আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ট্রেন ও মনোনয়ন

মোস্তফা হোসেইন ১৭:৪০ , সেপ্টেম্বর ১০ , ২০১৮

মোস্তফা হোসেইনবরগুনা-১ ও দিনাজপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় এমপিকে দলের স্থানীয় কিছু নেতাকর্মী এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পর্যন্ত দলীয় কোন্দল সারাতে নির্দেশ দেওয়ার পরও যখন দলীয় কোন্দল শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি, তাই নির্বাচন প্রাক্কালে ধরে নেওয়া যায়, বিদ্রোহী প্রার্থীদের পথ রোধ করা সম্ভব হবে না। বারবার নির্দেশ দেওয়ার পরও যখন নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতার নামে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা হচ্ছে, সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি দলের নির্বাহী পরিষদের সভায় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। 
আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য–কারও ক্ষোভ থাকতেই পারে। সেটা নেতৃত্ব লাভের প্রতিযোগিতার কারণেও হতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু তা যখন দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পর্যায়ে চলে যায়, তখন দলকে মুখ বুঁজে থাকার সুযোগ নেই। এটাও তাদের কথা।

আবার দলের সাংগঠনিক শক্তির কথা চিন্তা করে তড়িঘড়ি করে ব্যবস্থাও নেওয়া যায় না। যে কারণে একবছরেরও বেশি সময় ধরে কোন্দল মিটিয়ে কাজ করার আহ্বান জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মনে করা যায়, আহ্বান পর্যায়ে থাকবে কয়েকদিন। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের উদ্বেগ আছে, সেটা বোঝা যায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়েদুল কাদেরের সাম্প্রতিক সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে। সেখানে সিনিয়র নেতাদের নিয়ে তিনি যে সভা করেছেন, সেখানে স্পষ্টভাবে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। একইসময়ে বরগুনা ও দিনাজপুরে দুই এমপিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পর বৃহত্তম দলটি নড়েচড়ে বসেছে আরও।

ট্রেনযোগে সর্বশেষ নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছেন সাধারণ সম্পাদক। দিনাজপুর রওনা হওয়ার পথে তিনি প্রথমই আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থীর জায়গা নেই বলে সতর্ক করেছেন। কিন্তু তার এই হুঁশিয়ারি কি বিদ্রোহীরা আমলে নেবে? তিনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন।

আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, আগেও তারা এভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীও হয়েছে। অধিকাংশ জায়গায় বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয়েছেন। এমনও দেখা গেছে, দলের মনোনীত প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট বিদ্রোহীর চেয়ে অর্ধেক কিংবা কোথাও তার চেয়েও কম। আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে, দলের এই বিভক্তি বিরোধী দলের বিজয়কে নিশ্চিত করেছে। যে বিদ্রোহী প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন, তিনি নিজের ক্ষতি করার সঙ্গে সঙ্গে দলেরও ক্ষতি করেন। আবার যে প্রার্থী বিদ্রোহ করে বিজয়ী হয়েছেন, তিনিও কিন্তু কম করেননি। অন্যদিকে, বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাকে দলভুক্ত করে নিয়েছে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অতীতের এই উদাহরণ বিদ্রোহীদের উৎসাহিত করেছে। আজকে যে আগাম বিদ্রোহ,  সেটা তারই সূত্র ধরে হয়েছে, এটা কি অস্বীকার করা যাবে? এক্ষেত্রে রাজধানীর একটি আসনের কথা সবার আগে বলতে হয়।

লালবাগ এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন হাজী সেলিম। তিনি বিদ্রোহ করেই বিজয়ী হয়েছেন। তিনি কিন্তু বহাল তবিয়তে আছেন। স্বতন্ত্র তকমা লাগিয়ে নিলেও তিনি আওয়ামী লীগেরই এখনও।

সাধারণ সম্পাদক দিনাজপুরের নেতা-কর্মীদের সিলেটের নেতা-কর্মীদের মতোই ‘কড়ামিঠা’ কিছু কথা হয়তো বলেছেন। তাতে কাজের কাজ খুব একটা হবে বলে মনে হয় না। এটা অতীতের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাই।

এটা ঠিক আসন্ন নির্বাচন, ২০০৮ কিংবা ২০১৩ নির্বাচনের চেয়ে আলাদা হবে। সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে–অন্তত অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের। এক্ষেত্রে দলীয় কোন্দল ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে দলকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সেটা হতে হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে। আওয়ামী লীগ মনোনয়ন পদ্ধতিতে কিছুটা সংস্কার করেছে। প্রচলিত পদ্ধতি হয়তো আগের তুলনায় উন্নত। কিন্তু সেই পদ্ধতি তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের আশানুরূপ আশ্বস্ত করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে।

৩০০ আসনেই এ মাসের মধ্যে কাউন্সিলরদের ভোট গ্রহণ হতে পারে। সেখানে কোনও মনোনয়ন প্রার্থী থাকবে না। কাউন্সিলররা নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে গিয়ে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবেন। তাদের নির্বাচিত প্রার্থীদের ক্রমানুগতিক ফল সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রেই তা প্রকাশ করা হবে। জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধিরা সত্যায়িত করে দুটি নাম তাৎক্ষণিক কেন্দ্রে পাঠাবে। কেন্দ্র থেকে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। এই পদ্ধতিতে ক্ষোভ প্রসমন হতে পারে।

এই পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমত স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতিফলিত হবে। এই পদ্ধতিতে মনোনয়ন হলে কেউ বিদ্রোহী হলে, দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সহানুভূতি-সহযোগিতা পাবে বলে  বলে মনে হয় না। কারণ তৃণমূলের অভিমতকে অস্বীকার করার মতো মানসিকতা খুব কম মানুষেরই থাকবে।

কিছুদিন আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ঢাকার দেওয়ালের পোস্টার লাগানো প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ঘটনা কী, ঢাকার বাইরের কোনও নেতা ঢাকায় এভাবে পোস্টারিং করেন কোন উদ্দেশ্যে? সেটা তিনিও জানেন, আসলে যারা পোস্টারিং করেছেন, তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কৃপা লাভের আশায়ই করেছেন। ওবায়দুল কাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, নিজ নিজ এলাকায় তা করার জন্য। ওবায়েদুল কাদেরের এই পরামর্শ তখনই কার্যকর হবে, যখন তৃণমূলের মনোনয়নকেই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা জানেন, তৃণমূল থেকে মনোনয়ন এলেও কেন্দ্র যদি না চায় তাহলে তৃণমূলের মনোনয়ন কাজে আসবে না।

প্রশ্ন আসতে পারে, এখন নির্বাচনি প্রচারনার সময়, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার সময়, এখন এটা সম্ভব কিনা। প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় যদি প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য ভোট হয় তাহলে নির্বাচনি প্রচারণা হিসেবেও হবে সেটা অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ। এতে শুধু দলীয় নেতা-কর্মীরাই যে উদ্বুদ্ধ হবেন তাই নয়, সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও আলোড়ন তৈরি হবে। তারা দেখবে নির্বাচনি প্রক্রিয়াতেও তৃণমূলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বৃহত্তম দল হিসেবে স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি কার্যকর করে অন্যদেরও দেখিয়ে দিতে পারে, আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল। জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি হতে পারে কার্যকরী পদক্ষেপ।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

x