তবু তাল গাছটা আমার

রেজানুর রহমান ১৫:৩১ , আগস্ট ০৮ , ২০১৮

রেজানুর রহমানসন্ধ্যার পর বিমানবন্দর সড়ক সাধারণত এত ফাঁকা থাকে না। বাস, ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়িতে ঠাসা থাকে গোটা রাস্তা। হঠাৎ ব্যতিক্রম চোখে পড়লো। রাস্তাটা যেন একটু বেশিই ফাঁকা। ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া বাস, ট্রাক নেই বললেই চলে। সিএনজি অটোরিকশায় গন্তব্যে যাচ্ছি। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম- ভাই, রাস্তাটা যেন একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। ঘটনা কী? ড্রাইভার বিরস মুখে জবাব দিলো, শহরে ট্রাফিক সপ্তাহ চলতেছে। রাস্তায় ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি পাইলেই কেস দিতেছে ট্রাফিক পুলিশ। তাই ভয়ে অনেকে গাড়ি রাস্তায় নামায় নাই। অটোরিকশার ড্রাইভার এমনভাবে কথাটা বললো, তাতে মনে হলো ‘ট্রাফিক সপ্তাহ’ ব্যাপারটা তার মনঃপূত নয়। আরও মনঃপূত নয় ড্রাইভিং লাইসেন্স তল্লাশি করা। কৌতূহলি হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই ট্রাফিক সপ্তাহ নিয়ে আপনি মনে হয় বেশ বিরক্ত? উত্তরে সে বললো, না ভাই আমি মোটেও বিরক্ত না। আমি আইন মানতে চাই। কিন্তু আইন যেন শুধু আমার একার জন্য না হয়। আপনি আমার একটা প্রশ্নের জবাব দেন তো! রাস্তার আইন নিয়া এখন যা যা বলা হইতেছে তার তো সবকিছুই আগে ছিল। আমরা কি সবাই সেই আইন মানছি? ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় গাড়ি চালানো যাবে না। এই সাধারণ নিয়মটাও তো আমরা মানি না। পত্রিকায় পড়লাম, গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার জন্য অথবা লাইসেন্স ‘রিনিউ’ করার জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে লম্বা লাইন পড়েছে। তার মানে আমরা অনেকেই রাস্তার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম না। এখন চাপে পড়ে শ্রদ্ধা দেখাইতেছি। ভবিষ্যতেও কি এই সিচুয়েশন থাকবে?

অটোরিকশার ড্রাইভার মারাত্মক একটা প্রশ্ন করেছে। এই প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই। সে তো ঠিকই বলেছে। রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে আইন আছে। গাড়ি চালাতে হলে ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলবে না। এটা তো আর কঠিন কোনও নিয়ম না। কিন্তু স্বাভাবিক এই নিয়মও কি পালন করেছি আমরা? স্কুল কলেজের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের দেখালো যে আমরা বছরের পর বছর ধরে ভুল করছি তখন যেন টনক নড়লো। এখন আমরা গাড়ির ফিটনেসের জন্য দৌড়াচ্ছি। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়াচ্ছি। একটি পত্রিকার রিপোর্টে পড়লাম, ‘চট্টগ্রামে নবায়নের জন্য শত শত গাড়ি বিআরটিএ-মুখী। ঢাকাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি স্থানে গাড়ির ফিটনেস নবায়নের হিড়িক পড়েছে’। একটি পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, একজন প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের গাড়িও ফিটনেসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এর আগে প্রতিষ্ঠানটি হয়তো ওই গাড়ি দুটির ফিটনেস নেওয়ার তাগাদাই অনুভব করে নাই।

অটোরিকশা চলছে। হঠাৎ ড্রাইভার যেন পাহাড় সমান ক্ষোভ উগড়ে দিলো আমার সামনে। ‘ভাই ছোট মুখে বড় কথা বলতেছি। আমারে মাফ কইর‌্যা দিয়েন। যারা আইনের রক্ষক তারাই এই দেশে আইন ভাঙে বেশি। যত ওপরে যাবেন দেখবেন সহজে কেউ আইনের তোয়াক্কা করেন না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরে আমি ভাই স্যালুট করি। তিনি দেশটারে অনেক দূর আগায়া নিছেন। কিন্তু অন্যেরা তো ভাই দেশের কথা বাদ দিয়া আখের গোছাইতে ব্যস্ত। পরিবহন সেক্টরের কথাই যদি ধরি তাহলে যত ওপরে যাবেন দেখবেন আইন মানার ক্ষেত্রে তাদের কোনও আগ্রহ নাই। বরং আইন ভাঙার ক্ষেত্রেই তাদের যত আগ্রহ। এই ঢাকা শহরে যত গাড়ি চলে তার অধিকাংশের মালিক প্রভাবশালী কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা। আর তাই তাদের অনেকেই আইন মানতে নারাজ। ভাবটা এমন আমি তো আইনের লোক। আমার আবার আইন মানতে হবে নাকি? শুধু রাজনৈতিক দলের নেতা না ভাই, পুলিশের সেপাই থেকে শুরু কইর‌্যা বড় বড় অনেক অফিসারের নামে বেনামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি রাস্তায় ভাড়া চলে। এরাও অনেক সময় আইনের তেমন তোয়াক্কা করে না। ‘অমুক স্যারের গাড়ি’ এই যোগ্যতাই যেন গাড়ির ফিটনেস, এটাই যেন ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স।

অটোরিকশার ড্রাইভারকে থামিয়ে দিলাম। কারণ, আমার মনে হলো লোকটা একটু বেশি বেশি কথা বলছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো সে তো যথার্থই বলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহন ব্যবস্থায় যত অনিয়ম ধরা পড়েছে তার অনেক কিছুর সঙ্গেই প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কম বেশি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। নামকরা অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের গাড়ির ফিটনেস নাই। যে ড্রাইভার গাড়ি চালায় তাদের অনেকের ‘পাকাপোক্ত’ ড্রাইভিং লাইসেন্স নাই। ভাবটা এমন, সরকারের জন্যই তো কাজ করছি। সেজন্য আবার ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে? গাড়ি তো চলছে। তার আবার ফিটনেসের প্রয়োজন কী? এটাই চরম অনিয়মের লক্ষণ। যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা।

সড়ক ব্যবস্থায় আইন মানার ক্ষেত্রে আমরা অনেকেই এখন আন্তরিকতা দেখাচ্ছি। আর তাই সড়ক ব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এই যে একটা পরিবর্তনের সূচনা করলো ওদের অভিনন্দন জানানোর জন্যও কি আমরা ছোট ছোট আরও অনেক পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারি না? যে জন্য কোনও অর্থকড়ির প্রয়োজন পড়বে না। প্রয়োজন পড়বে পজিটিভ মানসিকতার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটা কথা মনে পড়ছে। একটি অনুষ্ঠানে পানির অপচয় রোধ করার জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘শাওয়ারে গোসল করলে পানির অপচয়  হয়। আর তাই আমি এখনও বালতিতে পানি ভরে গোসল করি। যতটুকু পানি লাগে ততটুকুই খরচ করি’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দৃষ্টান্তকেও তো আমরা অনুসরণ করতে পারি। পরিবার থেকেই চর্চাটা শুরু হতে পারে। কাপড় শুকানোর জন্য এখনও আমরা অনেকে সারা রাত গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখি। ঘরে কোনও কাজ নেই অথচ লাইট আর ফ্যান চলছেই। এই মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিরও তো বদল প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা সব সময় গাড়ির চালককেই দায়ী করি। কিন্তু আমরা পথচারীরাও কি এজন্য দায়ী নই? ব্যস্ত রাস্তায় হুট করে দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হতে চাই। এমন অবস্থায় দুর্ঘটনায় পড়লে দায়টা তো পথচারীরও থেকে যায়। এমন আরও ছোট ছোট অনেক ঘটনা আছে যার প্রতি আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এতো এতো সতর্কবাণীর পরও তো ফর্মালিনমুক্ত ফলমূল, শাকসবজি, মাছ কি আমরা সহজে পাচ্ছি? ফর্মালিনও তো এক ধরনের ঘাতক। সড়কের ঘাতককে দেখা যায়, ফর্মালিন নামক ঘাতককে দেখা যায় না। পার্থক্য এখানেই।

আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের কি কি করা দরকার। ওরা আসলে অন্যায়, অনিয়ম দেখতে চায় না। কাজেই তাদের স্যালুট জানাতেও তো আমরা বড়রা নিজেদের পজিটিভভাবে বদলাতে পারি। কিন্তু তা কি আদৌ সম্ভব?

গন্তব্যে পৌঁছে সিএনজি অটোরিকশা চালকের কথায় যেন একটু হোঁচট খেলাম। বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশায় করে গুলশান নিকেতনে আমার বাসায় এসে মিটারে যে ভাড়া উঠেছে তা দিতে গিয়েই বাধলো বিপত্তি। মিটারে ভাড়া উঠেছে প্রায় আড়াইশ টাকা। কিন্তু ড্রাইভার দাবি করছে ৬শ টাকা। ড্রাইভারকে আমি যতই বলি আপনি তো মিটার শো করে এসেছেন, কাজেই নিয়ম অনুযায়ী মিটারেই তো ভাড়া নেবেন! ডাইভারের একই কথা, মিটারের নিয়ম সে মানবে না। কারণ, মিটারে তার নাকি পোশায় না। তাকে যতই নিয়মের কথা বলি সে ততই ক্ষুব্ধ হতে থাকে। অথচ একটু আগে সেই নিয়মের নানা কথা বলে এসেছে। ভাবটা এমন, আপনি যত কথাই বলেন না কেন তাল গাছটা কিন্তু আমার।

লেখাটি যখন লিখছি তখনই দেশের একটি শীর্ষ দৈনিকের প্রথম পাতায় একটি ছবি নজরে এলো। ছবির ক্যাপশনে লেখা ‘রাজধানীর এয়ারপোর্ট রোডের এই জায়গার কাছাকাছিই ঘাতক বাস পিষে মারে মীম ও রাজুকে। সেই ঘটনার জের ধরে খুদে শিক্ষার্থীরা এক সপ্তাহ সড়ক নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনে কাঁপিয়ে রাখে দেশ। গতকাল সেই সড়কেই পুলিশের গাড়ি উল্টো পথে দেখা যায়’। 

প্রিয় পাঠক, কি বুঝলেন? আপনাদের মন্তব্য আশা করছি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো।

/এসএএস/এমওএফ/

x