এই বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে আমরা কী পেলাম?

রেজানুর রহমান ১৫:১২ , জুলাই ০৯ , ২০১৮

রেজানুর রহমানলেখার শিরোনাম দেখে অনেকেই হয়তো অবাক হচ্ছেন। হয়তো ভাবছেন এই লোক বলে কী? বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরে বাংলাদেশ খেলেছে নাকি যে চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষতে হবে। যারা একথা ভাবছেন আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরে না খেললেও ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা তো কম ছিল না। উন্মাদনা এখনও আছে। তবে আগের তুলনায় একটু কম। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার পর বাংলাদেশের বিশ্বকাপ আনন্দও যেন হঠাৎ করেই হাওয়া হয়ে গেলো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের বিদায়ের পর দুইপক্ষের বাদানুবাদ থেমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। কথার কথা– আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল যদি এখনও বিশ্বকাপ আসরে টিকে থাকতো তাহলে দুইপক্ষের বাদানুবাদ যে কোনও পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াতো তা কল্পনা করতে গিয়েও বিব্রত হচ্ছি।

তার মানে এই বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে আমরা কিছু না কিছু তো পেয়েছি। অনেক কিছু শিখেছিও। মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাইনি তো কী হয়েছে? অন্যকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে জান প্রাণ উজাড় করে দিয়েছি। নিজের জমি বিক্রি করে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ অন্য দেশের পতাকা বানিয়েছি। যতদূর পারি আকাশের শেষ সীমানায় উঠে অন্য দেশের পতাকা ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছি। অন্য দেশের পরাজয়ে পরিবারসুদ্ধ হাউমাউ করে কেঁদেছি। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সমর্থন করতে গিয়ে ব্যাপক অর্থ খরচ করেছি। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ‘যা ইচ্ছে তাই’ বলে গালাগাল করেছি। নানা প্রক্রিয়ায় এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নাস্তানাবুদ করার লড়াইয়ে লিপ্ত হয়েছি। আর্জেন্টিনা যেদিন বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বিদায় নেয় সেদিন ফেসবুকে দেখলাম একটি পরিবার স্বামী, স্ত্রী ও ছোট বাচ্চাসহ হাউমাউ করে কাঁদছে। আচ্ছা ঠিক আছে, প্রিয় দলের পরাজয়ে আপনার কষ্ট হয়েছে, আপনি কাঁদতেই পারেন। কিন্তু সেই কান্নার ছবি ফেসবুকে কেন? কী বুঝাতে চান? নাকি এটা এক ধরনের ফ্যাশন? ব্রাজিল যেদিন বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো সেদিন আরও চমকপ্রদ একটি ভিডিও দেখলাম ফেসবুকে। টিন এজার একটি মেয়ে শুধু কেঁদেই চলেছে। প্রথমে তার কান্নার কারণ বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম ব্রাজিল হেরে যাওয়ার কারণে সে কাঁদছে। প্রায় পাঁচ মিনিটের এই ভিডিওতে মেয়েটি তিনবার কথা বলেছে। অস্পষ্ট কথায় যা বোঝা গেছে তা হলো, ব্রাজিল হেরেছে ঠিক আছে... আপনারা নানাভাবে অপমান করতেছেন... ঠিক আছে... আমি অপমান নিতে পারতেছি না... ঠিক আছে... এরপর শুধুই কান্না। ব্রাজিলের জন্য কান্না!

মেয়েটির কান্না দেখে কেন যেন বারবার একটি প্রশ্নই মাথায় উঁকি দিয়েছে– এই মেয়ে কি প্রিয় তার মাতৃভূমি অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য কোনও দিন কেঁদেছে? ওই পরিবারটি যারা আর্জেন্টিনার জন্য কাঁদলো তারাও কি কোনও দিন প্রিয় মাতৃভূমির জন্য অশ্রু ঝরিয়েছে? সবচেয়ে বড় কথা, এই যে ওরা অন্য দেশের ফুটবলের জন্য কাঁদলো, ওরা কি নিজ দেশের ফুটবল সম্পর্কে কিছু জানে? ওরা কি কোনও দিন বাংলাদেশের ফুটবল খেলা দেখেছে? মেসি, নেইমারের জন্য যারা চিৎকার করে গলা ফাটায় তারা কি নিজ দেশের কোনও ফুটবলারকে চেনে? যদি না চেনে থাকে তাহলে তাদের চেনাবে কে? এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন? উত্তর কি আমাদের জানা নেই? আমাদের দেশেও ফুটবল খেলা হয়। ফুটবলের উন্নয়নের জন্য নানা সংস্থা আছে। তাদের দায়িত্ব কী? বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে প্রায় প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় দেশের ফুটবল বিশেষজ্ঞদের আলোচনা দেখা ও পড়ার সৌভাগ্য হচ্ছে প্রতিদিন। টেলিভিশনে ফুটবল কর্তাদের নানান মন্তব্য শুনছি। বিশ্ব ফুটবল সম্পর্কে তাদের অনেকের কথাবার্তা শুনে যারপরনাই চমকিত হচ্ছি। ধারণা করেছিলাম বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আনন্দ উৎসবে নিশ্চয়ই নিজেদের ফুটবল নিয়েও কথা হবে। ব্যাপক আলোচনা হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হবে। কিন্তু কার্যত তার কোনও লক্ষণই পেলাম না।

অথচ বিশ্বকাপ ফুটবলের এই আসরকে উপলক্ষ করে বাংলাদেশের ফুটবলের একটা জাগরণ শুরু হতে পারত। দেশের প্রতিটি গ্রামে, পাড়া, মহল্লায় এখনও ছোট বড় অনেক ফুটবল ক্লাব আছে। এই ক্লাবগুলোর অধীনে ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করা যেতো। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার নামে দল গড়েও তো ফুটবল টুর্নামেন্ট হতে পারত। দিনে নিজেরা খেলতাম আর রাতে অন্যদের খেলা দেখতাম। দেশের ফুটবল ফেডারেশন এই ধরনের একটা উদ্যোগে শরিক হতে পারত। দেশের ৩০০ জন মাননীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে ১০০ জনও যদি নিজ নিজ এলাকায় ফুটবল জাগরণের ক্ষেত্রে পৃথক উদ্যোগ নিতেন তাহলে নিশ্চয়ই এক ধরনের পজিটিভ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম আমরা। বিষয়টা আরেকটু খোলাসা করি। ধারা যাক, এলাকার সংসদ সদস্যের উদ্যোগে একটা ফুটবল টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করা হলো। এলাকার ১০টি ফুটবল ক্লাব এই টুর্নামেন্টে অংশ নিলো। ১০০ জন সংসদ সদস্য মিলে পৃথকভাবে টুর্নামেন্টের আয়োজন করলে দেশের ১ হাজার ফুটবল ক্লাব সক্রিয় হয়ে উঠতো। প্রতিটি টুর্নামেন্ট থেকে যদি একজনও ভালো খেলোয়াড় বেরিয়ে আসতো তাহলে মোট খেলোয়াড়ের সংখ্যা দাঁড়াতো ১০০। পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ১০০ জন থেকে নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের দক্ষ ফুটবলার খুঁজে নেওয়া যেতো।

আসলে সবকিছু নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ওপর। আমাদের দেশে ফুটবলকে ঘিরে সত্যিকার অর্থেই কোনও পরিকল্পনা নেই। অতীতকালে স্কুল, কলেজকে ঘিরে ফুটবলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো হতো। এখন তো অধিকাংশ স্কুল, কলেজে ফুটবলকে ঘিরে কোনও আয়োজনও থাকে না। অধিকাংশ স্কুল, কলেজে খেলার মাঠ নেই। যাদের মাঠ আছে তাদের অনেকে বাজার, হাট ইজারা দেওয়াসহ অন্য কাজে মাঠ ব্যবহার করে। প্রকৃত অর্থে দেশের ফুটবলের জন্য কোনও পরিকল্পনা নেই। তবে অন্য দেশের ফুটবল দেখার জন্য পরিকল্পনার অভাব নেই। রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবল তো শেষ হতো চললো। চার বছর পর কাতারে পরবর্তী বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা এখনই সাজিয়ে ফেলেছেন অনেকে। আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল সমর্থকেরা নতুন ভাবনায় মত্ত হয়ে উঠেছেন। এবার পায়নি তো কি হয়েছে, আগামীতে নিশ্চয়ই পারবো।

প্রিয় পাঠক, বাংলাদেশের ফুটবলকে ঘিরে এই ধরনের শুভ ভাবনা কবে শুরু করবো আমরা? নাকি আমরা বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলের দর্শক হয়েই থাকবো। পানামা এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরে জায়গা পেয়েছিল। একটা সময় ফুটবল র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পানামার চেয়ে এগিয়ে ছিল। আর এখন পানামার চেয়ে অনেক পেছনে বাংলাদেশের অবস্থান। পানামা কেন পারলো? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর– ফুটবল নিয়ে পানামার সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনা ছিল। এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও করেছে। আর তাই পানামা এগিয়ে গেছে।

আমরা তো আজই বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু ১০ বছর... ২০ বছর পরও যেন বিশ্বকাপের মূল আসরে জায়গা করে নিতে পারি সেজন্য অবশ্যই সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। কয়েক দিন আগে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একজন তরুণকে দেখলাম একা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরে বাংলাদেশকে দেখতে চাই। ভেবেছিলাম এই তরুণকে নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চয়ই এক ধরনের মাতামাতি শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু সে ধরনের কিছুই দেখলাম না। তার মানে ওই তরুণের স্বপ্নকে কি অবাস্তব মনে হচ্ছে? ২০২৬ সালের মধ্যেও বাংলাদেশ বিশ্ব ফুটবল আসরের মূল পর্বে যেতে পারবে এমন ভাবনাও কি আমাদের মাঝে নেই? তবে বাংলাদেশের ফুটবল ফেডারেশনের বর্তমান সভাপতি দেশের জীবন্ত কিংবদন্তি ফুটবলার সালাউদ্দিন একটা আশার বাণী শুনিয়েছেন। একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের মূল আসরেই বাংলাদেশ জায়গা করে নেবে...। তার এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ফেসবুকে অনেকেই নানা ধরনের মন্তব্য করেছেন। একজন লিখেছেন– ‘এটা গাঁজাখুরি গল্প...’। সত্যিই কি এটা গাঁজাখুরি গল্প? প্রিয় পাঠক আপনারা কি বলেন?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এমওএফ/

x