হেলসিংকি বৈঠক ট্রাম্পের জীবনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৫:০৩ , জুলাই ১২ , ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীআগামী ১৬ জুলাই ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৈঠকে বসবেন। দুই নেতার প্রস্তাবিত হেলসিংকি বৈঠককে সামনে রেখে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মাঝে গত ৩ জুলাই উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতি বৈঠকও হয়েছে মস্কোতে। এ বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উভয়পক্ষ স্বীকার করলেও বিস্তারিত কিছু কেউই বলেননি।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কথা বলতেন আর রাশিয়ার ওপর থেকে বাণিজ্য অবরোধ তুলে নেওয়ার ব্যাপারে তার জোরালো মতামত প্রকাশ করতেন। ট্রাম্প বহু ব্যাপারে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সে জন্য বিশ্বব্যাপী সমালোচিতও হয়েছেন। মনে হয় আমেরিকার গোয়েন্দাদের, পেন্টাগনের, কংগ্রেসের বিরোধিতার পরও হেলসিংকি বৈঠকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ট্রাম্প দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
আমেরিকার অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে ট্রাম্প ব্যয় সংকোচন নীতি অনুসরণ করে চলছেন। হেলসিংকি বৈঠক সফল হলে ব্যয় সংকোচন নীতিকে ব্যাপক সফলতা প্রদান করবে। এখন আমেরিকা ঋণগ্রস্ত দেশ। চড়া সুদে চীন থেকে ঋণ নিয়েছে এক দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার আর জাপান থেকে নিয়েছে এক দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, এখন একজন আমেরিকান শিশু জন্মগ্রহণ করে ৩০ মিলিয়ন ডলার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে। আমেরিকার সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। সমগ্র সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে এক শতাংশ ধনীর হাতে। ওবামা গাড়ি কোম্পানিগুলোকে রক্ষা করতে গিয়ে কোটি কোটি ডলার ভুর্তকি দিয়েছিলেন।

আমেরিকার প্রথম অর্থমন্ত্রী ছিলেন হেমিলটন। হেমিলটন ধনীবান্ধব যে অর্থনীতি চালু করে দিয়েছিলেন তা এখনও অব্যাহত আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবস্থা তো এখন অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। ওবামার সময়ে যুবা বয়সের কিছু লোক ওয়ালস্ট্রিটের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। এটি তো অশনি সংকেতের লক্ষণ। সুতরাং কেউ না কেউ তো পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিতে হবে। আমেরিকার অর্থনীতির আজ এই বেহাল অবস্থার কারণ হচ্ছে যত্রযত্র প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে নেতৃত্বের ছড়ি ঘুরাতে গিয়ে বিরাট অংকের অর্থ আনপ্রোডাক্টিভ খাতে ব্যয় করে। ইরাক যুদ্ধ থেকে আরম্ভ করে আমেরিকার কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। এখন ট্রাম্প বড়ত্বের অহমিকা ত্যাগ করে বলছে পাহারাদারির কাজ আমেরিকা করতে রাজি আছে, তবে খরচ যাকে পাহারা প্রদান করা হবে তাকে বহন করতে হবে।

পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোকে নিরাপত্তা প্রদানের জন্য ন্যাটো জোট গঠন করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সে প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু ন্যাটো জোট এখনও অব্যাহত আছে। ট্রাম্প বলছেন, ন্যাটো জোট থেকে তার ৩৫ হাজার সৈন্য তিনি নিয়ে যাবেন। সম্ভবত হেলসিংকিতে পুতিনের সঙ্গে এসব বিষয়ে তার কথাবার্তা হবে এবং হয়তো সিদ্ধান্তও হতে পারে। ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রগুলো এ বৈঠক নিয়ে হতাশ। তাদের ভয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য আর নির্ভরযোগ্য থাকবে না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মাস্টারপ্ল্যান করে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোকে অঢেল অর্থসাহায্য প্রদান করেছিল, যে কারণে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি খুব দ্রুত পুনর্গঠন করতে পেরেছিল। এখন আমেরিকা যদি বলে তোমরা সাবলম্বী হয়ে তোমাদের রক্ষা ব্যবস্থা তোমরা প্রতিষ্ঠা করো, সে জন্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তো আমেরিকার সঙ্গে অবন্ধু সুলভ আচরণ করতে পারে না!

হেলসিংকিতে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে ট্রাম্প ন্যাটোর সম্মেলনে যোগ দেবেন। সম্ভবত এ সম্মেলনে সবাই খোলামেলা আলাপই করবেন। ক্রিমিয়া নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যের বিরোধ রয়েছে। ট্রাম্প কিন্তু ক্রিমিয়ার বিষয়টা বলতে গিয়ে বলেছেন, ক্রিমিয়ার সবাই তো রুশভাষী লোক আর ক্রিমিয়া হচ্ছে রাশিয়ার প্রধান নৌ-ঘাঁটি। তিনি বলেছেন ক্রিমিয়ার অধিবাসীরা স্বেচ্ছায় রাশিয়ার সঙ্গে রেফারেন্ডাম করে যোগদান করেছে, এ নিয়ে বিরোধ করা ঠিক হবে না।

ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো পুতিনকে যেভাবে চিত্রিত করে, স্তালিনকেও সেভাবে চিত্রিত করতো না। তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, তারা মনে করেছিল সোভিয়েত পতনের পর রাশিয়া কাগুজে বাঘে পরিণত হবে। কিন্তু পুতিন তাদের কল্পনাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে রাশিয়াকে সোভিয়েতের সাবেক অবস্থায় এনে পৌঁছিয়েছে এবং পরাশক্তির ভূমিকায়ও পুনরায় অবতীর্ণ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যদিওবা কোনও সক্রিয় ভূমিকায় নেই তবু হেলসিংকির বৈঠকে এ বিষয়টা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে সিরিয়ায় রাশিয়া ইরান সক্রিয় ভূমিকায় ছিল। পরবর্তী সময়ে এসে তুরস্কও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বৈরিতা খুবই প্রকট, বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে। রাশিয়ার সঙ্গে সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি ট্রাম্প কতটুকু মেনে নেন তা বলা খুবই কঠিন। তবে যেহেতু আমেরিকার এস্টাবলিশমেন্ট এই বৈঠকের বিরুদ্ধে, তাই ট্রাম্প বৈঠকটাকে ব্যর্থ হতে হয়তো দেবেন না। বড় বড় মিডিয়াও এ বৈঠকের বিরুদ্ধে। ওয়াশিংটন পোস্টের অভিযোগ, আলোচনায় বসার ব্যাপারে রাজি হয়ে ট্রাম্প পুতিনের আনুগত্য স্বীকার করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতে, ‘স্বৈরতন্ত্রী’ পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের যে একান্ত বৈঠক হতে যাচ্ছে তা আসলে দুই সাদৃশ্য চরিত্রের ব্যক্তিদের বৈঠক। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এস্টাবলিশমেন্টের বিপরীতে অবস্থান নিলে গুরুতর ঝুঁকির মাঝে থাকে।

রিগ্যানকে অনুরূপ কারণে হোয়াইট হাউসের সামনেই কে বা কারা গুলি করেছিল। রিগ্যানের শরীরে গুলিবিদ্ধ হলেও মরেননি। পরবর্তী সময়ে যখন হাসপাতাল থেকে তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন, তখন থেকে আর কখনও এস্টাবলিশমেন্টের বিপরীতে অবস্থান নেননি। রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ মিটে গেলে আমেরিকার ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘গুপ্তরাষ্ট্র’র জুজুর ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি ডলার সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হবে। সুতরাং কায়েমি স্বার্থ চাচ্ছে না রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ মিটে শান্তি স্থাপন হোক।

যদি দৈবাৎ উভয় রাষ্ট্রপ্রধান একটা শান্তিচুক্তি সম্পাদন করতে পারেন তবে কায়েমি স্বার্থের তো আপাতত সর্বনাশ হবে। আর ব্যর্থ হলে ট্রাম্পের কপালে হয়তোবা রিগ্যানের মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

x