যে মৃত্যুর দায় আমাদের সবার

মো. জাকির হোসেন ১৬:৫০ , আগস্ট ০৭ , ২০১৮

মো. জাকির হোসেনওরা মরছে। একাকী মরছে। দলবেঁধে মরছে। পুরো পরিবার একসঙ্গে মরছে। দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। ‘জন্মই যাদের আজন্ম পাপ’, অপঘাতে মৃত্যুই তো নিয়তি তাদের। আমি পাহাড়ধসে নিহতদের কথা বলছি। একদিকে এ রাষ্ট্রের একদল মানুষ মাথা গোঁজার সামান্য ঠাঁই খুঁজতে পাহাড়ের মৃত্যুফাঁদকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাউক) ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (খুউক)সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ভূমি অধিগ্রহণ করে আবাসিক প্রকল্প গ্রহণ করে নামমাত্র মূল্যে একজনকে ৫-১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পের সুবাদে বরাদ্দকৃত প্লটে নিজে কিংবা ডেভেলপারকে দিয়ে বাড়ি বানিয়ে অনেকেই অনেক অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হচ্ছেন কিংবা প্লট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যাচ্ছেন। আবাসিক প্রকল্পগুলো প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে মুষ্টিমেয় কিছু লোককে বিত্তশালী বানিয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো ছোট, দরিদ্র ও অপ্রতুল ভূমির দেশে একজনের জন্য একটি অ্যাপার্টমেন্টই যথেষ্ট নয়? বাংলাদেশ এক অকল্পনীয় মাত্রার জনঘনত্বের দেশ। ১৪১ কোটি জনসংখ্যার চীনে প্রতি এক কিলোমিটারে বাস করে মাত্র ১৪৫ জন। ভারতের জনঘনত্ব প্রতি কিলোমিটারে ৩৬৪, পাকিস্তানের ২৪৫, ভুটানে ৪৬, আর নেপালে মাত্র ১৯। অথচ বাংলাদেশে এখন এক কিলোমিটার জায়গায় বাস করছে ১ হাজার ১২০ জন মানুষ। এমন জনঘনত্বের দেশে একজন যখন অনেকজনের সম্পদ ভোগ করবে তখন সমাজ-রাষ্ট্রে সম্পদের অসম বণ্টনের কারণে একদল বঞ্চিত হবে, সম্পদের অভাবে কষ্টভোগ করবে, বেঘোরে মরবে এটাই তো স্বাভাবিক। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, The world has enough for everyone’s need, but not enough for everyone’s greed. একজনকে একটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া কেবল ভ্রান্তনীতিই নয়, বৈষম্যমূলক, মানবাধিকার ও সংবিধান পরিপন্থী। একইসঙ্গে টেকসই উন্নয়নের বিরুদ্ধেও। আবাসিক প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের ভূমিহীন, গৃহহীন করে দেওয়া হয়। জীবন-জীবিকাবঞ্চিত করা হয়। ফলে এটি মানবাধিকার পরিপন্থী। এটি বৈষম্যমূলক, কেননা বরাদ্দের ক্ষেত্রে নানা কোটার ব্যবস্থা থাকে এবং প্লট স্বল্পতার কারণে সমযোগ্যতাসম্পন্নকেও বাদ দিতে হয় নানা কৌশলে। সংবিধানে কোটার ব্যবস্থা রয়েছে সমাজের পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীকে অগ্রসর করার লক্ষ্যে আর সরকারি আবাসিক প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় মন্ত্রী, এমপি, সরকারি আমলাসহ অপেক্ষাকৃত অগ্রসর গোষ্ঠীকে। এটি টেকসই উন্নয়নের পরিপন্থী, কেননা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই সম্পদ ব্যবহার করতে হবে। এভাবে একজনকে ৫-১০ কাঠার প্লট বরাদ্দ দিতে থাকলে একসময় পরবর্তী প্রজন্মকে প্লট দেওয়া দূরে থাক, বরং কৃষি জমির অভাবে চরম খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে হবে।  

২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে। দিনে ২২০ হেক্টরের বেশি কৃষি জমি অকৃষি খাতে যাচ্ছে। বছরে কমছে ৮২ হাজার হেক্টর জমি। যা মোট জমির এক ভাগ। নির্মাণ কাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ১০ বছরে আবাদি জমি বিলুপ্তি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিকল্পনা না থাকায় ঘরবাড়ি তৈরির জন্য অধিক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি ভূমি। প্রতিবছর ৩০ হাজার ৮০৯ হেক্টর জমি আবাসন খাতে যুক্ত হচ্ছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০। বসতবাড়ি এলাকার পরিমাণ ১৯৯৬-২০০৮ সময়কালে তিন লাখ ৫২ হাজার একর থেকে বেড়ে ছয় লাখ ৭৭ হাজার একরে দাঁড়িয়েছে। সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৭২-২০০৯ সাল পর্যন্ত ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৬ একর জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় বলা হয়, দেশে মোট জমির পরিমাণ ১৪ দশমিক চার মিলিয়ন হেক্টর। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে এ জমি ভাগ করলে জনপ্রতি পাবেন ২৪ শতাংশ, চাষযোগ্য জমি পাওয়া যাবে ১৫ শতক। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো, বছরে বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। কমছে দুই লাখ একর কৃষিজমি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৮৬ সালে আবাদযোগ্য জমি ছিল ৮১ লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর। ২০০০ সালে তা কমে ৭১ লাখ ৯ হাজার হেক্টরে আসে। ২০০৩ সালে ৭০ লাখ ৮৭ হাজার হেক্টরে এসে দাঁড়ায়। গড়ে প্রতিবছর ৪০ হাজার একর আবাদি জমি হারাচ্ছে। এখনই মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অতি সামান্য। তারপরও যদি কৃষি জমি এমন দ্রুত হারে কমতে থাকে, তাহলে এই জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দেওয়া একসময় কষ্টকর নয়, রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এমনিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। আর সে কারণে সাগরতীরের অপেক্ষাকৃত নিচু জমি লোনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতেও তার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশই লোনা পানিতে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। লোনা পানি ক্রমে দেশের মধ্যাঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফসল, উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর মরুকরণের প্রভাব ক্রমেই বেশি করে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবছর নদীভাঙনে একহাজার হেক্টর ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ঘরছাড়া হচ্ছে ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। এমনটি চলতে থাকলে ২০২৫ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৫৭৫ বর্গকিলোমিটার ভূমি নদীগর্ভে বিলীন হবে, যার অর্ধেকেরও বেশি থাকবে কৃষিজমি। সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন  (ইজিআইএস) হিসাব অনুসারে, ২০১০ সালে ১ হাজার ৬৫৫ হেক্টর জমি ভাঙনের শিকার হয়। ২০০৯ ও ২০০৭ সালে এ সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ১৭৮ ও ২ হাজার ৭৬৬ হেক্টর।

আবাদি জমির পরিমাণ যখন প্রায় ১০ মিলিয়ন হেক্টর ও জনসংখ্যা সাড়ে সাত কোটি ছিল তখনই বঙ্গবন্ধু এ ছোট দেশে এত মানুষ নিয়ে চিন্তা করতেন। সাবেক সিএসপি কর্মকর্তা মনোয়ারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, মাঝে মধ্যে গণভবনে দেখতাম, বঙ্গবন্ধু অফিসের দেয়ালে টানানো বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছেন। একদিন আমি কাছে যেতেই আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘বাংলাদেশটা খুব ছোট, তাই না? চলো, একবার উপকূলের চরগুলো দেখে আসি।’ একদিন হেলিকপ্টারে তার সফরসঙ্গী হলাম। বঙ্গবন্ধু পাইলটকে বললেন, ‘উপকূলে যেখানে ছোট ছোট চর পড়েছে, সেগুলো দেখতে চাই।’ মনে পড়ে, প্রথমে চর কুকড়ি-মুকড়ি, পরে নিঝুম চর (দ্বীপ) নামে একটি সদ্য জেগে ওঠা চরে হেলিকপ্টার নামল। বঙ্গবন্ধু কিছুক্ষণ চরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বাড়িঘর নেই, মাঝেমধ্যে কাশবনের মতো কিছু ঝোপঝাড় আর জেলেদের দু-একটি কুঁড়েঘর। তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো, তিনি কিছু একটা ভাবছেন। পাইলটকে বললেন, চরের প্রান্ত থেকে চারপাশে যতদূর সমুদ্রের তলদেশ দেখা যায়, ততদূর হেলিকপ্টার ঘুরিয়ে আনতে। আমরা দেখলাম, অনেক দূর পর্যন্ত সমুদ্র অগভীর, বিশাল চর জেগে উঠেছে। এরপর বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের দেশটা এখন ছোট। কিন্তু এই বিশাল এলাকায় বাঁধ দিয়ে দিয়ে যদি জমিগুলো উদ্ধার করতে পারি, তাহলে আরেকটি বাংলাদেশ জেগে উঠবে।’

সাড়ে সাত কোটি এখন ১৬ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। ১০ মিলিয়ন আবাদি জমি কমতে কমতে ৭.৮৭ মিলিয়নে হেক্টরে দাঁড়িয়েছে, আর আমরা একজনকে ৫-১০ কাঠা প্লট বরাদ্দ দিয়ে আত্মঘাতী অবিমৃশ্যকারিতায় লিপ্ত হয়েছি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। রাজউক-এর পূর্বাচল প্রকল্প প্রায় ৭ হাজার একর জায়গা নিয়ে। গড়ে একজনকে ৫ কাঠার প্লট দিলে ৮৪ হাজার ৭০০ জনকে প্লট দেওয়া সম্ভব। বাস্তবে সংখ্যা আরও কম হয়েছে নানা সুবিধা সৃষ্টি করতে। বহুতল ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করে প্রতি ৫ কাঠা যদি ৪০ জনকে দেওয়া হতো তাহলে ৩৩ লাখ ৮৮ হাজার জনকে আর ৩০ জনকে বরাদ্দ দেওয়া হলে ২৫ লাখ ৪১ হাজার জনকে কেবল পূর্বাচলেই আবাসনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যেতো। সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলো তাদের ভ্রান্তনীতির কারণে মাত্র কয়েক লাখ মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। অথচ এই একই জমিতে বহুতল ভবন করে কয়েক কোটি মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে পারতো। এতে কৃষিজমি সুরক্ষা পেতো, আবার আবাসন সমস্যারও সমাধান হতো। পৃথিবীর অনেক দেশ পর্যাপ্ত ভূমি থাকা সত্ত্বেও ভূমি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধননীতি গ্রহণ করেছে। আর অতি অপ্রতুল ভূমির বাংলাদেশ হাঁটছে তার উল্টোপথে। আমরা একদিকে কতিপয়কে বিত্তশালী ও কোটিপতি করার এক আত্মঘাতী নীতি অনুশীলন করে চলেছে, আর অন্যদিকে একদলকে জীবন্ত সমাধিস্থ হতে মৃত্যু উপত্যকায় ঠেলে দিয়েছে।  

আমাদের অবিমৃশ্যকারিতায় একদল মানুষ সমতল ছেড়ে পাহাড়ের মৃত্যু ফাঁদকে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসাবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, পাহাড়ের সঙ্গে যাদের জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক সেই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কিছু বঞ্চিত মানুষও মৃত্যু উপত্যকাতেই বসতবাড়ি গড়তে বাধ্য হয়েছে। পাহাড়ধসে মৃত্যু নিয়ে অনেক গবেষণা, লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে আদম সন্তানের জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়ার নিয়তি মৃতদেহ উদ্ধার, সংবাদ মাধ্যমে লেখালেখি, শোক প্রকাশ, টক শো-তে আলোচনার ঝড়, দু-একটা তদন্ত বা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন, কমিটির প্রতিবেদন প্রণয়ন, কিছু ত্রাণ বিতরণ এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ওষ্ঠসেবার ফাঁদে আটকা পড়েছে। ঘটনার পর কয়েকদিন এ নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হয়, তারপর নতুন কোন জাতীয়-আন্তর্জাতিক ঘটনার নিচে পাহাড় ধস নিজেই চাপা পড়ে। নতুন বছরে নতুন করে পাহাড়ধস না হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে অপেক্ষা।

প্রসঙ্গত, মানবাধিকার সরকারের ওপর তিন ধরনের দায়িত্ব অর্পণ করে– মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সুরক্ষা প্রদান ও পরিপূর্ণ। নাগরিক যখন নিজের সক্ষমতায় অধিকার ভোগ করতে পারে তখন রাষ্ট্রের তাতে হস্তক্ষেপ না করাই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। অধিকার লঙ্ঘন যেন না হয়, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও লঙ্ঘিত হলে প্রশাসনিক বা বিচারিক প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। এ দুয়ে মিলে হলো সুরক্ষা প্রদান। আর অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা শারীরিক অক্ষমতার কারণে কোনও নাগরিক যখন অধিকার ভোগ করতে অসমর্থ হয়ে পড়ে, তখন তার জন্য রাষ্ট্রের তরফ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণকে বলে রাষ্ট্রের পরিপূরণমূলক দায়িত্ব পালন। পাহাড়ের মৃত্যু ফাঁদে বাস করা জনগোষ্ঠী সন্দেহাতীতভাবেই রাষ্ট্রের পরিপূরণমূলক দায়িত্বের আওতাভুক্ত। রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে বঞ্চনার কোন পর্যায়ে গেলে মানুষ মৃত্যুকূপকেই বাসস্থান হিসেবে বেছে নেয়।

এ বছর পাহাড় ধসে ইতোমধ্যেই ১৬ জনের মুত্যু হয়েছে। ১২ জুন রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধসে ১১ জন ও ২৪ জুলাই রাতে পাহাড়ধসে কক্সবাজার সদর আর রামুতে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর বিলম্ব নয়। রাষ্ট্রের পরিপূরণমূলক দায়িত্বের বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখনই শুরু করতে হবে। পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের তাদের জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত এলাকার আশপাশে যৌক্তিক দূরত্বে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য সরকারি অর্থে টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে পাহাড়ের নিরাপদ স্থানগুলোতে গুচ্ছগ্রাম তৈরি করা যেতে পারে। পাহাড় ধসে মৃত্যু চুপিসারে নয়, আমাদের জ্ঞাতসারেই হানা দেয়। বসতবাড়ি ছেড়ে আসার জন্য কেবল মাইকিং করেই এ মৃত্যু থেকে আমাদের দায়মুক্তি মিলবে কি? পাহাড় ধসে জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়া অপঘাতে মৃত্যু নয়, এটি আমাদের আত্মঘাতী বৈষম্যমূলকনীতি, লোভ আর অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড। অস্বীকার করার জো নেই, এ হত্যার দায়ে আমরা কম বেশি সবাই দায়ী।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain@justice.com


/এসএএস/এমওএফ/এমএনএইচ/

x