অধিকার-অনধিকার

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা ১৪:০২ , আগস্ট ০৮ , ২০১৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাপথ তুমি কার? এমন একটা প্রশ্ন করলে সহজ উত্তর আসবে, পথ পথিকের। তা সত্য। কিন্তু বড় ও বিস্তৃত ভাবনার জায়গা থেকে দেখলে পথ আসলে জন-স্থান। সম্প্রতি স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে যে আন্দোলন করেছে, তা আমাদের সামনে সত্য তুলে এনেছে। করুণ সত্য।
তারা যে পথের কথা জোরে, নিষ্পাপ দৃষ্টিতে, সততার মাপকাঠিতে বলতে চেয়েছে তা হলো এ দেশের পথ হলো এমন একটি জন-স্থান যেখানে যা ইচ্ছে তাই কার্যত অবাধে করা চলে। এই পথে দাঁড়িয়ে থাকলে উন্মাদের মতো চালিয়ে নিষ্পাপ মানুষকে খুন করে নিরাপদে চলে যেতে পারে যেকোনও বাস, মিনিবাস, ট্রাক বা টেম্পো চালক। এমন গড্ডলিকা প্রবাহ চলছিল। আসলে চলছেই। শুধু কিশোর-কিশোরীদের কথায় আমাদের সরকার সংকেত দিলো, পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তন কতটা জনমুখী হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।
পরিবহন শ্রমিকরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্রয়ে বলপূর্বকভাবে সড়ক পথে তাদের আধিপত্য বিস্তার করার যে সংস্কৃতি চালু করেছে এ দেশে, জনতার নিরাপত্তার স্বার্থের কথা বিবেচনা করলে তা অসম্ভব ছিল। কিন্তু সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক শক্তি তাদের সেই পেশিশক্তির জায়গাটা তৈরি করে দিয়েছিল বলেই। রাষ্ট্র এত উন্নয়নের গল্প মানুষকে জানানোর পর দেখা গেলো মৌলিক জায়গাসমূহে আমরা কতটা পিছিয়ে আছি। একটা জাতি কতটা সভ্য তার নিদর্শন হলো তার পরিবহন ব্যবস্থা, তার পথঘাট কতটা সুশৃঙ্খল। আমরা কতটা অসভ্যতায় বিচরণ করেছি তার প্রমাণ মিললো যখন শিক্ষার্থীদের হাতে আমাদের মিডিয়ার গাড়ি, বিচারপতি, মন্ত্রী, এমপি, এমনকি পুলিশ কর্তাদের গাড়ি ধরা পড়লো। এসব গাড়ির কোনোটার ফিটনেস নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই, আরও   সব জরুরি কাগজপত্র নেই। বেসামাল ঢাকা শহরে শৃঙ্খলা মেনে কীভাবে গাড়ি চালাতে হয়, কীভাবে লাইন মেনে চলতে হয় ছোটরা তা শিখিয়ে দিলো বড়দের। 

বার্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পথ বা সড়ক নিয়ে এ দেশে যে ‘কু-নাট্যটি’ ক্রমাগত অভিনীত হয়, তার গভীরে আছে এক অধিকারের যুক্তি। পরিবহন শ্রমিকরা দখল করে রেখেছে, এরা সংগঠিত, এখানে মালিক-শ্রমিক ভয়ঙ্কর ঐক্য। তাদের প্রতিনিধিরা মন্ত্রিসভায় তথা ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে, আইনসভায় আছে, প্রশাসনে আছে, সরকারি দলে আছে, বিরোধী দলে আছে। তারা পছন্দমাফিক চলছিলেন এবং এ দেশের সড়কের ওপর তারা যেন জন্মগত অধিকার তৈরি করেছিলেন। সম্পূর্ণ অনধিকার হতে যে দখল কার্যের উৎপত্তি এবং বিকাশ, তা একমাত্র পেশি আস্ফালন ছাড়া অন্য কোনও প্রকার অধিকার সৃষ্টি করে না। অথচ দখলদারগণ সেই অধিকারের নামে সবকিছু করেছে বিনা বাধায়। সুশাসন ঠিক কী পরিমাণ অসহায় হলে এমন কাণ্ড সম্ভব, তা আমরা সাধারণ জনতা বুঝলাম, আইনশৃঙ্খলার লোকজন বুঝলেন এবং পণ্ডিতেরা বুঝলেন। তবে দেশ যারা চালায় সেই রাজনীতিবিদরা তারা হাড়েমজ্জায় তা বুঝেছেন কিনা তা বলার সময় আসেনি।

প্রধানমন্ত্রী সংকটটি বুঝেছেন বলেই ধারণা করি। তাই যে আইনটি অনেক দিন ধরে পড়েছিল সেই আইনটির খসরা মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দিলেন সোমবার। তবে এর মাধ্যমে যে খুব বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে সড়ক নামের জনস্থানে তা বলা যাচ্ছে না। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলেই দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি। আইনে রাখা হয়েছে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে পাঁচ বছরের জেল। অথচ উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল শাস্তি ৭ বছর হতে হবে। নতুন আইনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করা হলো না। আবার সর্বনিম্ন শাস্তির দাবিও মানা হয়নি। ফলে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি কমে যাওয়ার সুযোগ থেকেই যাচ্ছে। আইনে বলা হয়েছে, ফৌজদারি হত্যা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেটা হবে তদন্ত সাপেক্ষে ৩০২ ধারায়। এটা কি আমাদের দেশে আদৌ সম্ভব? সড়ক দুর্ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে দরিদ্র পরিবারের মানুষের। তারা কি পারবে কোনও মামলাকে ৩০২ ধারায় নিয়ে যেতে? ফলে স্বাভাবিকভাবেই আইনটিকে তাদের পক্ষে বুঝতে পেরে স্বাগত জানিয়েছে পরিবহন মালিক শ্রমিকরা।

লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে ৬ মাসের জেল, আর নকল লাইসেন্স ব্যবহার করলে ২ বছরের জেল। তাহলে তো দেখা যাচ্ছে নকল লাইসেন্সের হিড়িক পড়ে যাবে। দাবি ছিল চালকের শিক্ষাগত যোগ্যতা হবে কমপক্ষে এসএসসি। বলা হলো হবে এইট পাস। এ দেশে এইট পাস সনদ জোগাড় করা কত সহজ তা কে না জানে? 

আসলে দেশ যারা চালান তাদের যেমন কঠোর হতে হয়, আবার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হয়। রাস্তাকে যারা নিজেদের আধিপত্য ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের জায়গা বানিয়েছে, প্রত্যাশা ছিল শিশুদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতি রাষ্ট্র একটু কঠোর হবে। কিন্তু তার প্রতিফলন দেখা গেলো না এই প্রস্তাবনায়। তারপরও একটি আইন হতে যাচ্ছে, সেটাই বড়। তার প্রয়োগ কতটা হবে সেটা বলা যাবে যদি দুর্ঘটনার ঘটনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না তাকে, যদি প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে জনমানুষ বঞ্চিত না হয়।

অনেকেই খুব বাহবা দিচ্ছে যে এই হচ্ছে সেই হচ্ছে। আসলে রাজনৈতিক করতালি সুশাসনের বিনিময়ে আসতে পারে না। প্রশাসনিক সততা ও বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা যায় না।

পরিস্থিতি বেশ প্রতিকূল। ভোটের দিন সমাগত। তাই জনমানসের কাছে শাসককুলের ইতিবাচক ছবিটি তুলে ধরার এখনই সময়। এই শিশু-কিশোররা আগামীর এক বিশাল প্রজন্ম। এদের হৃদয়ে যদি ক্ষত সৃষ্টি হয় তাহলে এর পরিণাম কারও জন্য সুখের হবে না। মানবিকভাবে দেখতে হবে সবকিছু। সরকার-বিরোধী বিদ্বজ্জনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ালে ক্ষতি নেই শাসকদের। মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পাশে পাওয়ার প্রচেষ্টাও প্রযোজন। নিয়মিতভাবে উসকানি দিয়ে যারা পরিস্থিতি বেসামল করতে চায় তাদের পরাভূত করতেই দরকার গঠনমূলক রাজনীতি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমওএফ/

x