বিশ্বকাপ ফুটবল: ইইউ এখন বিভক্ত

দাউদ হায়দার ২০:১৩ , জুলাই ০৯ , ২০১৮



দাউদ হায়দারহঠাৎ ধাঁধা লাগে চোখে, বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথম রাউন্ডেই জার্মানির বিদায়, কিন্তু জার্মান পতাকা উড়ছে বার্লিনের নানা মহল্লায় (বার্লিনে ১৬টি জেলা), বাড়ির ছাদে, বারান্দায়, জানালায়। তার মানে, পরাজয়েও লজ্জা হয়নি, মুখ লুকোয়নি। পতাকা শোভিত। নামায়নি। দিব্যি উড়ছে। ভালো করে ঠাওর করলে ধাঁধা কাটে, জার্মানির পতাকা উল্টো। জার্মানির পতাকা নিচ থেকে উল্টো করে ধরলেই বেলজিয়ামের পতাকা হয়ে যায়। একই রং। জার্মান পতাকা কালো-লাল-হলুদ। বেলজিয়ামের পতাকা কালো-হলুদ-লাল। জার্মান পতাকা নয়, বাড়ির ছাদ-বারান্দা-জানালা থেকে লাপাত্তা, হাওয়ায় আন্দোলিত বেলজিয়ামের পতাকা।



জার্মানির দ্বিতীয় টিভি চ্যানেল জেডডিএফ (ZDF), সরকারি, রবিবার রাতে এক প্রতিবেদনে মজার তথ্য দিয়েছে, ‘বিশ্বকাপ ফুটবলে সেমিফাইনালে ইইউ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন)-এর সমর্থকরা বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।’ ব্রেক্সিটে ব্রিটেন একঘরে, ইইউভুক্ত নয় আর। ইংল্যান্ড এখন ইইউ-র দোস্ত নয়, দুশমন, চোখের বালি। ইইউ’র কোনও দেশের ফুটবল পাগল ইংল্যান্ডকে সমর্থন করছে না। বার্লিনের কোনও বাড়ির ছাদে, বারান্দায় ইংল্যান্ডের পতাকা চোখে দেখিনি এখনও। যদিও বার্লিনের স্যোইনেব্যার্গে, ভিলমারসডর্ফে, প্রেন্সলাউয়ারব্যার্গে, শার্লোটেনবুর্গে বিস্তর বিলেতির বাস। কর্মসূত্রে। ব্যবসায়। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও কম নয়। ব্রেক্সিটের কারণেই বোধহয় ইংল্যান্ডের পতাকা উত্তোলনে লজ্জিত।
ঠিক যে, বিশ্বকাপ ফুটবল (২০১৮) ইউরোপের পদতলে, তবে ইইউ’র বলা যাবে না। বলা যেত, যদি ব্রেক্সিটের হাঙ্গামা, বদমাইশি না থাকতো।
ইইউ কেন বিভক্ত, ইইউ’র কোন দেশ কোন দেশকে সমর্থন করছে, জেডডিএফ চটজলদি জরিপে বলছে, ‘জার্মানিসহ অস্ট্রিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং অবশ্যই বেনেলুক্স (বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ড-লুকসেমবুর্গ), এমন কি নরডিকস্ দেশসমূহ (সুইডেন-ডেনমার্ক-নরওয়ে-ফিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড) বেলজিয়ামের পক্ষে, ঘোরতর সমর্থক।’ কেন পক্ষে বা সমর্থন করছে, বলা হয়নি আদৌ। আমরা জানি, পরোক্ষ সূক্ষ্ম রাজনীতি। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস, ইইউ’র হেডকোয়ার্টার, ইইউ’র সব রাজনীতি, অর্থনীতির ঘোরপ্যাঁচ, পলিসি, বিধান এখানেই। অবশ্য, বেলজিয়াম বা ব্রাসেলস ইইউ’র নীতিনির্ধারণে মাতব্বর নয়। তবু বেলজিয়ামকে তোল্লাই দেয়, যেমন কলকাতাকে ঢাকা। শিল্পসাহিত্য সব ক্ষেত্রে।
জার্মানির পাশের দেশ বেলজিয়াম, মাত্র ২৮ ফুট সড়ক পেরোলেই (আখেন) বেলজিয়াম। সীমান্তের বালাই চোখে পড়ে না। উপরন্তু, বেলজিয়ামের দশ শতাংশের বেশি জার্মানভাষী। তো, জার্মানদের বেলজিয়াম-প্রীতি স্বাভাবিক। বেলজিয়ান নারীরা নাকি জার্মান পুরুষ খুব পছন্দ করে। জার্মান পুরুষরা বেলজিয়ান নারীদের।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, বিশেষত ষাট দশক থেকে, জার্মানির জিগরি দোস্ত ফ্রান্স। রাজনৈতিক প্রেম। কিংবা রামকৃষ্ণ-লীলা। বিরহ, মনোমালিন্যও আছে। তবে, না ছাড়িব দোঁহে।
রাজনীতির লীলা যতই একাত্ম হোক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জার্মানিই কুবের। ফ্রান্সকে খাটো চোখেই দেখে। বশে রাখে। জার্মানি সবচেয়ে ধনী দেশ ইউরোপে। চোখ রাঙায় সারাক্ষণ ইইউ-দেশে।
ফুটবলে জার্মানির শত্রু ফ্রান্স (আগে ছিল ইতালি)। শত্রুতা কতটা বহুমানিত, দৈনিক ফাৎস (ফ্রাংকফুর্টার আলগেমাইনেৎ সাটুং) লিখেছে, ‘ফ্রান্সকে সমর্থন করছে না জার্মানরা (২০১৮ বিশ্বকাপ ফুটবল), সমর্থকরা চোখ-মুখ-কান বন্ধ করে বেলজিয়ামের পক্ষে। বেলজিয়ামের পতাকা ওড়াচ্ছে বাড়িতে। জার্মান পতাকা উল্টিয়ে।’
ফ্রান্স একঘরে নয়। ইইউ’র নানা দেশ সমর্থন না করলেও। ফ্রান্সের সমর্থক আফ্রিকার ফ্রেন্সভাষী সব দেশ।
কেউ ভাবতেই পারেনি ক্রোয়েশিয়ার মারকুটে প্রতাপ, সব প্রতিপক্ষকে ‘হেলায় করিয়া লঙ্কা জয় বিজয়ী সমরে।’
ক্রোয়েশিয়া ইইউভুক্ত, কিন্তু ইইউ’র পশ্চিমা দেশ সমর্থক নয়। ‘পুঁচকে ঢুকেছে তালেগোলে ফোঁকরে/ কী করে, হায় রে, কী করে!’
বার্লিনের ডাকসাইটে, ভ্রু-উঁচু দৈনিক ড্যের টাগেস্পিগেল সরেজমিন তদন্ত-রিপোর্টে লিখছে, ‘ক্রোয়েশিয়ার সমর্থনে মরিয়া ইইউ’র পূর্ব ইউরোপ। এমনকি পরাজিত রাশিয়াও।’ রিপোর্টে খোঁচাও আছে, ‘ক্রোয়েশিয়াও একদা কমিউনিজমে মশগুল ছিল। পুতিন ক্রোয়েশিয়াকে বাহবা দিয়েছেন কমিউনিজমের আঘ্রানে।’
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিশ্বকাপ ফুটবলে দেশভিত্তিক বিভক্ত সমর্থনে, সমর্থকের আহ্লাদে,গরিমায়, তেজ ও বলীয়ানে।

লেখক: কবি  ও সাংবাদিক

/এমওএফ/

x