বিএনপি ছাড়াও নির্বাচন হবে

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৪:৪৯ , সেপ্টেম্বর ১৩ , ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীখালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কাল অনশন করেছেন তার দলের নেতারা। সেখানে নেতারা বলেছেন সবাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া নির্বাচন নয়, এমন দাবিও করেছেন নেতারা। পাপের কখনও পবিত্র ফল হয় না। গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য যারা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বক্তৃতা দিয়েছেন, প্রায় প্রেসক্লাবকে ওয়াটার লু বানান, তারা জানেন তাদের সময়েও গণতন্ত্রের চর্চা বর্তমানের চেয়েও কম ভিন্ন বেশি ছিল না।
গত ১০ বছরে কোনও নির্বাচনই স্থগিত হয়নি। যথাসময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে সব দলই অংশগ্রহণ করেছে এবং এখনও করেছে। প্রথম পাঁচ বছরের উপনির্বাচনেও বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং হবিগঞ্জে দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুর পর যে উপনির্বাচন হয়েছে তাতে বিএনপি জিতেছিল। বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার মেয়র নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরাই বিজয়ী হয়েছিল।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি বরং বিএনপি ও জামায়াত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করার জন্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল এবং তাতে ৩১৯ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তারা ১৫০টি নির্বাচনি কেন্দ্র আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার হত্যা করেছিল, পুলিশ হত্যা করেছিল। তাদের দাবি ছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন।

অথচ সুপ্রিম কোর্ট অনির্বাচিত নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর সংসদ শাসনতন্ত্র সংশোধন করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন রুটিন ওয়ার্ক করার জন্য অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠনের সংশোধনী গ্রহণ করেছিল। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াত সে ব্যবস্থা মানেনি। শেখ হাসিনা বেগম জিয়াকে আলোচনায় বসার জন্য টেলিফোন করেছিলেন। তিনি আলোচনায় বসতে সম্মত হননি। অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে মন্ত্রিসভায় যোগদানের অনুরোধ করেছিলেন, তারা তাও গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিএনপি ছাড়াই নির্বাচন হয়েছে।

বিএনপি জামায়াতের অরাজকতার কারণে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারেনি। দশম সংসদ নির্বাচনও বিএনপি মানেনি আর সরকারকেও তারা বৈধ সরকার বলেনি। অথচ গত পাঁচ বছর সারা বিশ্বই এ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। তাদের সঙ্গেই সারা বিশ্ব লেনদেন চুক্তি ইত্যাদি করেছে।

আসলে একগুয়ে বিরোধী দল নিয়ে সংসদ চালানোই কঠিন ব্যাপার। তারা মনে করে অপর দল সরকার গঠন করছে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। অনুরূপ অসহযোগিতার কারণে অনেক সময় দেশে অচলাবস্থাও সৃষ্টি হয়। বেগম খালেদা জিয়ার একগুয়ে স্বভাবের খ্যাতি আছে। এখন বেগম জিয়া জেলখানায় অসুস্থ। বিএনপি বলছে তার চিকিৎসা প্রয়োজন। আবার বেগম জিয়া শর্ত দিচ্ছেন বিশেষায়িত হাসপাতাল ছাড়া কোনও সরকারি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নেবেন না।

কোনও কয়েদিকে সরকার সরকারি হাসপাতাল ছাড়া অন্য কোনও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে পারে না। অথচ ঢাকা শহরের সব বিশেষায়িত হাসপাতাল চলে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা। সরকারি হাসপাতালে নাকি তাকে হত্যা করা হবে। অনুরূপ আজগুবি অভিযোগের উত্তর কোনও সরকার দিতে পারবে বলে মনে হয় না।

অথচ দেখা গেছে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীকে বারবার হত্যার চেষ্টা করেছে বিএনপি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভা মঞ্চে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেড মেরেছে। ভাগ্যের ফেরে তারা বাঁচলেও মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতাকর্মী সভাস্থলেই নিহত হয়েছিল। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। এখন দেখা যাচ্ছে তারেক জিয়া, লুৎফুজ্জামান বাবর, পিন্টুরাই এ হত্যা প্রচেষ্টায় জড়িত ছিল।

ওই ঘটনার ১৫ বছর পর হয়তোবা কয়েক দিনের মাঝে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় হবে। তখন আমরা আরও সুবিস্তারে জানবো এই বিষয়ে। যাক, বেগম জিয়া ব্রিটিশের সময়ের অর্ধশিক্ষিত জমিদারদের মতো ‘মাই সে, মাই অর্ডার’ জাতীয় এক মানসিকতায় ভারাক্রান্ত। অনুরূপ মানসিকতা গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অচল এবং সমাজ ব্যবস্থায় অনুরূপ মানসিকতায় অচলাবস্থা সৃষ্টি করে। আবার ভাগ্যের ফেরে দেশে আওয়ামীবিরোধী গোষ্ঠী তার নেতৃত্বে জড়ো হয়ে আছে। তারা তার অবিবেচনাপ্রসূত একগুঁয়েমির নাম দিয়েছে ‘আপসহীন নেত্রী’ আপসহীনতা সৎগুণ নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এটি উগ্রতা, এটি বদগুণ।

দেশে মুখ্যত বৃহত্তর তিন দল– আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর তিন মাস বাকি। আওয়ামী লীগ আর জাতীয় পার্টি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বিএনপি শেখ হাসিনার পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকার, বেগম জিয়ার মুক্তি, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনে বিচারের ক্ষমতাসহ সামরিক বাহিনী নিয়োগ ইত্যাদি দাবি পেশ করে নির্বাচনের পথে বাধা সৃষ্টি এবং আওয়ামীবিরোধী গোষ্ঠীকে একত্রিত করারও চেষ্টা করছে। ২২ তারিখ ড. কামালের ঐক্য প্রক্রিয়া সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ ডেকেছে। সম্ভবত বিএনপি সে সমাবেশে যোগদান করবে। না হয় বিএনপি আওয়ামী লীগ যেখানে সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ ডাকলে লোকসমাগম করতে হিমশিম খায়, সেখানে তারা সমাবেশ ডাকে কোনও ভরসায়।

আগামী কয়েক দিনের মাঝে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার রায় হবে। বিরাট হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিলে সেদিন। সুতরাং অনেকের ফাঁসি, সারা জীবনের কারাদণ্ড ইত্যাদি হবে বলে মনে হয়। তারেক জিয়াও মামলার আসামি। প্রসিকিউশন তার চূড়ান্ত দণ্ড দাবি করেছে। তার চূড়ান্ত দণ্ড হলে বিএনপি সিদ্ধান্তহীনতায় হয়তো ভুগবে–নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবে।

এখন বিএনপির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার তারেকের হাতে। সুতরাং কঠিন পরীক্ষায় পড়বে তারেক। তারেক রহমান আপাতত লন্ডনে নিরাপদে রয়েছে। তারেক রহমান, তার স্ত্রী এবং কন্যা ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন এবং ব্রিটিশ সরকার তাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন। লন্ডনে বসে তিনি দল পরিচালনা করতে পারছেন।

বিএনপি চূড়ান্তভাবে বিপদে পড়েছে। সুতরাং তারেক জিয়া যদি দলকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সম্ভবত তা-ই হবে উত্তম সিদ্ধান্ত। ২০১৩ সালের শেষ চার মাস চূড়ান্ত আন্দোলন করেছিলেন বেগম জিয়া। তিনি লন্ডনে এ কথাও বলেছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও কঠিন আন্দোলন তিনি করেছেন তবে সফল হতে পারেননি। দশম সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে সত্য, তবে ভণ্ডুল হয়ে যায়নি। দশম সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করেছে। এখন একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে আগামী তিন মাসের মধ্যে।

দেশের গুমট অবস্থা দেখে অনেকে নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে আছেন। আবার যুক্তফ্রন্ট করে বদরুদ্দোজা চৌধুরীও মাঠে নেমেছেন। ঐক্য প্রক্রিয়া করে ড. কামাল হোসেনও মাঠে আছেন। আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহামুদুর রহমান মান্না ও যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে রয়েছেন। কাদের সিদ্দিকীকেও টুকরো টুকরো করা হলে তার দেহও ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘বঙ্গবন্ধু’ বলবে। নিজের স্বার্থের জন্য কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় কীভাবে? বিভিন্নভাবে হটকারিতার কারণে মাহামুদুর রহমান মান্না তার জীবনের ক্ষুদ্র রাজনৈতিক জৌলুসটুকু হারিয়েছেন। দুইবার ডাকসুর ভিপি হলেই কেউ ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে যায় না। মান্না সে কথাটুকু বিস্মৃত হয়েছিলেন।

আ স ম রব বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জাসদ গঠন করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুও শেষ, জাসদও শেষ। তাদের মিশন ছিল বঙ্গবন্ধুকে শেষ করা। মিশন শেষ করার পর মিশনারির অস্তিত্ব থাকে কীভাবে? এখন জাসদ খণ্ড খণ্ড হয়ে বিভিন্ন আশ্রয়ে প্রতিপালিত হচ্ছে।

বি. চৌধুরীর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেমন কোনও পরিচিত ব্যক্তি নন। বাংলাদেশের একজন ভালো ডাক্তার এবং একবার ছয় মাসের জন্য রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাও বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ার তাড়া খেয়ে অপমানিত হয়ে রাষ্ট্রপতির পদও ছেড়েছেন, বঙ্গভবনও ত্যাগ করেছিলেন। ড. কামাল হোসেন এবং ইউনূসের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি খুবই ভালো। তারা বিএনপিকে দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবরে অভিযোগ দায়ের করিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব তাদের ডেকে পাঠিয়েছেন। মহাসচিব এ ব্যাপারে তাদের কথা শুনতে পারেন এবং সরকারকে অনুরোধ করতে পারেন। এর অধিক কিছু নয়।

বিএনপি রাষ্ট্র নয় যে এর অধিক কিছু করার এখতিয়ার মহাসচিবের আছে। গত দশম সংসদ নির্বাচনেও তখনকার মহাসচিব বান কি মুনের তৎপরতা ছিল; কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। বিএনপি কোনও জাতীয় সিদ্ধান্তের জন্য জাতির সম্মুখীন হয় না। তারা বিদেশি রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ ইত্যাদির দ্বারস্থ হয়। সম্ভবত এই কারণে ড. কামাল হোসেন অতি উৎসাহী হয়ে বলেছেন নির্বাচন নাও হতে পারে। থানার ওসি থেকে জাতিসংঘ মহাসচিব সর্বত্র বিএনপি অভিযোগ দাখিল করার এক বদঅভ্যাসে ভোগে। এ বদঅভ্যাস ত্যাগ করে যতক্ষণ সাধারণ মানুষের ওপর নির্ভর করার অভ্যাস বিএনপি রপ্ত না করবে ততক্ষণ তাদের কপালের অলক্ষ্মী ছাড়বে না। দেশের মানুষের হতাশ হওয়ার কিছুই নেই, যথাসময়ে নির্বাচন হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমওএফ/

x