শিল্পী শাহাবুদ্দিনের জন্মদিন: হৃদয়তলে আসীন

দাউদ হায়দার ১৫:৪২ , সেপ্টেম্বর ১১ , ২০১৮

দাউদ হায়দারহোমার, বাল্মীকি, ব্যাসদেব, সফোক্লেশ, ভার্জিল কবে জন্মেছিলেন কোন তারিখ, মাসে, বর্ষে, আমাদের কি স্মরণ আছে? পুরাণে বা ইতিহাসেও সঠিক মাস-বছর উল্লেখ নেই। শেকসপিয়র, মিকেলেঞ্জেলো, গোইয়া, পিকাসোর জন্মের দিন-তারিখ-বছর আছে বটে, ইতিহাসে লেখা। আমরা কি ‘জন্মদিন’ মনে রাখি খুব?
রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের জন্মদিবস স্মরণ করি ভিন্ন উপলক্ষে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিন-মৃত্যুদিন ভুলে যাই। যেমন ভুলি আরও অনেকের। ভুলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বিস্মৃত। শিল্পী জয়নুল আবেদীনকে আমরা স্মরণ করছি না তাঁর জন্মদিনে, কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পভাবনায়, চিত্রকলা-ভাবনায়, চিত্রকলার বিকাশ তথা জাগরণে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান চিত্রকলার আন্দোলনে তাঁর অবদান, আজকের বাংলাদেশে বীজ থেকে মহীরুহ, নিত্যস্মরণীয়। মাথার ওপরে আকাশ, এও এক আচ্ছাদন। এই আচ্ছন্নদাতা জয়নুল। তাঁর জন্মদিনে স্মরণ করছি না ঠিকই, কিন্তু তিনিই বাংলাদেশের শিল্প তথা চিত্রকলার আসমানে সূর্য চন্দ্র। তাঁর প্রভা, তাঁর বিভা কতটা প্রখর, উজ্জ্বল, টের পাচ্ছি নানা প্রকরণে। বিভা, প্রকরণে উদ্দীপ্ত শিল্পী শাহাবুদ্দিন। আজ ১১ সেপ্টেম্বর, তাঁর জন্মদিন। তাঁর জন্মদিন বাহুল্য, তিনি কে এবং কেন আমাদের জনজীবনে, ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, সেটাই জরুরি।

শাহাবুদ্দিন নিজেই বাংলার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ভয়ঙ্কর যোদ্ধা, কমান্ডার, এসব তকমা। মুক্তিযুদ্ধ থেকে কী শিখেছেন, শিখে কী অবদান, সেটাই মূল। মূলের প্রকাশ তাঁর শিল্পে। এই শিল্পের উৎসও আছে। শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘জয়নুল স্যার (ঢাকার চারুকলা কলেজে জয়নুল আবেদীন তাঁর শিক্ষক) আমাকে কাছে ডেকে উপদেশ দেন, ‘তেজি মানুষই হবে শিল্পের রূপারোপ, রঙেরেখায়-শরীরবাহুর ছন্দে জীবনের গতির আর্তি। একজন মানুষের আকুতি যখন প্রকাশ করবে ছবিতে, মানুষটি হবে জীবন্ত। ট্রাজেডির ছবি যখন আঁকবে, মনে রাখবে তুমিও ট্র্যাজেডির অংশ। অংশভাকই শিল্প।’

স্যারের কথা, উপদেশ মনে রাখি সর্বদা। স্যার আমার প্রথম গুরু। প্রেরণা। বিশ্বের বহু শিল্পীর কাজ আমাকে উদ্দীপ্ত করে ঠিকই, কিন্তু আবেদীন স্যারের কাছে আমি ঋণী, যা অপরিশোধ্য।’

–এই স্বীকারোক্তিতে রাখঢাক নেই। কেনইবা থাকবে। পূর্বসূরিকে আরাধ্য শ্লাঘার। সেই সঙ্গে নিজস্বতা প্রকাশ বিপুল কীর্তিরই রাজত্ব, বিশিষ্টতা।

শিল্প (চিত্রকলা) সম্পর্কে মজার কথা বলেছেন সুকুমার রায়, ‘মক্ষিকাম্য মসীজীবীবৎ দৃষ্টবস্তুর হুবহু অনুকরণ করিয়া যাওয়া শিল্প নয়।’... ‘এনাটমি পার্সপেকটিভ প্রভৃতি গ্রিক-শিল্পের ঠুলি দিয়া শিল্পসাধনা’ যারা করেন প্রকৃত শিল্পী কিনা, সন্দেহ তাঁর (সুকুমার রায়ের)। শিল্পীর Facts OF Nature-ই শিল্পীর মূল এষণা। শাহাবুদ্দিনের ছবির জগত ঘটমান প্রবাহে উজ্জীবিত। তেজ ও গতির মেলবন্ধন খুব সহজ নয় চিত্রশিল্পে। শাহাবুদ্দিনের রংতুলি অঙ্কনে-রেখায় এই বিরলতা নিশ্চয় বিস্ময়কর।

জঁ্যা  কঁকতো, বহুমান্য নাট্যকার (কবিও), পাবলো পিকাসোর ‘গোলমেলে’ বন্ধু (কঁকতো খুব সমালোচক পাবলো পিকাসোর ছবির। অনেকেরই অজানা, পিকাসো নাটকও লিখেছেন)। একবার তর্কে বলেন, ‘তোমার ছবির মানুষের অবয়বে কে কারা?’ পিকাসোর উত্তর: ‘নির্যাতিত, সংগ্রামী মানুষের। প্রলেতারিয়েতের। তোমার-আমার।’

শাহাবুদ্দিনের জন্মদিন আজ (১১ সেপ্টেম্বর)। আমাদেরও প্রশ্ন: ‘আপনার ছবিতে যেসব মানুষ চিত্রিত, নানা ভঙ্গিমায়, নানা গরিমায়, নানা ক্ষোভে-বিক্ষোভে বলীয়ান, তারা কোন শ্রেণিভুক্ত? বলবেন হয়তো (আন্দাজ করছি), ‘সব দেশের জাগরিত মানুষ। এরা শ্রেণিহীন। শ্রেণিহীনতার প্রতীক। বিশ্বময় ছড়ানো জাগ্রত মানুষের প্রতিভূ। আদর্শ।’

শাহাবুদ্দিনকে ৫০ বছরের বেশি চিনি, জানি। ওঁর শিল্পকর্মে দেশকে, মানুষকে, সমাজকে, বিশ্বকে যেভাবে চিত্রিত করেছেন, সমকাল থেকে সমকালহীনতায় উত্তীর্ণ, কবির ভাষায়: ‘হৃদয়তলে আসীন তুমি।’

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

x