্যি সত্যি পারমাণবিক সামর্থ্য আছে বলেই ট্রাম্প কিমের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নইলে সুযোগ থাকলে ইরাকের মতো উত্তর কোরিয়ায়ও ঘু-ঘু চড়িয়ে দিতেন। ট্রাম্পের ফাঁদে পা দিয়ে যদি কিম এখনই উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করে ফেলেন, তাহলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবেন। কারণ, ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ভুল করে মনের কথাটা মুখে বলে ফেলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ায় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ লিবিয়া মডেলে হবে। এরপর আলোচনার সম্ভাবনা ভেস্তে যেতে বসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির পর লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির পরিণতির কথা মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। কিমও নিশ্চয়ই ভোলেননি।

তবে দুই ‘বিরাট শিশু’ হঠাৎ ম্যাচিওর হয়ে আলোচনায় বসে গেছেন, এমন ভাবনাও ঠিক নয়। আসলে নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকির মুখে ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানাতে পারবেন না। আর চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে কোরীয় উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা অনেক স্বস্তিতে রাখবে ট্রাম্পকে। বছরের পর বছর বিচ্ছিন্ন থেকে কিমও বুঝেছেন, এভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণ সম্ভব নয়। পাশের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া অনেক এগিয়ে গেছে। আর সমাজতান্ত্রিক হয়েও চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তাই খালি পারমাণবিক অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। যোগাযোগ বাড়াতে হবে বিশ্বের সঙ্গে। খুলে দিতে হবে দরজা। যত যাই বলেন, এখন আর অস্ত্রের যুদ্ধের সময় নেই। এখন যুদ্ধ হলো বাণিজ্যের, তথ্য প্রযুক্তির।

সমস্যা যত জটিল হোক, আলোচনার মাধ্যমেই তার সমাধান সম্ভব। এক বৈঠকের পরই কোরীয় উপদ্বীপ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত হয়ে যাবে, এমন আশা করাও ভুল। নিশ্চয়ই আরো অনেক বৈঠক হবে। দুই নেতাই পরস্পরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আরও অনেকবার দেখা করার, বৈঠক করার অঙ্গীকার করেছেন। দুই পক্ষই নিশ্চয়ই নিজ নিজ স্বার্থ, নিজ নিজ নিরাপত্তা, সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেই আলোচনা চালিয়ে যাবেন। আর আলোচনার পথ ধরেই আস্তে আস্তে শান্ত হবে বিশ্ব।

একটা বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল আছে, ‘দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তবে তো দাগই ভালো।’ দুই ‘পাগলে’র মেলা থেকেই যদি বিশ্বে শান্তির বারতা ছড়ায়, তবে তো ‘পাগলামোই’ ভালো।'

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

x